
একটি শিশু নিখোঁজ হওয়া মানে শুধু একটি পরিবারের একজন সদস্য হারিয়ে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় নিরাপত্তাবোধ, মানসিক শান্তি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অসংখ্য স্বপ্ন। সন্তানের ছবি হাতে নিয়ে উদ্বিগ্ন বাবা-মা যখন থানায় ছুটে যান, আত্মীয়স্বজনকে ফোন করেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকুতি জানান, তখন তাদের একটাই প্রশ্ন—“আমার সন্তান কোথায়?”
কিন্তু আমাদেরও প্রশ্ন করা দরকার—একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে দ্রুত ও নিরাপদে খুঁজে বের করার জন্য আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত?
সাম্প্রতিক ৩ সেপ্টেম্বর ২৬ প্রথম আলো’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৫,৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ থানায় নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩,৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ২,০৩৮ শিশু তখনও নিখোঁজ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নথিভুক্ত সংখ্যাই বাস্তবতার পুরো চিত্র নয়। অনেক ঘটনা হয়তো রিপোর্ট হয় না, আবার কোনো কোনো ঘটনার তথ্য সময়মতো হালনাগাদও হয় না।
তাই শুধু সংখ্যা নয়, আমাদের জানতে হবে—শিশুরা কেন নিখোঁজ হচ্ছে এবং তাদের কতজন অপহরণ, পাচার, যৌন নির্যাতন বা শোষণের শিকার হচ্ছে।
নিখোঁজ শিশু মানেই জরুরি পরিস্থিতি
সব শিশু একই কারণে নিখোঁজ হয় না। কেউ পারিবারিক অশান্তি বা অভিমানে বাড়ি ছাড়তে পারে; আবার কেউ প্রলোভন, প্রতারণা, অপহরণ কিংবা পাচারের শিকার হতে পারে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশু, পথশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ঘটনাকে জরুরি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। থানায় জিডি বা অভিযোগ গ্রহণ করাই পুলিশের দায়িত্বের শেষ নয়; বরং সেখান থেকেই কার্যকর অনুসন্ধানের শুরু হওয়া উচিত। শিশুর বয়স, ছবি, সর্বশেষ অবস্থান ও সম্ভাব্য ঝুঁকি দ্রুত মূল্যায়ন করে অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে।
পরিবারের অসহায়ত্ব যেন ফাইলে আটকে না থাকে
সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর একটি পরিবার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই তাদের প্রতি সন্দেহ, অবহেলা বা অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
প্রতিটি থানায় শিশু সুরক্ষায় প্রশিক্ষিত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থাকা প্রয়োজন, যিনি পরিবারকে অনুসন্ধানের অগ্রগতি জানাবেন এবং প্রয়োজনে সমাজসেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশু সুরক্ষা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করবেন।
একজন অসহায় বাবা-মায়ের কাছে সবচেয়ে বড় আশ্বাস হলো—কেউ তাদের কথা শুনছে এবং সন্তানের সন্ধানে আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
শিশু ফিরে এলেই দায়িত্ব শেষ নয়
নিখোঁজ শিশু ফিরে এলে পরিবারের স্বস্তি আসে, কিন্তু দায়িত্ব সেখানেই শেষ হওয়া উচিত নয়। সে কোথায় ছিল, কার সঙ্গে ছিল, তাকে ভয় দেখানো হয়েছিল কি না কিংবা সে কোনো নির্যাতন বা শোষণের শিকার হয়েছে কি না—এসব বিষয় শিশুবান্ধব পদ্ধতিতে খতিয়ে দেখা জরুরি। প্রয়োজনে শিশুকে চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, আইনি সহযোগিতা ও নিরাপদ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ শিশুকে শুধু বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট নয়; তাকে নিরাপদ ও সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে দেওয়াই প্রকৃত সাফল্য।
নিরাপত্তার শিক্ষা শুরু হোক পরিবার ও বিদ্যালয় থেকে
ভয়, লজ্জা ও সামাজিক কুসংস্কার শিশু নির্যাতনের বড় বাধা। অনেক সময় নির্যাতনের শিকার শিশুকেই দায়ী করা হয়। এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।
শিশুকে শেখাতে হবে—কেউ ভয় দেখালে, প্রলোভন দিলে, অস্বস্তিতে ফেললে কিংবা কোনো বিষয় গোপন রাখতে বললে বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ককে জানাতে হবে। স্কুল ও মাদ্রাসায় কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতি, শিক্ষক-কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং অনলাইন নিরাপত্তা শিক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রযুক্তি হোক সুরক্ষার হাতিয়ার
একটি সমন্বিত জাতীয় তথ্যব্যবস্থা থাকলে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান সম্ভব হবে। আইনসম্মতভাবে সিসিটিভি ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত সহায়তাও কাজে লাগানো যেতে পারে। একটি থানায় নিখোঁজ হওয়ার তথ্য যেন অন্য এলাকার সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর কাছেও দ্রুত পৌঁছে যায়।
একই সঙ্গে Child Helpline 1098 সম্পর্কে সর্বস্তরের মানুষকে জানাতে হবে। স্কুল, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ, বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনে নম্বরটি দৃশ্যমানভাবে প্রচার করা যেতে পারে।
বার্তাটি হোক সহজ—“বিপদে নীরব থেকো না, সাহায্য চাও।”
শিশুর নিরাপত্তা সবার দায়িত্ব
শিশুর নিরাপত্তা শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্যসেবা, আদালত, এনজিও, গণমাধ্যম ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে।
গণমাধ্যমকেও নিখোঁজ শিশুর সংবাদ প্রকাশের সময় তার মর্যাদা, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে।
সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু নিখোঁজ শিশুকে উদ্ধার করা নয়; বরং এমন সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে শিশু নিখোঁজ হওয়ার আগেই তার ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা যায়।
শিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়—এটি তার অধিকার।
তাই প্রশ্ন শুধু—“শিশুটি কোথায়?” নয়; প্রশ্ন হওয়া উচিত—“কেন শিশুটি এমন ঝুঁকিতে পড়ল?” কারণ একটি শিশুর জন্য প্রতিটি মিনিট মূল্যবান। তাকে খুঁজে পাওয়া জরুরি, ফিরিয়ে আনা জরুরি; কিন্তু তার চেয়েও জরুরি—তাকে নিরাপদ রাখা।
আজকের শিশুকে নিরাপদ রাখতে পারলেই নিরাপদ হবে আমাদের আগামী।
দ.ক.২৬