শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ০২:২২ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ :
বাবার লাশ সৎকার না করেই যুদ্ধে গিয়েছিলেন যে নারী জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে ভোট চাইলেন সজল সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয়, এটি জাতির প্রতি অঙ্গীকার : খায়রুল আলম সুমন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত আহম্মদাবাদ ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী ছালেহ উদ্দিন বাবরু সাতছড়ি সীমান্তে বিজিবি’র ১০ কেজি ভারতীয় গাঁজা জব্দ  ঐতিহ্যবাহী জালালাবাদ এসোসিয়েশন নির্বাচন: দপ্তর সম্পাদক পদে দোয়া ও ভোট প্রার্থী শফিকুল সজল নোয়াখালিতে চুনারুঘাটের দুই মাদক কারবারি আটক মাদরাসায় ছাত্রীদের ফুটবল দল গঠনের নির্দেশনার প্রতিবাদে উদ্বেগ প্রকাশ মুজাহিদ আজমী’র  দেওরগাছ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নির্বাচন: তরুণদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন মারুফ চুনারুঘাটে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের মাঝে সেফটি ইকুইপমেন্ট বিতরণ

বাবার লাশ সৎকার না করেই যুদ্ধে গিয়েছিলেন যে নারী

  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বলতেই সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে অস্ত্রের গর্জন, রণাঙ্গনের বারুদ আর উদাম গায়ের একদল তরুণ মুক্তিযোদ্ধার ছবি। কিন্তু এই সংঘাতের একটা নীরব অধ্যায়ও ছিল, যা লেখা হয়েছিল ফিল্ড হাসপাতাল আর শুশ্রূষাকেন্দ্রে। রণাঙ্গনের বাইরে জীবন বাঁচানোর সেই অলিখিত যুদ্ধে যারা নিজেদের উজাড় করে দিয়েছিলেন, রাজবাড়ীর শিবরামপুর গ্রামের ইরা কর তাঁদেরই একজন।

১৯৭১ সালের ৫ মে ইরা করের জীবনে সবকিছু উলটপালট হয়ে যায়। দিনের আলোতেই বিহারী ও স্থানীয় রাজাকাররা তাঁর বাবা জিতেন্দ্র নাথ করকে হত্যা করে। বাবার লাশ সৎকার করার মতো ন্যূনতম সুযোগটুকুও পায় নি পরিবারটি। বাধ্য হয়েই সব হারিয়ে তাঁরা পা বাড়ান অনিশ্চয়তার পথে; টানা নয় দিন হেঁটে কোনোমতে পৌঁছান ভারত সীমান্তে। সীমান্তে পৌঁছে দূরসম্পর্কের এক স্বজনের সহায়তায় ইরা ও তাঁর বড় বোন গীতা কর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম তালিকাভুক্ত করেন।

নারী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের জন্য তৈরি ‘গোবরা শিবির’-এর প্রথম যে পাঁচজনকে নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল, এই দুই বোন ছিলেন তাঁদের অন্যতম। স্বজন হারানোর বেদনা আর দেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকে নিয়েই শুরু হয় তাঁদের এই নতুন লড়াই। পরবর্তীতে বিভিন্ন শরণার্থী শিবির থেকে আরও নারী এসে এই ক্যাম্পে যুক্ত হতে থাকেন। ইরা করের ভাষায়, সেখানে জমা হয়েছিল “৪০০ মেয়ে, ৪০০ রকমের জীবনের গল্প।” শিরিন বানু মিতিল, লায়লা পারভীন বানু, খাদিজা আখতার কিংবা মনিকা ব্যানার্জির মতো ব্যক্তিত্বরা উঠে এসেছিলেন এই আঙিনায়। সেখানে শুধু অস্ত্র চালানো বা ক্রলিং শেখানো হতো না; চলত গোয়েন্দাগিরি ও রণাঙ্গনের প্রাথমিক চিকিৎসার নিবিড় প্রশিক্ষণ।

