
পরিবর্তনশীল সমাজে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়। যেমন হয়েছে চুনারুঘাট উপজেলার আহম্মদাবাদ ইউনয়নের ঘনশ্যামপুর গ্রামের মানিক হাজী সাহেবের জীবনের। তার শিক্ষা দীক্ষা, আর্থিক অবস্থা ও সামাজিক অবস্থান ব্যক্ত করার মতো তেমন কিছুই ছিলনা। গ্রামের স্বপ্নহীন সাধারণ শ্রমিকের মতো কাটছিল জীবনসংসার। একছেলে প্রবাসে যাওয়ার পর একে একে আরও কয়েক ছেলে প্রবাসে যাওয়ায় আমূল এক পরিবর্তন আসে তার অনাড়ম্বর জীবনে।
এতে বিস্তর জমিজামা ক্রয় করেন, রঙ্গিন দালান কোটা গড়েন, রিক্সা ভর্তি বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাড়ি ফেরার অবস্থানে পৌছান।
তখন ৪জন ছেলে প্রবাসী হলেও বাড়িতে আরও ছিল ছোট ছোট তিন জন। এরমধ্যে ফয়সল আহমেদও একজন। যিনি বাড়িতে থাকা ছেলেদের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। সে সুবাধে সামাজিক আচার অনুষ্ঠান সহ প্রায় সবকিছুতে ফয়সলই সেসবের দায়িত্ব পালনে জড়িয়ে পড়েন। পরিচিত হয়ে উঠেন। এলাকার সম্ভ্রান্ত ঘরের ভদ্র ছেলেরা হয়ে উঠেন তার বন্ধু।
অপরদিকে সফল প্রবাসী পরিবারের সুদিনে ফয়সল লেখাপড়ায়ও ছিল এগিয়ে। স্কুল কলেজ পেরিয়ে বিবিএ পড়তে রাজধানীর ডেপোডিল ইউনিভার্সিতে পৌছায়। যা ফয়সলের বংশের কেও আজ অবদিও ওইটুকু পর্যন্ত লেখা পড়া করে পৌছাতে পারেনি।
জীবনের নিয়মে প্রেমও হয় ফয়সলের। বাধেন সংসার। দায়িত্ব বাড়ায় ডরুণদের ফ্যাশনেবল পোষাক ব্যবসায় নামেন। পরবর্তিতে রেডিমিট মালয়শিয়ান লিকার ফার্নিচার ব্যবসা নিয়ে শহর ছেড়ে ফিরেন গ্রামের বাজারে। সম্পর্ক তৈরি হয় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যবসায়িদের সাথে। এরমধ্যে ছিলেন বর্ডার ব্যবসায়িও। শুধু করেন বর্ডায় দিয়ে গরু, চা পাতা, কামটিক্সস সহ ভারতীয় পণ্যের আমদানি। ধীরে ধীরে দূর্নাম ছড়ায় মাদক ব্যবসারও। কিন্তু ওই দূর্নাম ছড়ায় পারিবারিক বিরোধ থেকেই!
তখন প্রতিকূলতা, ব্যর্থতা, কিংবা সামাজিক ও ব্যক্তিগত সংকট কাটিয়ে উঠার এক চ্যালেঞ্জ এসে ফয়সলের সামনে দাড়ায়। তখন বিষাদের গর্তে না হারিয়ে আবার মূল স্রোতে ফিরে আসতে ফয়সলও প্রবাসে চলে যান- অল্প দিনেই সে ঘুরে দাড়ায়- এখন সে একজন সফল প্রবাসী; রেমিটেন্টস যোদ্ধা!
