
একসময় নদীই ছিল জনপদের প্রাণস্পন্দন। যোগাযোগ, কৃষি সেচ, মাটির উর্বরতা—সবকিছুর নেপথ্যে ছিল নদীর অকৃত্রিম অবদান। নদী মানেই ছিল জীবন, জীবিকা আর সংস্কৃতির ধারক-বাহক। কিন্তু আজ হবিগঞ্জের অসংখ্য নদী, খাল ও জলাশয় যেন তাদের স্বাভাবিক প্রবাহের স্বাধীনতা হারিয়ে ধুঁকছে। ভরাট হয়ে যাচ্ছে চিরচেনা জলপথ, হারিয়ে ফেলছে নাব্যতা; নৌযান চলাচল হয়ে উঠছে অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ।
হবিগঞ্জের উপজেলাগুলো নদীবেষ্টিত। শিরার মতো ছড়িয়ে থাকা ছোট-বড় খাল আর জলাশয় এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্য। কিন্তু নানা কারণে এসব নদী-খাল ভরাট হয়ে চর জেগে উঠছে। প্রাকৃতিক কারণ থাকলেও দৃশ্যমানভাবে মানবসৃষ্ট হস্তক্ষেপই বেশি দায়ী—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্ষা মৌসুমে দেশের উজানে অবস্থিত প্রতিবেশী দেশগুলোতে অধিক বৃষ্টিপাত হলে খরস্রোতা নদীগুলো পাহাড়ি পলি বয়ে আনে। এতে নদীতীর ভাঙে, পলি জমে নাব্যতা কমে। অন্যদিকে নদীপাড়ের নির্বিচার বৃক্ষনিধন মাটির স্থিতি নষ্ট করে ভাঙনকে ত্বরান্বিত করছে। কিন্তু সমস্যার গভীরে রয়েছে মানুষের অবিবেচক কর্মকাণ্ড। অসংখ্য খাল ও জলাশয় দখল করে গড়ে উঠেছে স্থাপনা ও অপরিকল্পিত বাঁধ। স্লুইজগেটের ভেতরে খাল ভরাট হয়ে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভাটিতে স্রোতের গতি কমে গেলে নদীর তলদেশে পলি জমে দ্রুত নাব্যতা হ্রাস পায়।
হবিগঞ্জের নদী-খাল ভরাটের এই সংকটের বাস্তবচিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে জেলার লাখাই উপজেলায় অবস্থিত সুতাং নদীতে। নদীর বুকে ইতোমধ্যে চর জেগে উঠেছে। মাঝনদীতে পলি জমে তৈরি হয়েছে বিস্তীর্ণ চড়, যা স্বাভাবিক প্রবাহকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। বর্তমানে সেখানে ড্রেজিং করে মাটি কাটার কাজ চললেও তা কতটা টেকসই সমাধান দেবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
অন্যদিকে জেলার বিভিন্ন স্লুইসগেটের ভেতরেও একই চিত্র। গেটের ভেতরে পলি জমে খাল ভরাট হয়ে পড়ায় পানি চলাচল প্রায় অনুপযোগী হয়ে গেছে। ফলে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, কৃষিজমিতে সেচ সংকট তৈরি হচ্ছে এবং বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা বাড়ছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ নদী ও জলাশয়ের দু’ধারে অপরিকল্পিত বাঁধ, সড়ক, কলকারখানা, আবাসিক স্থাপনা নির্মাণ এবং পয়ঃনিষ্কাশনের নির্গমনস্থল হিসেবে ব্যবহার নদীর প্রাণশক্তিকে নিঃশেষ করছে। বহু স্থানে ব্রীজ ও কালভার্ট নির্মাণের পর পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ সচল না রাখায় জলাশয় কার্যত মৃত হয়ে পড়ছে।
এর ফল ভয়াবহ। বর্ষাকালে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে দু’কূল উপচে বন্যার প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে কৃষি সেচ ও মাছচাষ ব্যাহত হচ্ছে। প্রাকৃতিক জলাধারের সংরক্ষণ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় শহরাঞ্চলে পানির সরবরাহ সংকটও প্রকট হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক নদীগুলোর ন্যায্য পানিবণ্টন নিশ্চিত করাও জরুরি। নদীকে তার স্বাভাবিক গতিপথে চলতে দেওয়াই টেকসই সমাধানের প্রথম শর্ত।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের চিত্রও। বহু খাল দখল করে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয় জনগণের আন্দোলন, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও প্রশাসনিক নির্দেশনা থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সমন্বয়হীনতা এবং প্রভাবশালীদের চাপের কারণে বহু অবৈধ বাঁধ অপসারণ সম্ভব হয়নি।
সমাধান স্পষ্ট—নদী ও খালগুলো নিয়মিত ড্রেজিং করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে। অপদখলীয় জলাশয় উদ্ধার এবং অপরিকল্পিত বাঁধ অপসারণ জরুরি। কলকারখানার পাশে বাধ্যতামূলক বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন ও নদীতীরবর্তী এলাকায় পরিবেশসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে নদীর পানির সুষম ব্যবহার বাড়াতে হবে। সামাজিক সংগঠন, এনজিও ও সরকারকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিয়ে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
নদী শুধু পানি নয়—নদী এক ঐতিহ্য, এক সভ্যতার ধারক। নদীর মৃত্যু মানে জনপদের মৃত্যু। তাই দক্ষিণাঞ্চলের নদী-খালের আর্তনাদকে অবহেলা করলে তার দায় আমাদের সবার ওপরই বর্তাবে।
নদীকে তার স্বাভাবিক ছন্দে বাঁচতে দিন—তবেই বাঁচবে আমাদের ভবিষ্যৎ।
দ.ক.সিআর.২৬