প্রশিক্ষণের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ইরা কর জানান, ২ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের কার্যক্রম শুরু হয়। পরিধেয় হিসেবে একটি ধুতি, আর নিত্যব্যবহারের জন্য একটি মগ ও টিনের থালা—এটুকুই ছিল সম্বল। নিরাপত্তা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে রাতে আলো জ্বালানো কিংবা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের ওপর ছিল কড়া নিষেধাজ্ঞা। যাদবপুর ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা সেখানে প্রশিক্ষণ দিতে আসতেন। ফরাসি বা কিউবান বিপ্লবের মতো বিশ্বের ঐতিহাসিক লড়াইয়ের গল্প শুনিয়ে তাঁদের মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখা হতো।

প্রশিক্ষণ পর্ব শেষে তাঁদের হাতে মাত্র ১০ টাকা দিয়ে ১৫ জনের একটি দলকে ট্রেনে তুলে দেওয়া হয় আগরতলা সীমান্তের উদ্দেশে। নানা অসংগতি আর পথভুল পেরিয়ে একসময় তাঁরা যুক্ত হন ঐতিহাসিক বিশ্রামগঞ্জ হাসপাতালে। সেখানে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ক্যাপ্টেন ডা. সেতারা বেগম, ডা. এম. এ. মবিন, ডা. নাজিম ও ডা. মোর্শেদের মতো চিকিৎসকরা তাঁদের স্বাগত জানান এবং সরাসরি চিকিৎসা কার্যক্রমে যুক্ত করেন। সেখানেই ইরা কর পাশে পান সুলতানা কামাল, সাঈদা কামাল, নিলীমা বৈদ্য, বাসনা চক্রবর্তী ও পদ্মা রহমানের মতো সহযোদ্ধাদের।

দিন যত গড়াচ্ছিল, রণাঙ্গন থেকে আসা আহতদের সংখ্যা ততই বাড়ছিল। কারো হাত নেই, কারো পা উড়ে গেছে—এমন সব বিভীষিকাময় দৃশ্যের মুখোমুখি হতে হতো প্রতিদিন। অথচ শারীরিক যন্ত্রণা ছাপিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে মুখে ছিল স্বাধীন স্বদেশের এক অবাস্তব সুন্দর স্বপ্ন। একটু সুস্থ বোধ করলেই তাঁরা আবার রণাঙ্গনে ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে উঠতেন। মৃত্যু যেখানে একদম নিকটবর্তী, সেখানেও অদম্য মনোবল ধরে রাখতে এই স্বেচ্ছাসেবীরা আহতদের দেশাত্মবোধক গান গেয়ে শোনাতেন।

১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও ইরা ও গীতা কর তড়িঘড়ি করে ফিরতে পারেননি। তখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বহু আহত যোদ্ধা। তাছাড়া এতদিন পরিবারের কোনো খবরও তাঁদের জানা ছিল না। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তাঁদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, দেশ স্বাধীন হলেও পুনর্গঠনের লড়াই কেবল শুরু। অবশেষে ১৯৭২ সালের ১৬ জানুয়ারি কুমিল্লার সোনামুড়া সীমান্ত দিয়ে স্বাধীন দেশে পা রাখেন দুই বোন।

রাজবাড়ীর নিজ ভিটায় ফিরে দেখেন ভিটেমাটি একবারে উজাড়। ঘরবাড়ি ভাঙাচোরা, আর তার মধ্যেই কোনোমতে মাথা গুঁজে আছেন পরিবারের ১২ জন সদস্য। বাবা ও কাকা নিহত হওয়ায় আয়ের কোনো পথ ছিল না; দুবেলা দুমুঠো অন্ন সংস্থান করাই তখন এক পর্বতসম চ্যালেঞ্জ।
যে নারী একাত্তরে বাবার শেষকৃত্যটুকু করার সুযোগ পাননি, তিনিই দেশের প্রয়োজনে নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টুকু সঁপে দিয়েছিলেন আহত যোদ্ধাদের সেবায়।

ইতিহাসে এই নীরব সেিক্সটর ও তাঁর নিঃশব্দ আত্মত্যাগ চিরকাল গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

দ.ক.সিআর

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© 𝐰𝐰𝐰.𝐤𝐚𝐚𝐥𝐧𝐞𝐭𝐫𝐨.𝐜𝐨𝐦
Theme Customized By BreakingNews