মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৪ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :

ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি: জগন্নাথপুরের ৫ যুবকের সলিল সমাধি

  • প্রকাশিত: সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬

 

নিজস্ব প্রতিবেদক: পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে এবং উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে দালালের হাত ধরে ইউরোপের পথে পা বাড়িয়েছিলেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার বেশ কয়েকজন যুবক। কিন্তু সেই রঙিন স্বপ্ন মুহূর্তেই বিলীন হয়ে গেল উত্তাল ভূমধ্যসাগরের নোনা জলে। লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে একটি রাবার বোটে করে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে নৌকাডুবি ও চরম অমানবিকতায় সলিল সমাধি হয়েছে জগন্নাথপুরের অন্তত পাঁচ যুবকের।

গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) গ্রিসের বৃহত্তম দ্বীপ ক্রিটের অদূরে এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটে। গ্রিক কোস্ট গার্ডের দেওয়া তথ্যমতে, উদ্ধার হওয়া ২৬ জনের ভাষ্য অনুযায়ী ওই নৌকায় থাকা অন্তত ২২ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৮ জনই বাংলাদেশি। আজ শনিবার (২৮ মার্চ) এই মর্মান্তিক সংবাদ এলাকায় পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

নিহতদের মধ্যে উপজেলার পাইলগাঁও গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে আমিনুর রহমান (৩৫) স্ত্রী ও পাঁচ বছরের একমাত্র কন্যাসন্তান রাইসা আফরিন মাহাকে রেখে গেছেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে আমিনুর আগে প্রাণ ও আকিজ কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। অন্যদিকে, উপজেলার টিয়ারগাঁও গ্রামের আখলুছ মিয়ার ছেলে শায়ক মিয়া (২০) মাত্র তিন মাস আগে সোনালি ভবিষ্যতের আশায় ঘর ছেড়েছিলেন। এছাড়া একই ঘটনায় জগন্নাথপুর উপজেলাধীন ইছগাঁও গ্রামের মোঃ আলী, বাউরি গ্রামের মোঃ সুহানুর এবং জগন্নাথপুর পৌরসভাধীন কবিরপুর গ্রামের মোঃ নাঈমের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, এই ভয়াবহ মানবপাচারের নেপথ্যে রয়েছে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক দালাল চক্র। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে ছাতক থানার দুলাল মিয়া ও তার ভাই বিল্লালের নাম উঠে এসেছে। স্বজনদের অভিযোগ, বিল্লাল মূলত গ্রিসে অবস্থান করে সেখান থেকে দালালি নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করেন। আর দেশে থেকে তার ভাই দুলাল মিয়া সহজ-সরল যুবকদের ইউরোপের প্রলোভন দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কাজে সরাসরি সহযোগিতা করেন। মূলত এই দুই ভাইয়ের গড়ে তোলা ‘মরণফাঁদেই’ পা দিয়েছিলেন আমিনুর ও শায়করা।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা হন আমিনুর। দালাল দুলাল মিয়ার মাধ্যমে ১১ লাখ টাকা চুক্তিতে তিনি এই বিপদসংকুল পথ বেছে নেন। তবে ৩ দিনের মধ্যে গ্রিস পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও দালাল চক্র তাকে দীর্ঘ ৩ মাস লিবিয়ার বিভিন্ন স্থানে আটকে রাখে। এর মধ্যে এক মাস তাকে রাখা হয়েছিল কুখ্যাত ‘গেমঘরে’। সেখানে তাকে খাবার না দিয়ে উপোস রাখা হতো এবং অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো বলে অভিযোগ করেছেন নিহতের শ্যালক জাহিদুর রহমান জাহিদ।

গ্রিক কোস্ট গার্ড ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, গত ২১ মার্চ পূর্ব লিবিয়ার তোবরুক বন্দর থেকে নৌকাটি গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। প্রতিকূল আবহাওয়ায় পথ হারিয়ে টানা ৬ দিন খাবার ও পানীয় ছাড়াই সমুদ্রে ভাসতে থাকায় যাত্রীরা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও চরম ক্লান্তিতে ২২ জনের মৃত্যু হয়। পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো মাঝসমুদ্রেই ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দক্ষিণ সুদানের দুই পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করেছে গ্রিক কর্তৃপক্ষ।

জগন্নাথপুরের এই পাঁচ যুবকের অকাল মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমেছে।

দ.ক.সিআর.২৬

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© 𝐰𝐰𝐰.𝐤𝐚𝐚𝐥𝐧𝐞𝐭𝐫𝐨.𝐜𝐨𝐦
Theme Customized By BreakingNews