
সালেহ উদ্দিন, চুনারুঘাট : বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের আবির্ভাব কোনো স্বাভাবিক কিংবা মসৃণ ধারায় ঘটেনি। এই আবির্ভাব গড়ে উঠেছে একের পর এক নাটকীয়, সংকটময় ও ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে—যার প্রতিটি অধ্যায় আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা ১৯৭৫–পরবর্তী জাতীয় বিপর্যয় ও নেতৃত্বশূন্যতার প্রেক্ষাপটে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের উত্থানের মাধ্যমে। ভাঙাচোরা রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক অস্থিরতা ও সাংস্কৃতিক বিভ্রান্তির ভেতর দাঁড়িয়ে তিনি “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ”-এর ধারণাকে সামনে আনেন। ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী নির্বিশেষে তিনি জনগণকে একটি জাতীয় আকাঙ্ক্ষার পতাকাতলে সমবেত করতে সক্ষম হন। একটি আত্মমর্যাদাশীল, স্বাধীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ—এই স্বপ্ন তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত করতে পেরেছিলেন।
জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব কোনো সহজ পথে আসেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়েই তিনি প্রথম সমগ্র জাতির সামনে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি কেবল রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানুষের আস্থার প্রতীক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই নেতৃত্বের পূর্ণ বিকাশের সুযোগ দেশ পায়নি। দেশ যখন একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই তাঁর হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশকে আবারও গভীর রাজনৈতিক সংকট ও দিশাহীনতার মধ্যে ঠেলে দেয়।
এই শূন্যতা থেকেই ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অধ্যায়ের সূচনা—বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আগমন। তিনি রাজনীতিতে আসেন কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে নয়; বরং সময় ও বাস্তবতার নির্মম চাপে একরকম বাধ্য হয়েই। যখন মনে হচ্ছিল বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটি জন্মের আগেই ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যাবে, ঠিক সেই ক্রান্তিলগ্নে একজন ‘গৃহবধূ’ দলের হাল ধরেন।
এই আবির্ভাব সুখকর ছিল না, সহজও ছিল না। রাজনীতি তাঁর জন্য প্রস্তুত কোনো মঞ্চ ছিল না। তাঁকে প্রতিটি ধাপে লড়ে লড়ে নিজেকে গড়ে তুলতে হয়েছে। কিন্তু সংকটই তাঁকে নির্মাণ করেছে। ধীরে ধীরে তিনি কেবল বিএনপির নেত্রী নন, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমিতে এক অনিবার্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
১৯৮৩ সালে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় নেতৃত্বে আসেন। রাজপথের আন্দোলন, একের পর এক গ্রেপ্তার, বিবৃতি ও প্রতিরোধ—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের দৃশ্যমান মুখ। বিশেষ করে ১৯৮৬ সালের প্রহসনের নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল একটি যুগান্তকারী রাজনৈতিক পদক্ষেপ। এটি কেবল নির্বাচন বর্জন নয়; এটি ছিল স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বৈধতাকে প্রকাশ্যভাবে প্রত্যাখ্যান করা।
এই সাহসী সিদ্ধান্তই তাঁকে রাজনীতিতে একজন আপসহীন নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে—যার প্রতিফলন আমরা তাঁর পরবর্তী জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে দেখেছি। একজন গৃহবধূ থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হওয়ার এই যাত্রা একদিন রাজনীতিবিজ্ঞানের গবেষণার বিষয় হবে। অনেকের কাছে এটি রূপকথার মতো মনে হলেও বাস্তবে এটি ছিল নিরন্তর সংগ্রামের ইতিহাস।
বাংলাদেশের ইতিহাসে যতবার স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে জাতি সংকটে পড়েছে, ততবারই বিএনপি সামনে এসেছে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। ’৯০–এর গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক শাসনের অবসান এবং ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা—এই অধ্যায়ে তাঁর ভূমিকা ঐতিহাসিক। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন ছিল তাঁর নেতৃত্বের এক বড় অর্জন।
একই সঙ্গে বহুদলীয় রাজনীতির পুনরুজ্জীবন, সংসদীয় বিতর্কের সংস্কৃতি এবং বিরোধী রাজনীতির পরিসর তৈরি—এসব ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বলা যায়, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থে একটি গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার সুযোগ পেয়েছিল।
নারীশিক্ষায় তাঁর অবদান আলাদা করে উল্লেখযোগ্য। নব্বইয়ের দশক থেকে নারীশিক্ষায় যে গণজাগরণ শুরু হয়, তার পেছনে তাঁর গৃহীত বৃত্তি ও সহায়তা কর্মসূচি—বিশেষ করে গ্রামীণ মেয়েদের জন্য—একটি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি নারী নেতৃত্বের এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠেন, যার তাৎপর্য দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও গভীর।
