
হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায় মাতৃত্বকালীন ভাতা কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্বাচন নিয়ে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় নারীরা অনলাইনে আবেদন করেও ভাতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মাধ্যমে প্রস্তুত করা তালিকায় নাম না থাকায় অনেক আবেদনকারীকে ভাতা না পেয়েই বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে।
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী অনলাইনে আবেদন করলেও শেষ পর্যন্ত ইউনিয়ন পরিষদের তালিকায় নাম থাকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে কোনো কোনো জনপ্রতিনিধি নিজেদের পছন্দের ও পরিচিত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রকৃত অসচ্ছল নারীদের একটি অংশ সরকারি সহায়তার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অনলাইনে আবেদন করার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে যোগাযোগ করেও অনেকেই জানতে পারেন, তাদের নাম তালিকায় নেই। পরে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার দপ্তরে যোগাযোগ করলেও ইউনিয়ন কমিটির পাঠানো তালিকার বাইরে নতুন করে নাম অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই বলে জানানো হয়।
এতে প্রশ্ন উঠেছে—অনলাইনে আবেদন করার পরও যদি ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রস্তুত করা তালিকায় নাম না থাকায় একজন প্রকৃত দরিদ্র নারী বাদ পড়ে যান, তাহলে তার আবেদন ও যোগ্যতা যাচাইয়ের কার্যকর সুযোগ কোথায়?
এ বিষয়ে বাহুবল উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা এটিএম মোহিতুল বলেন, ইউনিয়ন কমিটি কর্তৃক প্রেরিত তালিকা উপজেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করতে পারে। তবে ইউনিয়ন কমিটি কর্তৃক প্রেরিত তালিকায় যে নাম নেই, সেই নাম তিনি নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন না।
তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত যোগ্যতা যাচাই-বাছাই করার প্রাথমিক দায়িত্ব ইউনিয়ন কমিটির। এই কমিটিও সরকার নির্ধারিত। চেয়ারম্যান কমিটির সভাপতি এবং ইউপি সদস্যরা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তবে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে কাউকে তালিকাভুক্ত করার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, কমিটির সব সদস্যের সমন্বয়ে তালিকা তৈরি করার কথা। এর ব্যত্যয় ঘটলে তথ্য-প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ করা হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনলাইনে আবেদন করার বিষয়টি অনেকের কাছে সরকারি ভাতা পাওয়ার প্রাথমিক নিশ্চয়তা হিসেবে বিবেচিত হলেও বাস্তবে ইউনিয়ন কমিটির তালিকায় নাম না থাকলে তারা চূড়ান্ত সুবিধাভোগী হতে পারছেন না।
তাদের প্রশ্ন, অনলাইনে আবেদন করা নারীদের মধ্য থেকে কারা যোগ্য, কারা অযোগ্য—এটি কি প্রতিটি ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে যাচাই করা হচ্ছে? আর যোগ্য হয়েও কোনো নারী ইউনিয়ন কমিটির তালিকায় স্থান না পেলে তার আপত্তি বা আবেদন পুনর্বিবেচনার ব্যবস্থা কতটুকু কার্যকর?
অভিযোগকারীরা আরও বলছেন, অনেক দরিদ্র নারী সরকারি নিয়ম-কানুন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় চেয়ারম্যান বা ইউপি সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ফলে তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা না থাকলে প্রকৃত সুবিধাভোগী বাদ পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
এমনই একজন ভুক্তভোগী বাহুবল উপজেলার মিরপুর ইউনিয়নের পশ্চিম জয়পুর গ্রামের উজ্জ্বল মিয়ার স্ত্রী সিফা আক্তার। তিনি একজন গর্ভবতী নারী। সিফা আক্তার জানান, গত ৪ জুন তিনি অনলাইনে মাতৃত্বকালীন ভাতার জন্য আবেদন সম্পন্ন করেন। আবেদন সম্পন্ন করার পর তিনি আবেদনকারীর সারসংক্ষেপও সংগ্রহ করেন।
তবে আবেদন করার পর সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয়, নির্ধারিত কোটা পূরণ হয়ে গেছে; নতুন করে আবেদন গ্রহণের সুযোগ নেই। ফলে অনলাইনে আবেদন সম্পন্ন করেও তিনি এখন পর্যন্ত মাতৃত্বকালীন ভাতার সুবিধা পাননি বলে অভিযোগ করেন।
সিফা আক্তারের প্রশ্ন, অনলাইনে আবেদন গ্রহণের পর যদি নির্ধারিত কোটা পূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে আবেদন গ্রহণের আগে এ বিষয়ে আবেদনকারীদের জানানো হয়নি কেন? আর একজন গর্ভবতী নারী অনলাইনে আবেদন সম্পন্ন করার পরও যদি শুধু তালিকায় নাম না থাকার কারণে সুবিধা থেকে বাদ পড়েন, তাহলে তার আবেদন ও যোগ্যতা পুনর্বিবেচনার সুযোগ কোথায়?
সিফা আক্তারের মতো আরও কতজন নারী অনলাইনে আবেদন করেও চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাননি, সেটিই এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে ইউনিয়নভিত্তিক আবেদনকারী, নির্বাচিত সুবিধাভোগী এবং বাদ পড়া আবেদনকারীদের তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা এটিএম মোহিতুলের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন কমিটি কর্তৃক প্রেরিত তালিকার বাইরে নতুন করে নাম অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ তার নেই। তবে সরকারি নির্ধারিত যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রাথমিক দায়িত্ব ইউনিয়ন কমিটির এবং ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে তালিকা করার সুযোগ নেই। কোনো অনিয়মের তথ্য-প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উজ্জ্বল রায় জানিয়েছেন, মাতৃত্বকালীন ভাতা কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচন নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী হওয়ার কথা। কোনো আবেদনকারী অনলাইনে আবেদন সম্পন্ন করার পরও কাগজপত্র জমা দিতে না পারা কিংবা নির্ধারিত সময়সীমার আগেই তালিকা চূড়ান্ত করার অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
সরকারি সহায়তার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় নারীদের সহায়তা করা। কিন্তু সুবিধাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে যদি স্থানীয় পর্যায়ে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বা প্রভাব কাজ করে, তাহলে প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তিরা বাদ পড়তে পারেন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তাই বাহুবল উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে মাতৃত্বকালীন ভাতার জন্য কতজন আবেদন করেছেন, কতজনকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়েছে, কতজন বাদ পড়েছেন এবং বাদ দেওয়ার কারণ কী—এসব তথ্য প্রকাশের দাবি উঠেছে।
একই সঙ্গে অনলাইনে আবেদন করেও তালিকায় স্থান না পাওয়া নারীদের আবেদন পুনরায় যাচাই, ইউনিয়ন কমিটির তালিকা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ এবং অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউনিয়ন কমিটি ও উপজেলা কমিটির দায়িত্ব, যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া এবং সুবিধাভোগী নির্বাচনের তথ্য জনসম্মুখে স্পষ্ট করা হলে এ কর্মসূচি নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি ও অভিযোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
দ.ক.সিআর.২৬