
➖
অজয় বিশ্বাস: বলা হয়ে থাকে, বাঙালি বীরের জাতি। ছোটবেলায় এ নিয়ে মনে প্রশ্ন জাগতো যে, সেটা কীভাবে! কারণ, আমাদের আছে মাঠ ভর্তি সোনালি ফসল, গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ, বছরে তিনবার ফসলের দেশ বাংলাদেশ।
এদেশের মাটি খুব উর্বর বলে মানুষ কবিতা লেখে, গান গায়, জারি-সারি ভাটিয়ালির সুরে মানুষের মনে দোলা ওঠে। এখানে বীরত্বের কোনো উপাদান আছে বলে মনে হতো না, সেই ছেলেবেলায়।
তারপর একটু বড় হওয়ার পর চোখের সামনে বদলে গেল দৃশ্যপট! শহীদ তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, নেতাজী সুভাষ বসুর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বীরগাথা এবং আমাদের ভাষা আন্দোলন ও গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ, সবই আমাদের বীরত্বের ইতিহাস।
১৯৭১-এ বিজয় লাভের পরেও দেশ গড়ার দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত ছিল। এদেশের মানুষ লড়াই করেছে- স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্র ও অধিকার আদায়ের। এসব লড়াইয়ে বাঙালি অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছে, আন্দোলনে সাফল্যও এসেছে শাসকের পতনের মধ্য দিয়ে।
২০২৪: কোটাবিরোধী থেকে সরকারবিরোধী আন্দোলন
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনও এই ইতিহাসের বাইরে নয়। এ আন্দোলন দেশের মানুষের কাছে বিশেষ এক গুরুত্ব বহন করে।
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন একজন পরাক্রমশালী স্বৈরশাসকের ক্ষমতা ত্যাগ ও বিদেশে আশ্রয় গ্রহণ মানুষের মনে বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। এরকম ঘটনা সবার কাছে নতুন না হলেও এ ঘটনা ইতিহাসে নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে।
এর আগে, ১৯৯০ স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধেও ছাত্র-জনতা আন্দোলন করে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। তবে সেসময় তাকে দেশত্যাগ করতে হয়নি। শেখ হাসিনাই প্রথম, যিনি আন্দোলনের মুখে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। তবে এটাই সত্যি যে, তিনি দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন।
মাত্র কয়েকদিনের ছাত্র আন্দোলন কীভাবে একটি অভ্যুত্থানে রূপ নিলো, তা নিয়ে ভাববার অবকাশ আছে বৈকি!
২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশের রাজপথ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, শহর ও গ্রামগঞ্জের সবখানে এক অভূপূর্ব ঢেউ উঠেছিল দাবি আদায়ের। তবে এর শুরুটা ছিল ছোট্ট একটা দাবিকে ঘিরে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসাকে কেন্দ্র করে। পরে সে আন্দোলনে আরো একটি দাবি যু্ক্ত হয়। তা হলো- সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থার সংস্কার করা।
২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট বিভাগের এক রায়ে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কোটা ব্যবস্থাকে পুনর্বহাল করার আদেশ দেওয়ার পর থেকেই আন্দোলন নতুন করে গতি পায়। ছাত্ররা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে রাজপথে নেমে আসেন। সরকার তাদের সঙ্গে আলোচনার পথে না হেঁটে, বরং দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়। এখানেই সরকার বড় একটা রাজনৈতিক বড় ভুল করে বসে।
১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা কি ‘রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে’ বলে মন্তব্য করেন। এই মন্তব্যের পর পুরো পরিস্থিতি বদলে যায়। সেদিন রাতে এবং পরদিন সকালে শিক্ষার্থীরা দলে দলে রাস্তায় নেমে আসেন। তারা পুলিশি বাধার মুখে পড়ে। তারপর থেকেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন রক্তাক্ত হয়ে ওঠে।
রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের বুকের রক্ত আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মাত্র ৩৬ দিনের এই আন্দোলনে শত শত (কেউ কেউ বলেন ১,৪০০-এরও বেশি) শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান। এই সময় সরকার আরো একটি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে। তাহলো- দেশব্যাপী ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া। সেইসঙ্গে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার পরিবর্তে কারফিউ জারি করে। এরপর আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ নির্যাতন ও গুলিবর্ষণ করতে শুরু করে। এসব ঘটনা শেষপর্যন্ত আন্দোলনকে আরো উস্কে দেয়।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই আন্দোলন রূপ নিলো এক দফার সরকার পতনের আন্দোলনে। শেষপর্যন্ত এ আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এর চূড়ান্ত ফলাফল প্রায় দেড় দশকের স্বৈরশাসনের অবসান। লাখো ছাত্রছাত্রীর ‘এক দফা’ দাবির মুখে শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হন।
