
শোয়েব চৌধুরী, হবিগঞ্জ: পরিবেশ রক্ষায় সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে গাছরোপন কর্মসূচি চালালেও বাস্তবে বন উজাড় থামছে না। হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও রঘুনন্দন পাহাড় এলাকাজুড়ে মূল্যবান গাছ কাটা ও পাচারের অভিযোগ উঠেছে বন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির (সিএমসি) এক সভাপতির নামে।
স্থানীয়রা জানায়, সিএমসির সভাপতি শফিকুল ইসলাম আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে বনাঞ্চলের গাছ কেটে তার মালিকানাধীন অবৈধ সমিলে প্রক্রিয়াজাত করার অভিযোগ রয়েছে। বনের সীমানার মধ্যেই আবুলসহ আরও কয়েকজনের অবৈধ সমিল পরিচালিত হলেও বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি (সিএমসি) মূলত বন ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগ। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী, এই কমিটির লক্ষ্য টেকসই সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ। অথচ সেই কমিটিরই এক নেতার বিরুদ্ধে বন ধ্বংসের অভিযোগ উঠায় উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশেষ সংখ্যা প্রকাশনা
বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, সাতছড়ি এলাকার আশপাশের ৩৮ গ্রামের প্রায় ৩ হাজার ৮৭০ জন ভিসিএফ সদস্য রয়েছে। ২০২৪ সালের মে মাসে তাদের ভোটে সিএমসির সভাপতি নির্বাচিত হন আবুল হোসেন। তিনি মাধবপুর উপজেলার শাহজাহানপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও পরিচিত।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় কিছু অসাধু বন কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে বনাঞ্চল থেকে গাছ পাচার হয়ে আসছেন। বন আইনে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে সমিল স্থাপন নিষিদ্ধ থাকলেও, মাধবপুর উপজেলার রতনপুর ব্রিজের পূর্ব পাশে আবুল হোসেনের একটি অবৈধ সমিল চালু রয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। প্রতিদিন সেখানে সেগুন, মেহগনিসহ বিভিন্ন প্রজাতির মূল্যবান গাছ কেটে তক্তা তৈরি করা হচ্ছে।
স্থানীয় ভ্যানচালক রমিজ মিয়া জানান, এই সমিলে মাসে অন্তত ২০০ থেকে ৩০০টি গাছ চিড়ানো হয়। অধিকাংশ গাছই চুরি করা।
স্থানীয় বাসিন্দা খোকন বলেন, সিএমসি গঠনের পর গাছ চুরি কমবে ভেবেছিলাম, কিন্তু এখনও আগের মতোই চলছে-বরং বেড়েছে।
কলেজ শিক্ষার্থী মোহন দেবের অভিযোগ, দিনের বেলাতেই বনাঞ্চলের ভেতরে গাছ কাটা হয় এবং জড়িতরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত থাকায় কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না।
সাংবাদিক আক্তারুজ্জামান তরফদার বলেন, এসব কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয় ‘শুটকির নৌকায় বিড়াল চকিদার।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আবুল হোসেন জানান, বর্তমানে তার কোনো সমিল নেই। তবে অতীতে অন্যের একটি সমিল ভাড়ায় পরিচালনা করেছেন বলে স্বীকার করেন। রতনপুর এলাকার সমিলের মালিকানা প্রসঙ্গে তিনি তার ভাইয়ের বলে দাবি করলেও বিস্তারিত পরিচয় দিতে রাজি হননি।
মাধবপুর উপজেলা প্রশাসন জানায়, উপজেলায় ১১টি বৈধ সমিল রয়েছে—তালিকায় আবুল হোসেনের নাম নেই।
স্থানীয়রা জানায়, আগে ‘আবুল সমিল’ নামে একটি সাইনবোর্ড থাকলেও সম্প্রতি তা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তাছাড়া তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। চলতি বছরের মার্চে সাতছড়ি উদ্যানে একটি হোটেল মালিকের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে আদালতে মামলা হয়েছে।
একইভাবে এই অভিযোগও অস্বীকার করেছেন আবুল হোসেন।
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে বেড়াতে আসা দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে কিছু হোটেল ও চা স্টল রয়েছে। চলতি বছরের মার্চ মাসে উদ্যানের একটি হোটেল মালিকের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দেওয়ায় মাসুম বিল্লাহর হোটেলে তার নেতৃত্বে হামলা ভাঙচুর চালানো হয়। এ ঘটনায় আবুল হোসেনসহ ১০/১২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে দ্রুত বিচার আইনে মামলা করেছেন হোটেলের মালিক মাসুম।
চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে আবুল বলেন, হোটেলটি অবৈধভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। বনের গাছপালা ও জীবজন্তুর সুরক্ষার জন্য হোটেল উচ্ছেদের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এখন নাকি আবার চালু হয়েছে। পুনরায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে ।
সাতছড়ি রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেহেদি হাসান বলেন, অভিযুক্ত সমিলটি তাদের রেঞ্জের আওতায় নয়, রঘুনন্দন রেঞ্জের অন্তর্ভুক্ত। তিনি স্বীকার করেন, চুনারুঘাট ও মাধবপুরে বনসীমার মধ্যে একাধিক সমিল রয়েছে। এসব বন্ধে বনবিভাগ ও প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে ধরিত্রীর জন্য আমরা (ধরা) হবিগঞ্জ শাখার সভাপতি প্রফেসর ইকরামুল ওয়াদুদ ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, বন রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধেই যখন বন উজাড়ের অভিযোগ ওঠে, তখন তা শুধু আইন ভঙ্গ নয়-ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের ব্যর্থতারও ইঙ্গিত দেয়। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
দ.ক.সিআর.২৬