1. live@kaalnetro.com : কালনেত্র : কালনেত্র
  2. info@www.kaalnetro.com : দৈনিক কালনেত্র :
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩১ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :
নিজেকে গড়ুন, সময়ই আপনার পরিচয় তুলে ধরবে গ্রাম থেকে হারিয়ে যাচ্ছে লেখাপড়া… চুনারুঘাটে ‘স’ মিলে অভিযান: প্রায় সাড়ে ৩৪ ঘনফুট অবৈধ কাঠ জব্দ চুনারুঘাটে প্রধান শিক্ষক আইয়ূব আলীকে অবসর জনিত বিদায় সংবর্ধনা হবিগঞ্জে মামলার আসামি আওয়ামী লীগ নেতা সজীব আলী প্রকাশ্যে, গ্রেপ্তার না হওয়ায় প্রশ্ন মজুরি দাবিতে ৫ চা বাগানে কর্মবিরতি, মালিকপক্ষের দাবি অর্থসংকট চুনারুঘাটে শিক্ষককে শিক্ষার্থীর ঘুসি: অতপর: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যা যা ঘটলো! কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে গরু দিয়ে জমি চাষ ডেঙ্গুর ভয়াবহ থাবায় অক্টোবরেই ১৫৫ মৃত্যু, দায় নেবে কে? নভেম্বরেই প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ড্রেস বিতরণ শুরু

নিজেকে গড়ুন, সময়ই আপনার পরিচয় তুলে ধরবে

মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬

 

মানুষের জীবনে এক অদ্ভুত প্রবণতা রয়েছে। আমরা অনেক সময় যা চাই, তা পাওয়ার জন্য এতটাই মরিয়া হয়ে উঠি যে, সেই আকাঙ্ক্ষার পেছনে ছুটতে ছুটতে নিজের অস্তিত্ব, আত্মমর্যাদা ও স্বকীয়তাকেই হারিয়ে ফেলি। কারও ভালোবাসা পেতে চাই, কারও কাছে গুরুত্বপূর্ণ হতে চাই, কারও স্বীকৃতি কিংবা প্রশংসা পাওয়ার জন্য নিজের সামর্থ্যের চেয়েও বেশি চেষ্টা করি। অথচ একবারও ভেবে দেখি না, অন্যের মনোযোগ পাওয়ার এই নিরন্তর প্রতিযোগিতায় আমরা নিজেদের কতটা অবহেলা করছি।

জীবনের একটি গভীর শিক্ষা হলো—প্রজাপতির পেছনে ছুটে বেড়ানোর চেয়ে নিজের বাগান তৈরি করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

একটি সুন্দর বাগান কখনো প্রজাপতির পেছনে ছুটে বেড়ায় না। সে নিজের মাটিকে উর্বর করে, শিকড়কে শক্ত করে, গাছের যত্ন নেয় এবং সময়মতো ফুল ফোটায়। ফুলের সৌন্দর্য ও সুবাস যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন প্রজাপতি নিজেই সেখানে এসে বসে। বাগানকে প্রজাপতি পাওয়ার জন্য নিজের অস্তিত্ব পরিবর্তন করতে হয় না। বরং নিজের সৌন্দর্য ও স্বাভাবিক বিকাশের মধ্য দিয়েই সে আকর্ষণ তৈরি করে। মানুষের জীবনও অনেকটা তেমনই। নিজের যোগ্যতা, জ্ঞান, ব্যক্তিত্ব, সততা ও মানবিক গুণাবলি বিকশিত করতে পারলে জীবনে সম্মান, ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে মনে রাখতে হবে, আত্মউন্নয়ন কোনো বিনিময়প্রথা নয়। নিজেকে গড়ে তুললেই সবাই ভালোবাসবে কিংবা সম্মান করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু এতে অন্তত নিজের চোখে নিজের মর্যাদা অটুট থাকে।

নিজেকে গড়ুন, অন্যের স্বীকৃতির অপেক্ষায় জীবন থামিয়ে রাখবেন না।
আপনি যদি সম্মান পেতে চান, নিজের চরিত্রকে সমৃদ্ধ করুন। যোগ্যতা অর্জন করতে চাইলে জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ান। জীবনে সফল হতে চাইলে লক্ষ্য নির্ধারণ করুন এবং প্রতিদিন সামান্য হলেও সেই লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যান। মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য নিজের নীতি ও মূল্যবোধ বিসর্জন দেবেন না। সবাইকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে নিজের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও মানসিক শান্তিকে অবহেলা করবেন না। কারণ মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার পোশাক, অর্থবিত্ত, সামাজিক অবস্থান কিংবা বাহ্যিক চাকচিক্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার পরিচয় প্রকাশ পায় চিন্তায়, আচরণে, দায়িত্ববোধে, সততায় এবং অন্য মানুষের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গিতে।

