শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১১:২৬ অপরাহ্ন

বিদ্যাকুট সতীদাহ মন্দির: গৌরবের পাশাপাশি অন্ধকার অধ্যায়ও আছে

  • প্রকাশিত: শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশে এই মন্দিরটি শুধু ইতিহাস নয়, বহন করছে এক অন্ধকার সামাজিক প্রথার নির্মম স্মৃতি।

বিদ্যাকুট সতীদাহ মন্দির, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিদ্যাকুট গ্রামে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো এক নিদর্শন। নীরব এই স্থাপনাটি আজও সাক্ষ্য দেয় উপমহাদেশের ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়ের।

ইতিহাস: বিদ্যাকুট গ্রামের প্রসিদ্ধ হিন্দু জমিদার দেওয়ান বাড়ির বাসিন্দা দেওয়ান রাম মানিক সতীদাহ মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতার বিখ্যাত সাংবাদিক অনিলধন ভট্টাচার্যের জন্ম এই বিদ্যাকুট গ্রামে। অনিলধন ভট্টাচার্য রচিত ‘শাশ্বত ত্রিপুরা’ গ্রন্থেও এই সতীদাহ মন্দিরের কথা উল্লেখ আছে। এই গ্রন্থে বিদ্যাকুট গ্রামটিকে ত্রিপুরা রাজ্যের ‘নবদ্বীপ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়, বিদ্যাকুট ছাড়াও আশপাশের মেরকুটা, সেমন্তঘর, শিবপুর ও বাঘাউড়া গ্রামের হিন্দুরা সতীদাহের জন্য এই মন্দিরটি ব্যবহার করতেন। ইতিহাসের মোড় ঘুরে যায় ১৮২৯ সালে। রাজা রাম মোহন রায় এর আন্দোলন এবং লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক এর আইনি পদক্ষেপে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ হয়। কিন্তু, ১৮৩৫ সালে দেওয়ান রাম মানিকের মাতাকে এই মন্দিরটিতে সর্বশেষ সতীদাহ বরণ করতে হয়। সতীদাহ বরণকারিণীর নামে পূর্বে একটি শ্বেত পাথরের নাম ফলক বসানো ছিল। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হলে দেওয়ান রাম মানিকের পরিবার গ্রাম ছেড়ে ভারতে চলে যায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এই মন্দিরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে এই মন্দিরে সর্বশেষ সতীদাহ বরণকারিণীর নাম জানা যায়নি।

১৯৮০ সালের দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোকসংস্কৃতি গবেষক জহিরুল ইসলাম চৌধুরী স্বপন গ্রামের এক গৃহবধূ বনলতা দেবীর কাছ থেকে ব্রিটিশ সরকারের একটি চিঠি সংগ্রহ করেন। তৎকালীন ত্রিপুরার রাজার কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে সতীদাহ প্রথা বন্ধের নির্দেশ ছিল।

সতীদাহ ছিল এমন এক অমানবিক প্রথা, যেখানে সদ্য বিধবা নারীদের স্বামীর চিতায় সহমরণে বাধ্য করা হতো।
আজ শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, একসময় সমাজ ও ধর্মের নামে এই নিষ্ঠুরতা চলত প্রকাশ্যেই।

স্থাপত্য: মন্দিরটি গোলাকার মঠ-আকৃতির, প্রায় ২০ ফুট উঁচু ইটের স্থাপনা। এক পাশে প্রবেশপথ, চারদিকে ছোট ছোট খুপরি, ধারণা করা হয়, এগুলো আগুন জ্বালিয়ে রাখার কাজে ব্যবহৃত হতো।

দুঃখের বিষয়, সম্প্রতি অপরিকল্পিত সংস্কারের কারণে মন্দিরটির অনেকটাই আদি রূপ হারিয়েছে।

স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, সংরক্ষণের অভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন ধীরে ধীরে তার স্বকীয়তা হারাচ্ছে।
বিদ্যাকুট সতীদাহ মন্দির শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়, এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসে গৌরবের পাশাপাশি অন্ধকার অধ্যায়ও আছে।

দ.ক./এ.টি

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© 𝐰𝐰𝐰.𝐤𝐚𝐚𝐥𝐧𝐞𝐭𝐫𝐨.𝐜𝐨𝐦
Theme Customized By BreakingNews