বিষয় হলো- মানুষ ভুল করে। কখনো আবেগের বশে, কখনো অজ্ঞতায়, কখনো পরিস্থিতির চাপে। জীবনের কোনো এক সময়ে এমন সিদ্ধান্তও মানুষ নিয়ে ফেলতে পারে, যার জন্য পরে নিজের কাছেই অনুতপ্ত হতে হয়। কিন্তু মানুষের সৌন্দর্য শুধু ভুল না করার মধ্যে নয়, ভুল বুঝে ফিরে আসার মধ্যেও।
একটি ভুল কখনো কখনো মানুষের জীবনের শেষ অধ্যায় নয়, বরং নতুন একটি অধ্যায়ের শুরু হতে পারে। তাই জীবনে ভুল হয়ে গেলে সব দরজা বন্ধ হয়ে যায় না। অনুতাপ ও সংশোধনের মাধ্যমে মানুষ আবারও সুন্দর পথে ফিরতে পারে। কিন্তু আমাদের সমাজে একজন মানুষ সত্যিকার অর্থে বদলে গেলে তাকে আমরা কতটা গ্রহণ করি? একজন তরুণ একসময় ভুল পথে ছিল, পরে নিজেকে সংশোধন করেছে। কেউ জীবনের একটি ভুল সিদ্ধান্ত থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুনভাবে পথ চলেছে। কেউ খারাপ অভ্যাস ছেড়ে ভালো জীবন বেছে নিয়েছে। কেউ দীর্ঘদিন ইবাদত থেকে দূরে থাকার পর আল্লাহর দিকে ফিরে এসেছে। অথচ আমরা অনেক সময় তার বর্তমানকে না দেখে বলে বসি, ও তো আগে এমন ছিল। যেন অতীতের একটি ঘটনা মানুষের পুরো পরিচয় হয়ে যায়। অথচ মানুষ সময়ের সঙ্গে বদলায়। কয়েক বছর আগে যে মানুষটি ছিল, আজ সে একই মানুষ নাও হতে পারে। তার চিন্তা বদলাতে পারে, অভ্যাস বদলাতে পারে, জীবনযাপন বদলাতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, তার অন্তরে পরিবর্তন আসতে পারে। আর অন্তরের এই পরিবর্তনই মনুষত্বের সৌন্দর্য।
একজন মানুষ যখন নিজের ভুল বুঝে আন্তরিকভাবে ফিরে আসে, তখন তার অতীতের পাশাপাশি তার বর্তমান ও ভবিষ্যৎকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সমাজের ক্ষেত্রেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো দরকার। আমরা কোনো মানুষের পতনের গল্প শুনতে যতটা আগ্রহী, তার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প শুনতে ততটা আগ্রহী নই। অথচ একজন মানুষ যখন অন্ধকার ছেড়ে আলোর পথে আসে, সেটি শুধু তার নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্যও আশার সংবাদ। যে তরুণ খারাপ সঙ্গ ছেড়ে ভালো পথে এসেছে, তাকে উৎসাহ দেওয়া দরকার। যে ব্যক্তি হারাম উপার্জন ছেড়ে হালাল জীবনের চেষ্টা করছে, তার পরিবর্তনকে সম্মান করা দরকার। যে মানুষ আল্লাহর দিকে ফিরে এসেছে, তাকে বারবার তার অতীত মনে করিয়ে নিরুৎসাহিত করার বদলে ভালো পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করা উচিত।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এ বিষয়ে আমাদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। মানুষের পুরোনো ছবি, বক্তব্য বা মন্তব্য খুঁজে বের করা এখন খুব সহজ। কিন্তু কোনো কিছু খুঁজে পাওয়া আর তা প্রকাশ করার নৈতিক অধিকার পাওয়া এক বিষয় নয়। কোনো তথ্য প্রকাশ করা যদি মানুষের অধিকার রক্ষা করে বা গুরুতর অন্যায় থেকে সতর্ক করে, তাহলে সেটি আলাদা বিষয়। কিন্তু শুধু কাউকে অপমান করা, হাসির পাত্র বানানো কিংবা তার বর্তমান পরিচয়কে অস্বীকার করার জন্য অতীত টেনে আনা কোনো সুন্দর সামাজিক আচরণ নয়। আমাদের কথা এমন হওয়া উচিত, যা মানুষকে ভালো হওয়ার সাহস দেয়, হতাশ করে না।