১/১১–পরবর্তী সময়ে সন্তানদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন, কারাবরণ, অসুস্থতা এবং ছোট সন্তান আরাফাত রহমানের মৃত্যু—কোনো কিছুই তাঁকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করতে পারেনি। গত ষোল বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে পরিবারহীন, একা, কারাগারের অন্ধকারে থেকেও তিনি আপস করেননি। এই দীর্ঘ আপসহীন অবস্থান একদিন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অবদান হিসেবে বিবেচিত হবে।
১৯৮৫ সালের এক গোধূলি লগ্নে শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশনের একটি ট্রেনের দরজার পাশে লোহার হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়ার সংগ্রামী বক্তব্য শোনার স্মৃতি আজও অমলিন। সময় বদলেছে, মানুষ বড় হয়েছে—কিন্তু সেই মুহূর্ত আজও রয়ে গেছে।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর জাতির একতাবদ্ধ হওয়ার সময়ে আমরা যখন বিভক্তির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি, তখন যাঁর সর্বজনগ্রাহ্য নেতৃত্ব আমাদের এক সুতোয় বাঁধতে পারত, তিনি চলে গেলেন অসীমের ডাকে। তাঁর বিদায় কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রস্থান নয়—এটি একটি সংগ্রাম, একটি রাজনৈতিক প্রজন্মের অবসান।
ইতিহাস একদিন থেমে দাঁড়িয়ে বলবে—বাংলাদেশের গণতন্ত্রের দীর্ঘ, রক্তাক্ত ও নিরন্তর লড়াইয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নাম উচ্চারিত হবে গভীর শ্রদ্ধা ও বেদনার সঙ্গে।
এই শোক কোনো একক দলের নয়।
এই শোক রাষ্ট্রের।
এই শোক বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বেদনাময় অধ্যায়। কিন্তু ইতিহাস এখানেই থেমে থাকে না। ইতিহাস উত্তরাধিকার খোঁজে, দায়িত্ব খোঁজে, সংগ্রামের ধারাবাহিকতা খোঁজে। সেই ধারাবাহিকতার নাম আজ—তারেক রহমান।
বেগম খালেদা জিয়ার বিদায়ের মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি অধ্যায় শেষ হলেও আরেকটি অধ্যায় আরও দৃঢ়ভাবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। চরম দুঃসময়ে, নিরন্তর চাপে, নির্বাসনের বাস্তবতায় থেকেও তারেক রহমান যে নেতৃত্ব দেখিয়েছেন, তা সহজ কোনো নেতৃত্ব নয়। এটি দৃঢ়তার, অসীম ধৈর্যের ও নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের নেতৃত্ব।
কৈশোরেই তিনি হারিয়েছেন তাঁর পিতা—শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় পা রাখার আগেই তিনি শিখেছেন শোকের অর্থ। পরে বিদেশে অবস্থানকালে একমাত্র ভাই আরাফাত রহমানের মৃত্যু—যাঁর মৃত্যুশয্যার পাশে দাঁড়ানোর সুযোগও তাঁর হয়নি। আর সবশেষে, দেশ ও দলের এক চরম ক্রান্তিলগ্নে তিনি হারিয়েছেন তাঁর মা—বেগম খালেদা জিয়াকে। এই শোকগুলো কেবল ব্যক্তিগত নয়; প্রতিটি বেদনা বহন করে একটি রাজনৈতিক ভার।
স্থায়ী কমিটির বৈঠকের ভিডিওতে তারেক রহমানকে দেখে চোখ ফেরানো যায় না। সদ্য মা-হারা এক সন্তানের মুখে যেন একদিনেই বহু বছরের ক্লান্তি জমে উঠেছে। কৈশোরে পিতাকে হারানো, ফ্যাসিবাদের থাবায় ভাইকে হারানো, দীর্ঘ রাজনৈতিক নিপীড়নের ভার—এই সবকিছু মিলিয়ে তাঁর বেদনা ব্যক্তিগত থাকার সুযোগ পায়নি। তা রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে, ঐতিহাসিক হয়ে উঠেছে।
এই সমস্ত দুঃসময়ের মধ্যেও তারেক রহমান বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন। বিভক্তির রাজনীতির ভেতর, ভয় ও দমন-পীড়নের আবহে দলকে সংগঠিত রাখা কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দক্ষতা নয়—এটি নেতৃত্বের দৃঢ়তার প্রমাণ। নির্বাসনের বাস্তবতায় থেকেও তিনি দলকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন এবং বিএনপিকে একটি কার্যকর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকিয়ে রেখেছেন।
আমরা যারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নই—আমরা বিএনপিকে দেখি একটি মধ্যপন্থী, উদার ও বাংলাদেশপন্থী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে। শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিকে আমরা এই দেশের মাটির রাজনীতি বলেই বিশ্বাস করি। আজ এই প্রেক্ষাপটে আমাদের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে।
তারেক রহমান আমাদের কাছে কেবল একটি রাজনৈতিক পরিচয় নন। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার রেখে যাওয়া উত্তরসূরি। তিনি অনেকের কাছে অনেক কিছু হতে পারেন—কিন্তু আমাদের কাছে তিনি আমাদের ভাই।
ভাইয়ের পাশে দাঁড়ানো কোনো স্লোগান নয়। এটি একটি নৈতিক দায়। এটি ইতিহাসের কাছে জবাবদিহির দায়।
আমরা যেখানেই থাকি, যে অবস্থায়ই থাকি—বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারেক রহমানের ভাবনা, তাঁর রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবায়নের প্রশ্নে আমাদের আরও দৃঢ়, আরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে হবে।
কারণ ইতিহাস শুধু নেতাদের মনে রাখে না। ইতিহাস মনে রাখে সেই মানুষদেরও— যারা দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ায়।
লেখক: সালেহ উদ্দিন, নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক, পরিচালক ন্যাশনাল টি কোম্পানী (এনটিসি)
দ.ক.সিআর.২৫