
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারে নদীর বুকে জেগে ওঠা চর ও সরকারি খাসজমি নিজেদের সম্পত্তি দাবি করে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর চর দখল করে বিক্রির মাধ্যমে এরই মধ্যে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা। অন্যদিকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এসব চর ও জমি কিনে প্রভাবশালীরা বালু উত্তোলন করছেন। এতে নদীর গতিপথ পরিবর্তনসহ তীরবর্তী কয়েকটি গ্রামের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে জানা গেছে, উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের সোনালী চেলা নদীতে দীর্ঘদিন ধরে নদীর চর ও সরকারি খাসজমি বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, নদীর বুকে জেগে ওঠা এসব চর ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি হিসেবে দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। পরে ক্রেতারা সেখানে বালু উত্তোলন করছেন।
স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর আগেও নদীর তীরবর্তী এলাকায় জমি প্রতি ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা দরে বিক্রি হতো। বর্তমানে একই এলাকার জমির দাম বেড়ে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নদীর চর ও সরকারি খাসজমি বিক্রির মাধ্যমে রাতারাতি বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন অনেকে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সৈকত আলী, মোহাম্মদ আলী, ছাতকের বুলবুল হাজী, হাজী স্বপন মিয়া, স্থানীয় ইউপি সদস্য ফয়েজ উদ্দিন, ছেনু মিয়া, ইমরান আহমদ, ইয়াকুব আলী, খুরশিদ, নিদান ও দেলোয়ার হোসাইনসহ কয়েকজন এসব চর ও জমি কিনে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত। তারা সবাই আওয়ামিলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় ছাত্রদল নেতা মাহবুবুল হক শামিম, যুবদল নেতা হেলাল আহমদ,বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম (নুরু),খুরশেদ আলমের বিরুদ্ধে।
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নদীর চরের সরকারি খাসজমি নিজেদের দাবি করে বিক্রির মাধ্যমে কয়েকটি পরিবার বিপুল অর্থ নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে সোনাপুর গ্রামের আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে ছাতকের গণেশপুর এলাকার বুলবুল হাজীর কাছে ১ কোটি ২৬ লাখ টাকার জমি বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, নদীর চর বিক্রির কার্যক্রম শুরু হয় স্থানীয় ইউপি সদস্য ও বিএনপি নেতা ধন মিয়া ও তাঁর ভাতিজা জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে। সোনাপুর গ্রামের কলাবাগান এলাকা থেকে প্রায় ২ কোটি টাকার সরকারি খাসজমি কোম্পানীগঞ্জের সৈকত আলী ও মোহাম্মদ আলীর কাছে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তাঁদের বিরুদ্ধে দোয়ারাবাজার ভূমি অফিস ও ছাতক পরিবেশ অধিদপ্তর-সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ ও মামলা রয়েছে।
এ ছাড়া পূর্ব সোনাপুর গ্রামের ছেনু মিয়ার বিরুদ্ধে ৬২ লাখ টাকা, হাজী সুলতানের বিরুদ্ধে ১৬ লাখ টাকা, ইয়াকুব আলীর বিরুদ্ধে ১২ লাখ টাকা এবং মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকার চর বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। সোনাপুর গ্রামের ইদ্রিস মিয়াসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, পূর্ব সোনাপুর গ্রামের কুদ্দুস মিয়ার ছেলে দেলোয়ার, মিয়া জানের ছেলে লিল ও শাহিন মিয়া, সায়ু মিয়ার ছেলে শফিকুল ইসলাম, চমক আলীর ছেলে সম্রাট মিয়া এবং হাইমুল্লার ছেলে মাফজ আলীসহ আরও অনেকে নদীর চর বিক্রি করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। পাশাপাশি তাঁদের কেউ কেউ নিজেরাও বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চর বিক্রেতা ও ক্রেতা—উভয় পক্ষই সংঘবদ্ধভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সরকারি খাসজমি ব্যক্তিমালিকানাধীন হিসেবে দেখিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে এবং পরে সেখানে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও তীরবর্তী জনপদ হুমকির মুখে পড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, প্রভাবশালী এই চক্রের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে মামলা, হামলা ও বিভিন্ন ধরনের হুমকির শিকার হতে হয়। ফলে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অনেকে সবকিছু দেখেও নীরব থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরূপ রতন সিংহ বলেন, “চেলা নদীতে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। নিয়মিত অভিযান চলছে।”