
কালনেত্র ডেস্ক: “ওহে দিন তো গেলো, সন্ধ্যা হোল, পার করো আমারে,
তুমি পারের কর্তা, শুনে বার্তা, ডাকছি তোমারে…”
হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এমন অসংখ্য গানের স্রষ্টা কাঙাল হরিনাথ মজুমদার। তিনি ছিলেন উনিশ শতকের বাংলা নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ এবং একাধারে কবি, গীতিকার, লেখক, সম্পাদক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, প্রকাশক, সমাজসংস্কারক, সংগঠক ও একাধিক সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা।
বাউল সম্রাট লালন ফকির ছিলেন তাঁর জীবনদর্শনের ভাবগুরু। ‘বিষাদসিন্ধু’-এর রচয়িতা মীর মোশাররফ হোসেন ছিলেন তাঁর শিষ্য। এছাড়াও অক্ষয় কুমার, দীনেন্দ্রনাথ রায় ও জলধর সেন তাঁর শিষ্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। শিলাইদহের তৎকালীন জমিদার জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তাঁর সমসাময়িক। পরবর্তীকালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারির দায়িত্ব নিয়ে শিলাইদহে আসার সময় কাঙাল হরিনাথের বিদায়লগ্ন ঘনিয়ে এসেছিল। লালন শাহ ১৮৯০ সালে এবং কাঙাল হরিনাথ ১৮৯৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। মাত্র ছয় বছরের ব্যবধান। রবীন্দ্রনাথ কাঙাল হরিনাথের কাজ সম্পর্কে অবগত ছিলেন এবং তাঁর প্রায় দুই হাজার পৃষ্ঠার দিনলিপিও পড়েছিলেন।
গ্রামবাংলার সাংবাদিকতার ইতিহাসে কাঙাল হরিনাথের অবদান অনন্য। ১৮৭৯ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে তিনি ‘গ্রামবার্তা’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। অর্থাভাবে এটি বন্ধ হয়ে গেলে রাজশাহীর রাণী স্বর্ণকুমারী দেবীর আর্থিক সহায়তায় ১৮৮২ সাল থেকে পত্রিকাটি আবার নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। ব্রিটিশ শা/সনের অ/ত্যাচারের বিরু/দ্ধে এই পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে লেখা প্রকাশিত হতো। পরে প্রকাশনা আইনের মাধ্যমে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু ব্রিটিশ শাসক কিংবা জমিদারের নায়েব-পেয়াদারা তাঁর গান ও চিন্তার প্রসার থামাতে পারেনি।
তিনি শুধু সাংবাদিকতাই করেননি; প্রত্যন্ত অঞ্চলে বালিকাদের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, ছাপাখানা গড়ে তোলা এবং সমাজসংস্কারমূলক নানা কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা থেকেই প্রথম প্রকাশিত হয় মীর মোশাররফ হোসেনের ‘বিষাদসিন্ধু’। এছাড়া তাঁর নিজের ‘বিজয় বসন্ত’, ‘কবিতা কুমুদী’, ‘চিত্রচপলা’, **‘মাতৃমহিমা’**সহ মোট ১৮টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয় এখান থেকেই। ফকির লালন শাহর প্রায় ২১টি লালনগীতিও প্রথম এমএন প্রেস থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
জোড়াসাঁকোর জমিদার পরিবারের (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষদের) ভূমিদখলের বিরুদ্ধেও তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন। তাঁর বিরামহীন কর্মযজ্ঞের স্মৃতি আজও বহন করে চলেছে কুষ্টিয়ার কুমারখালী।
১৮৩৩ সালের ২০ জুলাই কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীতে জন্মগ্রহণ করেন কাঙাল হরিনাথ, ওরফে হরিনাথ মজুমদার। গতকাল ছিল তাঁর জন্মদিন। একরকম নীরবেই পেরিয়ে গেল দিনটি। অথচ বাংলা সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও সমাজজাগরণে তাঁর অবদান আমাদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই মহান ব্যক্তিত্বের স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
দ.ক.সিআর.২৬