
হাবিব খোকন, হবিগঞ্জ : হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন কৃষক হরেন্দ্র সরকার। চোখে ক্লান্তি, মুখে গভীর হতাশার ছাপ। তার পাশে নিঃশব্দে ভাসছে একটি ছোট নৌকা, যেন তার জীবনের প্রতিচ্ছবি। বাইরে থেকে শান্ত, স্থির; অথচ ভেতরে জমে আছে অগণিত অস্থিরতা, না বলা কষ্ট আর ভাঙা স্বপ্নের ভার।
হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার সুবিদপুর গ্রামের এই কৃষক হরেন্দ্র সরকার চলতি মৌসুমে অনেক আশা নিয়ে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ৪ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেন তিনি। দিন-রাত পরিশ্রম, যত্ন আর স্বপ্নে ভর করে বেড়ে উঠছিল তার ফসল। শস্যে ভরে উঠবে ঘর, ঋণ শোধ হবে, সংসারে ফিরবে স্বস্তি, এমনই ছিল তার আশা।
কিন্তু প্রকৃতির নির্মমতা সেই স্বপ্নকে এক রাতেই গিলে ফেলেছে। আকস্মিক বৃষ্টিতে হাওরের পানি হঠাৎ বেড়ে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে যায় তার পাকা ধানক্ষেত। চোখের সামনে নিজের সমস্ত পরিশ্রম পানির নিচে ডুবে যেতে দেখে অসহায় হয়ে পড়েন হরেন্দ্র।
ভাঙা কণ্ঠে তিনি বলেন, “ঋণ নিয়ে ধান লাগাইছিলাম। আশা ছিল ভালো ফলন হইবো, হইছেও যেমন চাইছিলাম। কিন্তু কেডা জানে! এক রাতেই সব শেষ হইবো! এখন কী করমু বুঝতাছি না।”
তার এই প্রশ্নের উত্তর যেন কারো কাছেই নেই। হাওরের পাড়ে বসে থাকা এই মানুষটির দীর্ঘশ্বাস শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির গল্প নয়! ড়এটি একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবারের আকস্মিক বৃষ্টিতে শুধু হরেন্দ্র নন, সুবিদপুরসহ আশপাশের গ্রামের বহু কৃষকই একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কেউ এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে, কেউ জমি বন্ধক রেখে, আবার কেউ পারিবারিক সঞ্চয় খরচ করে চাষ করেছিলেন। কিন্তু এক রাতের প্রাকৃতিক দুর্যোগে সব হিসাব এলোমেলো হয়ে গেছে।
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রায় প্রতি বছরই আগাম বন্যা বা আকস্মিক বৃষ্টির কারণে ফসলহানির মুখে পড়তে হয় তাদের। তবুও তারা ঝুঁকি নিয়েই চাষ করেন, কারণ এটাই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
এ বিষয়ে স্থানীয় কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাওরাঞ্চলে টেকসই বাঁধ নির্মাণ, সময়মতো পানি নিষ্কাশন এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার না হলে এই ক্ষতি রোধ করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিল ও সরাসরি আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।
এদিকে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কথা জানানো হয়েছে। তবে কৃষকদের দাবি, শুধু তালিকা তৈরি করলেই হবে না, দ্রুত কার্যকর সহায়তা দিতে হবে। না হলে তাদের পক্ষে আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।
হাওরের পাড়ে বসে হরেন্দ্র সরকারের নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস যেন একক কোনো মানুষের নয়। এটি পুরো হাওরাঞ্চলের হাজারো কৃষকের বুকচাপা কষ্ট, ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতিধ্বনি। পানি নামলে হয়তো আবার নতুন করে চাষ শুরু হবে, কিন্তু এই ক্ষতির দাগ মুছে যাবে না সহজে।
লেখক: হাবিব খোকন, নাট্য়কর্মী ও আবৃত্তি শিক্ষক, হবিগঞ্জ
দ.ক.সিআর.২৬