1. live@kaalnetro.com : কালনেত্র : কালনেত্র
  2. info@www.kaalnetro.com : দৈনিক কালনেত্র :
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৭ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :

সমাজ সংস্কারযোদ্ধা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ মতিউরের গল্প

মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ 
  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬

একদিন পুলিশের পোশাক খুলে যাবে, সরকারি পদ-পদবির পরিচয়ও থেমে যাবে—কিন্তু মানুষের হৃদয়ে অর্জিত ভালোবাসা কি কখনো অবসরে যায়? এই বিশ্বাস বুকে ধারণ করেই ৩৫ বছরের কর্মজীবন শেষে নতুন স্বপ্ন নিয়ে জন্মভূমির মাটিতে ফিরে এসেছেন সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ মতিউর রহমান।

একসময় যিনি ছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে, আজ তাঁর ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু নিজের গ্রাম, গ্রামের মানুষ এবং একটি মানবিক সমাজ গড়ার প্রত্যয়।

সাধারণ পরিবার থেকে পুলিশের দীর্ঘ পথচলা~
১৯৬৬ সালের ৩ ডিসেম্বর রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানার ঘনশ্যামপুর গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা মরহুম সোলায়মান মিয়া ও মাতা মরহুমা সৈয়দা বেগম। গ্রামের পরিবেশেই শৈশব ও শিক্ষাজীবনের শুরু। পরে রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক সম্পন্ন করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগে স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৯০ সালে আউটসাইড ক্যাডেট হিসেবে সাব-ইন্সপেক্টর পদে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন। তবে তাঁর কাছে পুলিশি চাকরি শুধু একটি পেশা কিংবা ক্ষমতার পরিচয় ছিল না; ছিল মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব।

তিনি শুধু পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন না, ছিলেন মানুষের আপনজন~

মোঃ মতিউর রহমানের ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তাঁর বহুমাত্রিক পরিচয়। তিনি শুধু একজন পুলিশ অফিসার ছিলেন না; ছিলেন একজন সাবলীল বক্তা, সংস্কৃতিমনা শিল্পী, আন্তরিক বন্ধু, অভিভাবক এবং অসহায় মানুষের আলোর দিশারি।
কখনো বক্তব্য দিয়ে মানুষকে সচেতন করেছেন, কখনো শিল্প-সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষের আনন্দের অংশীদার হয়েছেন। কখনো বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন, আবার কখনো অভিভাবকের মতো সাহস ও পরামর্শ দিয়েছেন। অধীনস্থ পুলিশ সদস্য থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবার সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।

যেখানেই চাকরি করেছেন, সেখানেই মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেবল দাপ্তরিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিভিন্ন কর্মস্থলে মানুষের আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও জনপ্রিয়তা অর্জন তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। কর্মস্থল বদলেছে, কিন্তু মানুষের সঙ্গে তৈরি হওয়া সম্পর্কের স্মৃতি রয়ে গেছে।

সিডরের ধ্বংসস্তূপে মানবিকতার পরিচয়~
২০০৭ সালে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ১৫ নভেম্বর আঘাত হানে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডর। মুহূর্তেই লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় জনপদ। মানুষের ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়, স্বজন হারানোর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
সেই দুর্যোগে থানা পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেন তিনি। ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করে অসহায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালান।

মঠবাড়িয়ার সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতা আজও তাঁর স্মৃতিতে উজ্জ্বল। তাঁর কাছে সেই সময়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—বিপদের দিনে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।

ভান্ডারিয়া ও মুলাদীতে ভালোবাসার স্মারক~
ভান্ডারিয়ায় দায়িত্ব পালনকালে শিশুদের জন্য সুন্দর পরিবেশ তৈরির চিন্তা থেকে থানা প্রাঙ্গণের সামনে ভান্ডারিয়া থানা শিশু পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। স্থানীয় সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহযোগিতায় উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হয়।

পরবর্তী সময়ে বরিশালের মুলাদী থানায় অফিসার ইনচার্জ এবং সার্কেল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে থানার সামনের স্থানটি পরিচ্ছন্ন ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করার উদ্যোগ নেন। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় জায়গাটি সংস্কার করে “মুলাদী থানা ওসি চত্বর” নামে পরিচিতি পায়।

২০০৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বরিশাল অঞ্চলে কর্মরত অবস্থায় মঠবাড়িয়া, ভান্ডারিয়া ও মুলাদীর মানুষের সঙ্গে তাঁর যে আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তা আজও অমলিন। অনেক পরিচিত মানুষ আজ পৃথিবীতে নেই। তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি সবার জন্য দোয়া করেন।

