
মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ : দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জোরেশোরে আলোচনা চলছে। উৎসাহী প্রার্থী ও সমর্থকেরা চায়ের চুমুকে স্বপ্নবোনা কথামালায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেন জয়ের নৃত্যে বিভোর হয়ে দিবাস্বপ্নে মেতে উঠেছেন। নির্বাচন এলেই দেশের শহর থেকে গ্রাম, চায়ের দোকান থেকে অফিসপাড়া—সব জায়গায় শুরু হয় রাজনৈতিক ব্যস্ততা। হঠাৎ করেই এলাকার অলিগলি মুখর হয়ে ওঠে প্রতিশ্রুতির বন্যায়। কমিশনার, মেম্বার, চেয়ারম্যান, মেয়র, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী—সবাই তখন জনগণের খুব কাছের মানুষ হয়ে যান। হাসিমুখ, বিনয়ী আচরণ এবং মানবিক কথাবার্তায় তারা যেন সাধারণ মানুষের আপনজন হয়ে ওঠেন। মনে হয়, এবারই বুঝি বদলে যাবে সবকিছু।
প্রার্থীদের ভাষণে তখন একটাই সুর—এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে, মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা হবে, ঘুষ ও দুর্নীতি বন্ধ করা হবে, উন্নয়নের জোয়ার বইবে, চাঁদাবাজি নির্মূল করা হবে। প্রতিটি বক্তব্যে থাকে আশার আলো, স্বপ্নের ছবি এবং সুন্দর ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। নয়নকাড়া পোস্টার, রঙিন ব্যানার, সুরেলা মাইকিং এবং আকর্ষণীয় প্রচারণায় ভোটারদের মন জয় করার প্রতিযোগিতা চলে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন গল্প বলে।
নির্বাচন শেষ হলে, বিজয়ের মালা গলায় পড়ার পর অনেক জনপ্রতিনিধির আর খোঁজ মেলে না। যাদের প্রতিদিন দেখা যেত, তারা ধীরে ধীরে জনগণের নাগালের বাইরে চলে যান। নির্বাচনের আগে যে সমস্যাগুলো নিয়ে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন, সেগুলোই আবার আগের মতো রয়ে যায়। জলাবদ্ধতা, মাদক, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি কিংবা নাগরিক দুর্ভোগ—সবকিছু যেন একই জায়গায় স্থির হয়ে থাকে।
জনগণ তখন প্রশ্ন করতে চায়—কতটুকু পরিবর্তন বাস্তবে এসেছে? কতগুলো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে? নির্বাচনের আগে দেওয়া কথাগুলো কি শুধুই ভোট পাওয়ার কৌশল ছিল? রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতি দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। বরং উন্নয়নের পরিকল্পনা তুলে ধরা একজন প্রার্থীর দায়িত্ব। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন প্রতিশ্রুতি বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কহীন হয়ে পড়ে। বিনা খরচের বুলি দিয়ে মানুষের আবেগকে ব্যবহার করা রাজনীতির জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি গণতন্ত্রের জন্যও বিপজ্জনক। নির্বাচনী সময়ে প্রার্থীদের শারীরিক ভাষা, বিনয়ী আচরণ এবং মানুষের প্রতি অতিরিক্ত আন্তরিকতা অনেক সময় সাধারণ ভোটারদের আবেগপ্রবণ করে তোলে। মানুষ বিশ্বাস করতে চায়, পরিবর্তন আসবেই। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতা সেই বিশ্বাসকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। ফলে জনগণের মধ্যে তৈরি হয় হতাশা, অবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক অনীহা।
এখানে শুধু প্রার্থীদের দায় নয়, ভোটারদের দায়িত্বও কম নয়। অনেক সময় দেখা যায়, আবেগ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সাময়িক প্রভাব কিংবা বাহ্যিক প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে ভোটাররা অযোগ্য ব্যক্তিকে নির্বাচিত করেন। যোগ্যতা, সততা, অতীত কাজের মূল্যায়ন কিংবা বাস্তব পরিকল্পনা বিবেচনা না করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ফল ভোগ করতে হয় পুরো সমাজকে।
গণতন্ত্রের শক্তি আসলে ভোটারের সচেতনতার ওপর নির্ভর করে। একজন সচেতন ভোটার শুধু প্রতিশ্রুতি শোনেন না; তিনি প্রশ্ন করেন, বিশ্লেষণ করেন এবং প্রার্থীর অতীত কর্মকাণ্ড যাচাই করেন। কে কত বড় পোস্টার লাগালেন বা কত জোরে মাইক বাজালেন—তা নয়; বরং কে বাস্তবে কাজ করার সক্ষমতা রাখেন, সেটিই হওয়া উচিত নির্বাচনের মূল বিবেচ্য বিষয়।
রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন জবাবদিহিতা। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জনগণের কাছে নিয়মিত ফিরে আসতে হবে, তাদের কাজের অগ্রগতি জানাতে হবে এবং সমালোচনাকে গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে জনগণকেও পাঁচ বছর অপেক্ষা না করে নিয়মিতভাবে দাবি ও প্রশ্ন তুলে ধরতে হবে।
ভোট কেবল একটি অধিকার নয়; এটি একটি দায়িত্বও। একটি ভুল সিদ্ধান্ত পুরো এলাকার উন্নয়নকে থামিয়ে দিতে পারে, আবার একটি সঠিক সিদ্ধান্ত সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে। তাই ভোট দেওয়ার আগে আবেগ নয়, বিবেককে প্রাধান্য দেওয়া জরুরি।
সমাজের মানুষ আর ফাঁকা প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। তারা দেখতে চায় বাস্তব কাজ, দৃশ্যমান উন্নয়ন এবং নিরাপদ জীবনযাপন। রাজনৈতিক নেতাদেরও বুঝতে হবে—মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক সচেতন। শুধুমাত্র মনকাড়া ভাষণ বা চমকপ্রদ প্রচারণা দিয়ে দীর্ঘদিন জনগণের আস্থা ধরে রাখা সম্ভব নয়।
সময় এসেছে প্রতিশ্রুতির রাজনীতি থেকে দায়িত্বশীল রাজনীতিতে ফিরে যাওয়ার। প্রার্থীদের উচিত বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দেওয়া এবং নির্বাচনের পর তা বাস্তবায়নে আন্তরিক থাকা। আর ভোটারদের উচিত বুঝে, ভেবে এবং যাচাই করে প্রতিনিধি নির্বাচন করা। কারণ গণতন্ত্রের আসল শক্তি নেতার হাতে নয়—সচেতন জনগণের হাতে। যখন ভোটার সচেতন হবে, তখনই প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পরিবর্তনের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হবে। তখন নির্বাচন হবে কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করার একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক উৎসব।
দ.ক.সিআর.২৬