
যুবরাজ দেববর্মা, শ্রীমঙ্গল : নির্মাই দেবী; দ্যা লেডি উইথ ল্যাম্প অফ শ্রীমঙ্গল। যিনি প্রায় ছয়শো বছর পূর্বে একটি প্রাচীন ও সুবিশাল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মন্দির, মঠ ও আশ্রম প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি প্রায় ষাটটিরও অধিক টুল অর্থাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন তার জন্য এর চেয়ে যথাযোগ্য বিশেষণ বোধহয় আমার জানা নেই। তিনি পরম শ্রদ্ধেয়া বিদুষী, আধ্যাত্মিক ও মহীয়সী সাধিকা অধুনা রাজন্য ত্রিপুরার মহারাজকুমারী নির্মাই দেবী।
তাঁর নামে এখনো ঠাঁই দাঁড়িয়ে একটা সুপ্রাচীন মন্দির, সুরম্য তপ্ত জলের দীঘি ও কয়েক শতাধিক পরিবারের বসবাসরত জীবন্ত গ্রাম নির্মাই শিববাড়ি বস্তি, তাঁর নিরাপত্তার জন্য প্রেরিত তখনকার মহারাজার সৈন্য দূর্গ শংকর সেনাও কালের বিবর্তনে একটা গ্রামে পরিণত হয়েছে, এছাড়া রাজকুমারী ও মন্দিরের ভরণপোষণের জন্য মহারাজার দানকৃত নিষ্কর ভূমি আশিদ্রোণের নামে একটা ইউনিয়ন ইত্যাদি।
জানা যায়, বৃটিশ আমলে শিবরাত্রি ও অষ্টমী স্নানে এই পবিত্র তীর্থক্ষেত্রের জন্য ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে স্পেশাল ট্রেন আসতো ভক্ত পূর্ণার্থীদের নিয়ে। কিন্তু তাঁর জীবন, কর্ম ও অবদানের কথা যে কালের গর্ভে বালিশিরার অতল পাহাড়ে চাপা পড়ে এই উপাত্যকার গন্ডি পেরিয়ে খুব বেশিদূর অগ্রসর হয় নি তার দায় আমাদের সকলের, আমরা পাঠ্যপুস্তকে নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে জেনেছি পরম শ্রদ্ধেয়া বেগম রোকেয়া, নওয়াব ফয়জুন্নেসা, রাণী রাসমণিদের, তাই উঠোন থেকে দুই পা পেরিয়ে এমন নিরবে নিভৃতে কাজ করে যাওয়া মহান আত্মাদের খোঁজতে যাই না আর, অথচ কারো তুলনায় আরো ভূমিকা কম নয়, যেখানে বর্তমানে দেশ-বিদেশে লালনসহ অন্যান্য গুণী মনীষীদের নিয়ে গবেষণা হয়, তাদের জীবন দর্শন আলোচনা-পর্যালোচনা হয় সেখানে কি আমরা এই মানুষটিকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করতে পারি না, তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিতে পারি না?
আজকে আপনি যে শ্রীমঙ্গলের মাটিতে দাঁড়িয়ে সেই মা, মাটি, মানুষ ও প্রাণ-প্রকৃতিকে যিনি পরম মমতায় লালন করেছেন, নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন তাঁকে অন্তত শ্রদ্ধা, স্মরণ করা কি আমাদের ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না, যিনি তাঁর সমগ্র জীবন ধর্ম, বর্ণ ও জাতি নির্বিশেষে বিলিয়ে দিয়েছেন, আর্ত মানবতার সেবায় শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সাধ্যমত প্রচেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন, উপত্যকার আনাচে-কানাচে মানবতা ও পরমতসহিঞ্চুতার বাণীর আলোয় আলোকিত করেছেন সেই মানুষটির প্রতি, তাঁর জীবন, কর্মের প্রতি ইতিহাসের দায়মুক্তি শুধু সময়ের দাবি নয়, আমাদের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্বও বটে। যেখানে তাঁর এই পরিচয়ের কাছে তাঁর অন্যান্য পরিচয় অত্যান্ত নগণ্য, তবে তা উল্লেখ করা জরুরি, এই মহীয়সী নারীর জন্ম উপমহাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধশালী রাজপরিবারে এক অন্তঃপুরবাসিনী রাজকুমারী হিসেবে, অধুনা ত্রিপুরা রাজ্যে যিনি তখনকার ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সংস্কৃত, ফার্সি ভাষায় পারদর্শী হিসেবে বিবেচিত। চতুর্দশ শতকে তিনি এই অঞ্চলে রাণীমা নামে অধিক পরিচিত ছিলেন, তাঁর অসংখ্য জনহিতকর কাজ এখনো লোকমুখে প্রচলিত।
নির্মাই দেবী অমর হোক, হাজারো প্রণাম জানাই তাঁর জন্মতিথিতে।
লেখা : যুবরাজ দেববর্মা, তরুণ সমাজকর্মী এবং গবেষক মির্মাই দেবী ও শিববাড়ী মঠ।
দ.ক.সিআর.২৫