আমেরিকান দার্শনিক ও চিন্তাবিদ রালফ ওয়াল্ডো এমারসনের আত্মনির্ভরতার দর্শন আমাদের নিজের বিবেক, চিন্তাশক্তি ও স্বকীয়তার ওপর আস্থা রাখতে শেখায়। তাঁর দর্শনের মূল শিক্ষা হলো, অন্ধভাবে অন্যকে অনুসরণ না করে নিজের ভেতরের শক্তিকে আবিষ্কার করা। নিজের সিদ্ধান্ত, চিন্তা ও যোগ্যতার প্রতি আস্থা রাখা।

অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করতে করতে অনেক মানুষ নিজের অর্জনের আনন্দটুকুও হারিয়ে ফেলে। কেউ দ্রুত সফল হচ্ছে, কেউ বেশি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, কেউ সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে—এসব দেখে নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে করার কোনো কারণ নেই। কারণ প্রত্যেক মানুষের জীবনযাত্রা, পরিবেশ, সুযোগ, সামর্থ্য ও বিকাশের সময় এক নয়। কারও বসন্ত আগে আসে, কারও আসে একটু পরে।

প্রকৃতির দিকে তাকালেই আমরা এর সুন্দর উদাহরণ দেখতে পাই। একটি গোলাপ, একটি শাপলা কিংবা একটি সূর্যমুখী কখনো অন্য ফুলের মতো হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামে না। প্রত্যেকেই নিজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রস্ফুটিত হয়। অথচ প্রতিটি ফুলেরই রয়েছে নিজস্ব সৌন্দর্য। মানুষের জীবনেও স্বকীয়তার মূল্য ঠিক তেমনই। প্রত্যাখ্যান মানেই অযোগ্যতা নয়, কখনো তা আত্মআবিষ্কারের সূচনা।

এ প্রসঙ্গে ছোটবেলার একটি পরিচিত গল্পের কথা মনে পড়ে—কুৎসিত হাঁসের ছানা বা ‘দ্য আগলি ডাকলিং’।
একটি হাঁসের ছানা জন্ম নেওয়ার পর থেকেই অন্যদের অবহেলা ও উপহাসের শিকার হতে থাকে। তার চেহারা অন্যদের মতো ছিল না বলে কেউ তাকে আপন করে নিতে চাইত না। চারপাশের মানুষের অবজ্ঞা তাকে ক্রমশ একাকী করে তোলে। একসময় সে নিজেকেও অন্যদের তুলনায় অসুন্দর ও অযোগ্য ভাবতে শুরু করে।
অসহ্য অবহেলা ও প্রত্যাখ্যানের কষ্ট নিয়ে সে নিজের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। পথচলায় তাকে নানা প্রতিকূলতা, একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু সময় থেমে থাকে না। সে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। একসময় শীত পেরিয়ে বসন্ত আসে। নিজের প্রতিবিম্ব দেখে সে বিস্মিত হয়। সে বুঝতে পারে, সে সাধারণ কোনো হাঁসের ছানা নয়; সে একটি সুন্দর রাজহাঁস।

যে ছানাটিকে একসময় কেউ গ্রহণ করতে চায়নি, সময়ের সঙ্গে তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশিত হয়েছে।
গল্পটি নিছক শিশুতোষ কাহিনি নয়; এর মধ্যে মানুষের জীবন সম্পর্কে গভীর একটি বার্তা রয়েছে। আমরা অনেক সময় অন্যের চোখ দিয়ে নিজেদের বিচার করি। কেউ গুরুত্ব না দিলে নিজেকে মূল্যহীন ভাবি, কেউ প্রত্যাখ্যান করলে নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ করি, কেউ অবহেলা করলে নিজের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলি। অথচ অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি সব সময় আমাদের প্রকৃত পরিচয়ের নির্ভুল মাপকাঠি হতে পারে না।

কখনো কখনো আমরা ভুল পরিবেশে থাকি, ভুল মানুষের কাছে নিজের মূল্য খুঁজতে যাই কিংবা এমন জায়গায় গ্রহণযোগ্যতা প্রত্যাশা করি, যেখানে আমাদের গুণাবলি বোঝার মতো মানসিকতা নেই। এর অর্থ এই নয় যে, আমাদের মধ্যে কোনো সম্ভাবনা নেই।
তবে এই গল্পের শিক্ষা এমন নয় যে, প্রত্যেক প্রত্যাখ্যাত মানুষ একদিন রাজহাঁস হয়ে উঠবে কিংবা সময় এলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। বরং এর শিক্ষা হলো—নিজেকে জানার, নিজের সামর্থ্য আবিষ্কারের এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও বিকশিত হওয়ার চেষ্টা কখনো বন্ধ করা উচিত নয়।
নিজের বাগান তৈরি করা মানে শুধু সফল হওয়া নয়, মানুষ হয়ে ওঠা।

আমাদের সমাজে সফলতার একটি প্রচলিত সংজ্ঞা রয়েছে। অর্থ, সম্পদ, ক্ষমতা, পদ-পদবি ও সামাজিক পরিচিতিকে অনেক সময় মানুষের যোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু একজন মানুষ অর্থবিত্তে সমৃদ্ধ হয়েও মানবিকতায় দরিদ্র হতে পারেন। আবার একজন সাধারণ মানুষও সততা, বিবেক, দায়িত্ববোধ ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে অসাধারণ হয়ে উঠতে পারেন। তাই নিজের বাগান তৈরি করার অর্থ শুধু অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া নয়। এর অর্থ নিজের চিন্তাকে পরিশীলিত করা, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা, মানুষের দুঃখ-কষ্ট উপলব্ধি করা এবং নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা।

