
ইসলামী শরিয়ত ও হাদিসের বিধান অনুযায়ী, স্নেহ-ভালোবাসাবশত নিজের সন্তান বা শিশুদের চুমু খাওয়া পুণ্য ও সুন্নাহসম্মত কাজ হলেও, পরপুরুষ বা কোনো শিক্ষকের জন্য অন্য কোনো শিশুর ঠোঁটে বা কামনাবশত চুমু খাওয়া সম্পূর্ণ হারাম এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। সাম্প্রতিক সময়ে টঙ্গীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ বা চুমু দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে শিশুদের স্নেহ করার হাদিসসম্মত সঠিক নিয়ম এবং শিক্ষকদের সীমানা নিয়ে একটি বিশদ প্রতিবেদন নিচে উপস্থাপন করা হলো:
১. শিশুদের প্রতি স্নেহ প্রদর্শনের সুন্নাহ ও এর সঠিক পদ্ধতি
রাসূলুল্লাহ (সা.) শিশুদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন এবং তাদের চুমু খেয়ে আদর করতেন। তবে হাদিস শরিফে এর স্পষ্ট নিয়ম ও প্রেক্ষাপট বর্ণিত হয়েছে:
স্নেহের চুমু বনাম সামাজিক নিয়ম: আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) একবার হযরত হাসান ইবনে আলী (রা.)-কে চুমু খেলেন। তখন তাঁর কাছে আকরা ইবনে হাবিস (রা.) বসা ছিলেন। আকরা বললেন, ‘আমার ১০টি সন্তান আছে, আমি তাদের কাউকেই কখনো চুমু খাইনি।’ রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, “যে দয়া করে না, তার প্রতিও দয়া করা হয় না।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫১২৮)।
চুম্বনের স্থান: ইসলামী ফিকহ ও ওলামাদের মতে, শিশুদের প্রতি স্নেহ প্রকাশ করতে চাইলে তাদের কপালে বা মাথায় চুমু দেওয়া সুন্নাহসম্মত ও নিরাপদ।
২. শিক্ষক বা পরপুরুষের জন্য শিশুদের চুমু দেওয়ার বিধান ও সীমানা
মাদ্রাসার উস্তাদ বা স্কুলের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে ইসলামী শরিয়তের নিয়ম অত্যন্ত কঠোর:
কঠোর নিষেধাজ্ঞা: কোনো সাধারণ পরপুরুষ, শিক্ষক বা ঘরের বাইরের মানুষের জন্য অন্যের নাবালিকা বা নাবালক শিশুকে ঠোঁটে, গালে বা এমন কোনো স্থানে চুমু দেওয়া বা স্পর্শ করা মোটেও জায়েজ নয় যা সন্দেহের উদ্রেক করে।
ফেতনা ও কুপ্রবৃত্তির প্রতিরোধ (সদ্দে জারিয়াহ): বর্তমান যুগে শিশু নির্যাতন ও বিকৃত মানসিকতার (পেডোফেলিয়া) বিস্তার রোধে ইসলামী আইনজ্ঞরা পরিষ্কার জানিয়েছেন, স্নেহ প্রকাশের নামে কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীর শরীর স্পর্শ বা চুমু খেতে পারবেন না। কোনো শিক্ষকের দায়িত্ব কেবল পাঠদান করা, শারীরিক ভালোবাসা প্রকাশ করা শিক্ষকের কাজ বা এক্তিয়ার নয়।
৩. সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট ও সামাজিক উদ্বেগ
অতি সম্প্রতি টঙ্গীর ‘ক্বারিউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা’র অধ্যক্ষ কর্তৃক এক ৬ বছর বয়সী ছাত্রীকে চুমু দেওয়ার ঘটনা এবং তার প্রেক্ষিতে অভিভাবকের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া আরেকটি ঘটনায় এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিশুকে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের অভিযোগে অভিভাবক কর্তৃক মারধরের ঘটনাও সামনে এসেছে। এই ঘটনাগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে এবং আলেম সমাজও এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে শিক্ষকদের এই ধরনের আচরণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন।
৪. করণীয় ও সুপারিশ
পিতা-মাতার সতর্কতা: সন্তানদের কোন প্রতিষ্ঠানে এবং কার কাছে ইলম বা সাধারণ শিক্ষা অর্জনের জন্য পাঠানো হচ্ছে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
গুড টাচ ও ব্যাড টাচ শিক্ষা: শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ‘নিরাপদ স্পর্শ’ এবং ‘অনিরাপদ স্পর্শের’ পার্থক্য শেখাতে হবে, যাতে কেউ অন্যায়ভাবে তাদের স্পর্শ করলে তারা সাথে সাথে পরিবারকে জানাতে পারে।
আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা: স্কুল বা মাদ্রাসায় কোনো শিক্ষক যদি স্নেহের অজুহাতেও শিশুদের শারীরিক সীমানা লঙ্ঘন করেন, তবে তা ইসলামের দৃষ্টিতেও যেমন অপরাধ, তেমনি দেশের প্রচলিত আইনেও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ ধরনের ক্ষেত্রে ঘটনা ধামাচাপা না দিয়ে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
দ.ক.২৬