অবসরের পর শুরু হলো জীবনের নতুন মিশন~
পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে সিলেট টুরিস্ট পুলিশ ও রাজশাহী বিভাগ টুরিস্ট পুলিশে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছরের কর্মজীবন শেষে ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর থেকে অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে (পিআরএল) যান। ফিরে আসেন নিজের শেকড় ঘনশ্যামপুরে। কিন্তু তাঁর কাছে অবসর মানে থেমে যাওয়া নয়; বরং নতুনভাবে মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ। এই ভাবনা থেকেই ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন সামাজিক সংগঠন ‘আমার গ্রাম, আমার ভাবনা’।

স্বপ্নের নাম—আমার গ্রাম, আমার ভাবনা
সংগঠনটির মূল স্লোগান— নিজের গ্রাম, নিজের ভাবনা—গ্রামের উন্নয়নই আমাদের অঙ্গীকার। তাঁর স্বপ্ন, ঘনশ্যামপুর হবে শিক্ষিত, পরিচ্ছন্ন, মাদকমুক্ত, পরিবেশবান্ধব ও মানবিক একটি আদর্শ গ্রাম।

শিক্ষার মানোন্নয়ন, স্বাস্থ্যসচেতনতা, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, বৃক্ষরোপণ, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, যুবসমাজের ইতিবাচক অংশগ্রহণ এবং সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা—এসব বিষয়কে তিনি অগ্রাধিকার দিতে চান।
বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে চান মাদক প্রতিরোধে। তাঁর বিশ্বাস, মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে শুধু আইন নয়, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তাঁর আহ্বান—মাদককে না বলুন, নিজে বাঁচুন, অন্যকে বাঁচান। তিনি জানেন, একার পক্ষে গ্রামের পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই গ্রামের মানুষ, প্রবাসী, শিক্ষক, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, তরুণ প্রজন্ম ও সর্বস্তরের নাগরিককে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে চান।দেশের ৬৮০০০ হাজার গ্রামের পরিবর্তনের আওয়াজ ঘনশ্যামপুর থেকে শুরু হয়ে উদ্যোগটি পরিপূর্নতা পাক।

শেষ পরিচয় হোক মানুষের ভালোবাসায়~
দীর্ঘ কর্মজীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি স্বীকার করেন, দায়িত্ব পালনের সময় কখনো কঠোর হতে হয়েছে। তাঁর কোনো কথা বা আচরণে কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে কষ্ট পেয়ে থাকলে তিনি আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।
তাঁর উপলব্ধি, মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। পদ-পদবি, ক্ষমতা কিংবা পরিচিতি চিরস্থায়ী নয়। স্থায়ী হয়ে থাকে মানুষের জন্য করা ভালো কাজ এবং মানুষের হৃদয়ে অর্জিত ভালোবাসা।

আজ তাঁর সামনে নেই পুলিশের ব্যস্ত কর্মসূচি, নেই সরকারি দায়িত্বের চাপ। আছে নতুন স্বপ্ন, নতুন প্রত্যয় এবং নিজের জন্মভূমির মানুষের জন্য কিছু করার আকাঙ্ক্ষা।

৩৫ বছর আগে যে মানুষটি ঘনশ্যামপুর থেকে কর্মজীবনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছিলেন, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ তিনি আবার সেই মাটিতেই ফিরেছেন—এবার নিজের গ্রামের উন্নয়নের স্বপ্ন নিয়ে।

পুলিশের পোশাক খুলেছে, কিন্তু মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার ফুরায়নি। পদবি বদলেছে, কিন্তু মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ বদলায়নি।
তাঁর জীবনের নতুন পরিচয় তাই শুধু সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নয়; বরং একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, সমাজভাবুক ও নিজের গ্রামের কল্যাণে নিবেদিত মানুষ।

আমার গ্রাম, আমার শেকড়, আমার ভালোবাসা—আমার গ্রাম আমার ভাবনা। কারণ জীবনের সবচেয়ে বড় পদক মানুষের ভালোবাসা, আর সবচেয়ে বড় অর্জন মানুষের কল্যাণে রেখে যাওয়া কিছু ভালো কাজ।

দ.ক/আরএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

© 𝐰𝐰𝐰.𝐤𝐚𝐚𝐥𝐧𝐞𝐭𝐫𝐨.𝐜𝐨𝐦
Theme Customized BY LatestNews