মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ০৫:০৫ অপরাহ্ন

সাংবাদিকতার জানাজা; লুৎফুর রহমান হিমেল | মতামত

  • প্রকাশিত: শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬

 

লুৎফুর রহমান হিমেল : উপমহাদেশের সামরিক বাহিনী নিয়ে একটি প্রচলিত কথা আছে—মেজর র‍্যাংক পার হওয়ার পর বাকি সব পদোন্নতি নাকি ‘রাজনৈতিক’। অর্থাৎ লবিং বা প্রভাব খাটাতে না পারলে ক্যারিয়ার ঐ মেজর পদেই থমকে যায়। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে এই তত্ত্বে বিশ্বাসী নই। আমাদের এই অঞ্চলের সামরিক সদস্যরা যথেষ্ট চৌকস এবং আধুনিক। আমার বিশ্বাস, তাদের পদোন্নতি মেধা ও যোগ্যতার নিরিখেই হয়।

বিচিত্র বিষয় হলো আমাদের গণমাধ্যম। এখানে সম্পাদক বা নির্বাহী সম্পাদকের মতো শীর্ষ পদগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মালিকপক্ষের মর্জিনির্ভর। যোগ্যতার নিরিখে নিয়োগের নজির এখানে মেলা ভার। অধিকাংশ মালিকের কাছে সাংবাদিকতা মানে ব্যবসা। তাই তারা এমন লোক খোঁজেন যারা ভালো লবিং করতে পারেন বা সবসময় পায়ের কাছে বসে থাকেন। মালিকের কাছে যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায় সেই ‘লবিং’। হাতেগোনা গুটিকতক ব্যতিক্রম হয়তো আছে, কিন্তু সামগ্রিক চিত্রটা এমনই ধূসর।

গোড়ায় এই গলদের কারণেই আমাদের সাংবাদিকতা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায়নি। প্রযুক্তি হাতের মুঠোয়, মেধাবী সংবাদকর্মীর অভাব নেই, সংবাদের উপাদানের পাহাড় জমে আছে—অথচ এই দেশে নাকি সংবাদের আকাল! প্রতিদিন দেখি প্রথম সারির দু-একটি কাগজ বড়জোর কোনো বিদেশি সংবাদের অনুবাদ করছে, আর বাকিরা অনলাইন থেকে সেটা কপি-পেস্ট করে নিজেদের নাম ভাঙিয়ে চালাচ্ছে। এমনকি দেশীয় সংবাদের ক্ষেত্রেও একই নির্লজ্জতা। ‘দৈনিক বুড়িগঙ্গা’র সংবাদ হুবহু ছেপে দিচ্ছে ‘দৈনিক পদ্মা’। এমন নজিরও আছে যে, কপি করতে গিয়ে মূল পত্রিকার সোর্সের নাম পর্যন্ত কাটতে ভুলে গেছে তারা!

টেলিভিশন ও ভিজ্যুয়াল সাংবাদিকতা তো আরও করুণ। রিপোর্টার ঘটনাস্থল থেকে লাইভ করছেন আর জপছেন—

‘প্রিয় দর্শক, আপনারা দেখতে পাচ্ছেন’,
‘প্রিয় দর্শক, আপনারা কিন্তু দেখতে পাচ্ছেন’
‘প্রিয় দর্শক, আপনারা দেখতে পাচ্ছেন কিন্তু’

দর্শকরা তো টিভি দেখতেই বসেছেন, তারা তো আর অন্ধ নন! টিভি মানেই তো দেখানোর মাধ্যম। সেখানে রিপোর্টারের বারবার কেন বলা যে দেখতে পাচ্ছেন! রিপোর্টারের কাজ হওয়া উচিত ছিল এমন সব তথ্য দেওয়া যা দৃশ্যে নেই, অথচ প্রেক্ষাপটের জন্য জরুরি সেসব বলা। নিজেকে যত কম দেখিয়ে ঘটনার গভীরতা যত বেশি তুলে ধরা যায়, রিপোর্টিং তত সার্থক হয়।

কিন্তু কে শোনে কার কথা! রিপোর্টারদের ধারণা, দর্শক বোধহয় টিভির সামনে বসে পর্দার দিকে না তাকিয়ে পাশে থাকা প্রেমিক-প্রেমিকার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে অপলক!

দেখতে সিংহ সম্পাদক, আসলে বেড়াল!
ম্যানেজমেন্টের কোনো এক বইতে পড়েছিলাম—যোগ্য ম্যানেজার যোগ্য কর্মীকেই খুঁজে নেন, আর অযোগ্যরা চেনে কেবল অযোগ্যদের। অযোগ্য বসদের টিকে থাকার একটি বিশেষ কৌশল আছে। মেধার অভাব ঢাকতে তারা অফিসের ভেতরে নিজেদের হুমকি-ধামকির ‘ভয়ংকর’ চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেন। অকারণে অধস্তনদের ওপর হুঙ্কার ছাড়া, ঝাড়ি দেওয়া আর অফিস কাঁপিয়ে তোলার মাধ্যমে তারা নিজের চারপাশে একটা বর্ম তৈরি করেন। ফলে ভয়ে কেউ আর সেই বর্ম ভেদ করে অযোগ্য কর্তার সেই মেধার শূন্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস পায় না।

আমাদের দেশের সিংহভাগ মিডিয়া মোগলদের মধ্যে আমি এই হুঙ্কারের গুণটা দেখেছি। দপ্তরে তারা একেক জন কেশর ফোলানো সিংহ! অথচ যখন কলম ধরার সময় আসে, তখন তারা কোনো একনায়ককে ‘স্বৈরাচার’ বলতে পারেন না, কোনো চোরকে ‘দুর্নীতিবাজ’ বলার সাহস পান না। মুখে গণতন্ত্রের জপমালা পড়লেও নিজের হাউজে তারা চরম স্বৈরাচারী। তারা অযোগ্যকে বড় পদ দেন, আর হাড়ভাঙা খাটুনি খাটা প্রকৃত সংবাদকর্মীকে প্রমোশন বঞ্চিত করেন, এমনকি তুচ্ছ অজুহাতে ছাঁটাইও করেন।

সাংবাদিকতার জানাযা:
আফসোস হয় তখন, যখন দেখি এই ‘সিংহ’ সম্পাদকরা রাজদরবারে গিয়ে রাজার পেছনে এক কাতারে দাঁড়িয়ে বেড়ালের মতো ছবি তোলেন—একেবারে জানাজা নামাজের ভঙ্গিতে হাত বেঁধে! আসলে তারা তো সাংবাদিকতাকেই মেরে ফেলেছেন। তাই জানাজা পড়ানোটাও তাদের কাজই হওয়ার কথা।

দ.ক.সিআর.২৬

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© 𝐰𝐰𝐰.𝐤𝐚𝐚𝐥𝐧𝐞𝐭𝐫𝐨.𝐜𝐨𝐦
Theme Customized By BreakingNews