নিজেকে এমনভাবে গড়ে তুলুন, যেন আপনার উপস্থিতি মানুষের মনে ইতিবাচক অনুভূতি সৃষ্টি করে। আপনার কথার চেয়ে কাজের মূল্য বেশি হয়। আপনার প্রতিশ্রুতির চেয়ে দায়িত্ব পালন বড় হয়ে ওঠে। আপনার পরিচয়ের চেয়ে আপনার চরিত্র মানুষের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

জীবনে ভালোবাসা চাইবেন, কিন্তু ভালোবাসার জন্য আত্মসম্মান বিকিয়ে দেবেন না। সম্মান চাইবেন, কিন্তু সম্মান পাওয়ার জন্য অহংকারী হবেন না। সফলতা চাইবেন, কিন্তু সফলতার পথে মানবিকতা হারাবেন না। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়বেন, কিন্তু নিজের স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়ে নয়।

মনে রাখবেন, আত্মবিশ্বাস মানে নিজেকে সবার চেয়ে বড় মনে করা নয়; বরং নিজের সীমাবদ্ধতা জেনেও নিজেকে উন্নত করার সাহস রাখা।

জীবন কোনো নির্দিষ্ট প্রতিযোগিতার নাম নয়, যেখানে সবাইকে একই সময়ে একই গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। কারও জীবনে সাফল্য আসে অল্প বয়সে, কারও জীবনে আসে দীর্ঘ অপেক্ষার পর। কেউ সহজে সুযোগ পায়, কাউকে প্রতিটি সুযোগের জন্য সংগ্রাম করতে হয়। তাই নিজের জীবনকে অন্যের জীবনের সঙ্গে তুলনা না করে নিজের গতকালকে আজকের সঙ্গে তুলনা করুন। আজ আপনি কতটুকু শিখলেন, কতটুকু বদলালেন, কতটুকু ভালো মানুষ হতে পারলেন—সেটিই হোক আপনার অগ্রগতির মাপকাঠি।

শেষ পর্যন্ত নিজের কাছেই নিজের জবাবদিহি করতে হবে।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ হয়তো তার পেছনে কতজন ছুটেছে, কতজন প্রশংসা করেছে কিংবা কতজন তাকে গুরুত্ব দিয়েছে, তার হিসাব করবে না। বরং ভাববে, নিজের জীবনকে কতটা অর্থবহ করতে পেরেছে, কতটা স্বপ্ন পূরণ করেছে, কত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং নিজের বিবেকের কাছে কতটা স্বচ্ছ থাকতে পেরেছে। তাই প্রজাপতির পেছনে ছুটে নিজের সময়, শক্তি ও সম্ভাবনাকে নিঃশেষ করবেন না। নিজের বাগান তৈরি করুন। জ্ঞানের আলোয় চিন্তাকে সমৃদ্ধ করুন, পরিশ্রম দিয়ে যোগ্যতার ভিত গড়ে তুলুন, সততা দিয়ে চরিত্রকে সুন্দর করুন এবং মানবিকতা দিয়ে নিজের ব্যক্তিত্বকে সুবাসিত করুন। হয়তো আপনার বাগানে সব ঋতুতে ফুল ফুটবে না। কখনো খরা আসবে, কখনো ঝড় আসবে, কখনো কিছু ফুল ঝরে পড়বে। তবুও যত্ন নেওয়া বন্ধ করবেন না। কারণ প্রতিকূলতা জীবনের অংশ, আর নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগও জীবনেরই অংশ।

মনে রাখবেন, প্রজাপতি আসুক কিংবা না আসুক, একটি সুন্দর বাগানের নিজস্ব মূল্য কখনো কমে যায় না।

জীবনের প্রকৃত সার্থকতা সবাইকে মুগ্ধ করার মধ্যে নয়; বরং নিজের সম্ভাবনাকে বিকশিত করে এমন একজন মানুষ হয়ে ওঠার মধ্যে, যাকে নিয়ে নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে গর্ব করা যায়।
অতএব, অন্যের স্বীকৃতির অপেক্ষায় নিজের জীবন থামিয়ে রাখবেন না। নিজের পরিচয় নিজেই তৈরি করুন। প্রজাপতির পেছনে নয়, নিজের বাগান গড়ে তোলার কাজে মনোযোগ দিন।

একদিন হয়তো দেখবেন, আপনার জীবনের সৌন্দর্য অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য নয়, বরং নিজের অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলার জন্যই যথেষ্ট।

দ.ক.২৬

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

© 𝐰𝐰𝐰.𝐤𝐚𝐚𝐥𝐧𝐞𝐭𝐫𝐨.𝐜𝐨𝐦
Theme Customized BY LatestNews