এই গণঅভ্যুত্থান শুধুমাত্র একটি সরকারের পতনই নিশ্চিত করেনি বরং দেশের তরুণ প্রজন্মকে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়তে আরো উদ্বুদ্ধ করেছে। এই আন্দোলন কোটা সংস্কারের আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং রাষ্ট্রীয় সংস্কার, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, ন্যায়বিচার ও অধিকার প্রতিষ্ঠার এক সর্বজনীন আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়।
আন্দোলনে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির প্রবেশ
শেখ হাসিনার সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবির ও বিভিন্ন ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের ক্যাডাররা আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার মধ্যে পরিকল্পিভাবে ঢুকে পড়ে এবং তাদের সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে।
৫ আগস্টের পর রাজধানী ঢাকার বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ভাঙা, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের দাবি তোলা, দেশব্যাপী মাজার ভাঙা, এগুলো কাদের এজেন্ডা, তা সবাই এখন ভালো করেই জানেন। শেখ হাসিনার পতনের পেছনে ছাত্র আন্দোলন এবং আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগের পাশাপাশি অন্যান্য গুপ্তঘাতক কারা ছিল, সে সম্পর্কেও এখন জানা প্রয়োজন।
সাধারণ শিক্ষার্থীরা এসব ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত ছিল, এটা মেনে নেওয়া যায় না। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অনেকেই গর্বের সঙ্গে তাদের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ও পুলিশ হত্যা, থানা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেওয়ার দায়ও স্বীকার করেছেন এবং সেইসঙ্গে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পূর্ব পরিকল্পনার কথাও বলে ফেলেছেন।
বাংলাদেশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন আগেও হয়েছে। সেগুলোর নেতৃত্বেও ছিল ছাত্র সমাজ। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলের মতো এত নৈরাজ্য ও সহিংসতা কোনোকালেই হয়নি। এরকম বৃহৎ ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে বহু অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটে থাকে। যেমন- শ্রীলঙ্কা বা নেপালের আন্দোলনের ইতিহাসও তার প্রমাণ। মনে রাখা দরকার যে, বন্যার প্রবল স্রোতের টানে যেমন আগাছা ভেসে আসে, ২০২৪-এর আন্দোলনের সময়ও সেটিই ঘটেছে।
১৯৭২ সালে বিজয় লাভের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে আওয়ামী লীগে ভাঙন, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা, এ সবকিছুই ঘটেছিল মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে তৎকালীন সরকারের ব্যর্থতার কারণে। সেইসঙ্গে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে না-পারার সূত্র ধরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দেশি ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে।
ছাত্র আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক কিছুই শেখার রয়েছে। এই আন্দোলনে ভেসে আসা দেশি ও বিদেশি আবর্জনাগুলোকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। আন্দোলনের আড়ালে ঘাপটি মেরে থাকা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সঙ্গে আপস করা এবং তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের সুযোগ করে দেওয়ার অর্থ হবে জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা।
দেশবাসীর প্রত্যাশা, নির্বাচিত সরকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। সেইসঙ্গে, বাংলাদেশ যে, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বেশেষে সবার, সে প্রত্যাশা পূরণে সচেষ্ট থাকা।
অজয় বিশ্বাস: সাংবাদিক, লেখক, মেইল: a.biswas.uss@gmail.com
দ.ক.সিআর.৩৬