একটি সমাজের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু সেখানে কতজন ভালো মানুষ আছে, তা দিয়ে বোঝা যায় না। বরং এটাও দেখতে হয়, সেখানে ভুল করা মানুষকে কীভাবে দেখা হয়। যে সমাজ সংশোধনের সুযোগ দেয়, সেখানে মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করে ফিরে আসার সাহস পায়। আর যে সমাজ একটি ভুলের কারণে মানুষকে চিরদিনের জন্য চিহ্নিত করে রাখে, সেখানে মানুষ অনেক সময় নিজের ভুল লুকিয়ে রাখতে শেখে। তাই একজন মানুষের পরিবর্তনকে উৎসাহিত করা শুধু তার ব্যক্তিগত উপকার নয়, সমাজেরও কল্যাণ।
আমাদের নিজেদের কথাও ভাবতে হবে। আমরা কেউই নিখুঁত নই। আজ যে মানুষের ভুল নিয়ে আমরা কথা বলছি, আগামীকাল হয়তো আমাদেরও কোনো ভুলের জন্য অন্যের সহানুভূতি প্রয়োজন হতে পারে। আমরা চাই, আমাদের ভুলের পর মানুষ আমাদের পরিবর্তনটুকু দেখুক, অনুতাপকে মূল্য দিক এবং নতুনভাবে শুরু করার সুযোগ দিক। তাহলে অন্যের ক্ষেত্রেও একই মানবিকতা দেখানো উচিত।
জীবনের সবচেয়ে সুন্দর পরিবর্তনগুলো অনেক সময় নীরবে ঘটে। একজন মানুষ হয়তো একা একা নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হচ্ছে। কেউ হয়তো দীর্ঘদিনের একটি খারাপ অভ্যাস ছাড়ার চেষ্টা করছে। কেউ হয়তো আজ প্রথমবার সত্যিকার অর্থে আল্লাহর কাছে ফিরে এসেছে। বাইরে থেকে আমরা তার অন্তরের এই পরিবর্তন দেখতে নাও পারি। তাই কারও সম্পর্কে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিয়ে তার জন্য কল্যাণের দোয়া করা এবং ভালো পথে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেওয়া উত্তম।
আমাদের সমাজে তাই শুধু কে ভুল করেছে এই প্রশ্ন নয়, কে ভুল থেকে ফিরে এসেছে’ এই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। শুধু পতনের গল্প নয়, ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পও সামনে আসা দরকার। শুধু ভুল দেখানো নয়, সঠিক পথের দিকটিও দেখাতে হবে। কারণ একটি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরিয়ে আনা, তাকে ভালো হওয়ার সাহস দেওয়া এবং আল্লাহর রহমতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া নিঃসন্দেহে একটি বড় মানবিক কাজ।
শেষ পর্যন্ত মানুষের অতীত তার জীবনের একটি অধ্যায়, পুরো বই নয়। একটি ভুল তার জীবনের একটি ঘটনা হতে পারে, কিন্তু সেই ভুলের পর তার অনুতাপ, তওবা, পরিবর্তন ও ভালো হয়ে ওঠার চেষ্টা তার পরবর্তী অধ্যায়। আমরা যদি শুধু পুরোনো পৃষ্ঠা খুলে বসে থাকি, তাহলে নতুন পৃষ্ঠায় কী লেখা হয়েছে তা আর দেখা হবে না। তাই নিজের ভুল হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসি। অন্য কেউ ভুল করলে তাকে ভালো পথে ফেরার উৎসাহ দিই।
যে মানুষ বদলে গেছে, তার পরিবর্তনকে সম্মান করি। যে এখনও সংগ্রাম করছে, তার জন্য দোয়া করি। মনে রাখি, আল্লাহর রহমতের দরজা আমাদের ধারণার চেয়েও বিস্তৃত।
সুতরাং অতীত মানুষের শেষ পরিচয় নয়, মানুষের বর্তমান কর্মই তার আসল পরিচয় নির্ধারণ করে।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক