
বিদেশে কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। একই সঙ্গে রিক্রুটিং এজেন্সির বৈধতা, বিদেশি নিয়োগকর্তার কর্মী চাহিদা এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দৈনিক প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘নিরাপদ অভিবাসন ও বিদেশফেরতদের পুনঃএকত্রীকরণ: বাস্তবতা ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও দৈনিক প্রথম আলো যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে।
মন্ত্রী বলেন, অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়া ঠেকাতে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে সমাজের প্রতিটি স্তরকে সম্পৃক্ত করতে হবে। অবৈধ পথে বিদেশে লোক পাঠানোর সঙ্গে জড়িত চক্র মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা না করে নিজেদের স্বার্থে কাজ করছে। এসব চক্রের রুট চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ চলছে।
তিনি জানান, অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মাদারীপুরসহ কয়েকটি জেলায় আগামী এক মাস ব্যাপক প্রচার চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি মসজিদ, মন্দির ও গির্জাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেও এ প্রচারে যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।
দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর জোর:
বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিদেশি নিয়োগকর্তারা যে ধরনের দক্ষতার কর্মী চান, অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে সেই দক্ষতার কর্মী পাঠানো হয় না। যেমন, প্লাম্বার বা ইলেকট্রিশিয়ানের চাহিদা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কাজে দক্ষ নন এমন ব্যক্তিকে পাঠানোর ঘটনা ঘটে। এতে কর্মী ও নিয়োগকর্তা উভয়ই সমস্যায় পড়েন।
এ সমস্যা সমাধানে নতুন পদ্ধতি চালুর কথা জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো দেশ নির্দিষ্ট দক্ষতার কর্মী চাইলে সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়োগকর্তার প্রতিনিধি বা প্রশিক্ষক বাংলাদেশে এসে কর্মীদের দক্ষতা যাচাই করবেন। প্রশিক্ষণে সন্তুষ্ট হওয়ার পর তারা কর্মী নিয়োগ করবেন।
মন্ত্রী জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৬ হাজার চালক পাঠানোর ক্ষেত্রে এ ধরনের পদ্ধতি চালু হয়েছে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের সুযোগ কমবে বলে তিনি মনে করেন।
দূতাবাসের সেবা সহজ করার পরিকল্পনা:
বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের সরকারি সেবা পেতে দূরদূরান্ত থেকে দূতাবাস বা কনস্যুলেটে যেতে হয় উল্লেখ করে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, এতে প্রবাসীদের সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হয়। এ কারণে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কিছু সরকারি সেবা দেওয়ার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে।
পাসপোর্টসহ বিভিন্ন নথি ডাক বা কুরিয়ার সেবার মাধ্যমে প্রবাসীদের ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা যায় কি না, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে বলে জানান তিনি।
প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী। সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ কার্ড চালুর বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। এর মাধ্যমে ভূমি ও সাবরেজিস্ট্রি অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি সেবায় প্রবাসীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে পারে। স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
প্রবাসীদের সন্তানদের জন্য ঋণ বাড়ানোর উদ্যোগ:
প্রবাসীদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য ঋণের সীমা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে বর্তমানে দেওয়া ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
দেশে দক্ষ কর্মী তৈরির জন্য ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে আরও কার্যকর করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, শুধু অবকাঠামো থাকলেই হবে না, দক্ষ প্রশিক্ষক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও নিশ্চিত করতে হবে।
এ সময় কাতার বাংলাদেশের কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোতে প্রশিক্ষক ও অর্থায়ন দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে বলেও জানান প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আরবি ভাষায় তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অল্প সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের উপযোগী করে তোলা সম্ভব। তাঁর নির্বাচনি এলাকার তিনটি মাদ্রাসায় এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।
নিরাপদ অভিবাসনে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ:
বিদেশে দক্ষ জনবল পাঠাতে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা, নতুন শ্রমবাজার খোঁজা, বিদেশফেরতদের কর্মসংস্থানে পুনঃএকীভূত হতে সহায়তা এবং বিদেশে মারা যাওয়া প্রবাসীদের মরদেহ দেশে আনার পাশাপাশি তাঁদের পরিবারকে সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে প্রবাসীদের জন্য অনেক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, যার সবগুলো প্রচারে আসেনি। সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার সামনে রেখেই প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া হবে।
নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা এবং বিদেশফেরতদের পুনঃএকত্রীকরণের ক্ষেত্রে সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী। বৈঠকে নিবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান।
দ.ক.সিআর