
শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা নিয়ে শনিবার (১০ অক্টোবর) উদযাপিত হয় মহালয়া। এ উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বিরাজ করছে ধর্মীয় আবেগ, ভক্তি ও উৎসবের আমেজ। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে চণ্ডীপাঠ, দেবী দুর্গার আবাহন এবং পিতৃপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় তর্পণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মহালয়ার আনুষ্ঠানিকতা। অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির জাগরণের প্রার্থনায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা আসে মহালয়ার মধ্য দিয়ে। মহালয়া দেবী দুর্গার আগমনের ঘোষণা দেয়। এদিন ভোরে শ্রীশ্রী চণ্ডীপাঠের মাধ্যমে মর্ত্যলোকে দেবী দুর্গাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় দেবীপক্ষ। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষকে দেবীপক্ষ বলা হয়। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার দিন দেবী দুর্গা কৈলাসে শ্বশুরালয় ছেড়ে সন্তানদের নিয়ে পৃথিবীতে আসেন। এদিন থেকেই দুর্গাপূজার ক্ষণগণনা শুরু হয়।
মহালয়া পিতৃপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের সূচনাকালের সন্ধিক্ষণ। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, এদিন দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন ঘটে। পিতৃপক্ষের সমাপ্তি এবং দেবীপক্ষের সূচনাকে কেন্দ্র করেই মহালয়া উদযাপিত হয়। মহালয়া শব্দের অর্থ মহান আলয় বা আশ্রয়। মহালয়ার মধ্য দিয়ে অমাবস্যার অন্ধকার পেরিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয় বলে ধর্মীয় বিশ্বাসে দিনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, মহিষাসুরকে বধ করার দায়িত্ব দেবী দুর্গার ওপর অর্পিত হয়। ব্রহ্মার বরপ্রাপ্ত মহিষাসুরকে কোনো মানুষ বা দেবতার পক্ষে বধ করা সম্ভব ছিল না। অসীম ক্ষমতার অধিকারী মহিষাসুর ক্ষমতার দম্ভে একে একে দেবতাদের স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করে। এ পরিস্থিতিতে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব সম্মিলিতভাবে মহামায়ারূপে অমোঘ নারীশক্তির সৃষ্টি করেন। দেবতাদের দেওয়া ১০টি অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সিংহবাহিনী দেবী দুর্গা মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। নয় দিনব্যাপী যুদ্ধের পর তিনি মহিষাসুরকে পরাজিত ও বধ করেন বলে পুরাণে বর্ণিত হয়েছে।
মহালয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পিতৃপুরুষদের স্মরণ ও তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা। হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, এদিন পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করা হয়। অনেকেই গঙ্গাসহ বিভিন্ন নদীর তীরে গিয়ে পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় জল নিবেদন করেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, পিতৃপক্ষের সময়ে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে তাঁদের উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
পুরাণ অনুযায়ী, জীবিত ব্যক্তির পূর্ববর্তী তিন পুরুষ পর্যন্ত পিতৃলোকে অবস্থান করেন। স্বর্গ ও মর্ত্যের মধ্যবর্তী এ লোকের শাসক হিসেবে মৃত্যুর দেবতা যমের কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রচলিত ধর্মীয় বর্ণনা অনুসারে, পরবর্তী প্রজন্মের কারও মৃত্যু হলে পূর্ববর্তী প্রজন্মের একজন পিতৃলোক ছেড়ে স্বর্গে গমন করেন এবং পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হন। এভাবে তিনি শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের ঊর্ধ্বে উঠে যান বলে ধর্মীয় বিশ্বাসে বর্ণিত হয়েছে।
পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, ব্রহ্মার নির্দেশে পিতৃপুরুষেরা ১৫ দিন মনুষ্যলোকের কাছাকাছি অবস্থান করেন। এ বিশ্বাস থেকেই পক্ষকালজুড়ে পিতৃপুরুষদের স্মরণ, শ্রদ্ধা নিবেদন ও তর্পণের রীতি প্রচলিত রয়েছে। মহালয়ার মধ্য দিয়ে পিতৃপক্ষের অবসান ঘটে এবং দেবীপক্ষের সূচনা হয়।
মহিষাসুরকে বধের পৌরাণিক কাহিনি অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। তিন পুরুষের আত্মার শান্তি কামনার পাশাপাশি দেবী দুর্গার আগমনকে ঘিরে ভক্তদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রতিবছর অধীর আগ্রহে মহালয়ার দিনটির জন্য অপেক্ষা করেন। শারদীয় নবরাত্রিকে তাঁরা পবিত্র সময় হিসেবে বিবেচনা করেন। এ সময়ে ভক্তরা দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় প্রতিদিন প্রার্থনা করেন।
মহালয়ার এই পবিত্র দিনে সবার প্রার্থনা—বিশ্বের সব অশুভ শক্তির বিনাশ হোক, শুভ শক্তির উদয় হোক এবং মানুষের জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হোক। সবাইকে শুভ মহালয়ার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
দ.ক/ধর্ম