
আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে অভিনন্দন, শুভেচ্ছা, সংবর্ধনা আর কৃতী সন্তানের জয়জয়কার। কোথাও মাইকিং, কোথাও পোস্টার, কোথাও ব্যানার, লিফলেট, মিছিল কিংবা সমাবেশ—সবখানেই যেন কৃতী সন্তানের মেলা। কোনো ব্যক্তি বিদেশে গেছেন, কেউ ব্যবসায় সফল হয়েছেন, কেউ কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, কেউ রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে পরিচিতি পেয়েছেন—আর অমনি তাঁকে ঘিরে শুরু হয়ে যায় ‘কৃতী সন্তান’ আখ্যা দেওয়ার প্রতিযোগিতা।
কিন্তু একটি প্রশ্ন বারবার মনে উঁকি দেয়—আমাদের সমাজে যদি এত এত কৃতী সন্তান থাকেন, তাহলে সমাজে এত অশান্তি কেন? মানুষে মানুষে এত বিভেদ কেন? হিংসা, বিদ্বেষ, প্রতারণা, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, সিন্ডিকেট, মাদক ব্যবসা, ঘুষ আর অনৈতিকতার এত বিস্তার কেন? শিক্ষা যদি মানুষকে আলোকিত করে, মেধা যদি মানুষকে বিবেকবান করে, আর কৃতিত্ব যদি সমাজকে এগিয়ে নেয়—তাহলে সেই কৃতিত্বের আলো আমাদের সামাজিক জীবনে এত কম দৃশ্যমান কেন?
‘কৃতী’ শব্দটির অর্থ সফল, গুণী, কৃতিত্বসম্পন্ন বা খ্যাতিমান। আর ‘কৃতী সন্তান’ বলতে সাধারণত এমন একজন মানুষকে বোঝানো হয়, যিনি তাঁর শিক্ষা, মেধা, কর্ম, প্রতিভা, সততা কিংবা বিশেষ অবদানের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ, দেশ বা জাতির জন্য গৌরব ও সুনাম বয়ে আনেন। তাঁর সাফল্য শুধু তাঁর নিজের জীবনের অর্জন নয়; সেই অর্জনের সঙ্গে অন্য মানুষের কল্যাণ, সমাজের অগ্রগতি এবং দেশের মর্যাদার একটি সম্পর্ক থাকে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, ‘কৃতী সন্তান’ শব্দটির ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে এতটাই সহজলভ্য হয়ে উঠেছে যে শব্দটির প্রকৃত মর্যাদাই আজ প্রশ্নের মুখে। প্রবাসে গিয়ে অর্থ উপার্জন করা অবশ্যই সম্মানের। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত হওয়াও একটি সাফল্য। ভালো চাকরি করা, সামাজিক পরিচিতি অর্জন করা কিংবা নিজের পরিবারকে স্বচ্ছল করা—এসবই প্রশংসনীয় ব্যক্তিগত অর্জন। কিন্তু ব্যক্তিগত সাফল্য আর সামাজিক কৃতিত্ব এক জিনিস নয়।
একজন মানুষ প্রচুর অর্থের মালিক হতে পারেন, কিন্তু সেই অর্থ যদি অন্যের অধিকার হরণ করে অর্জিত হয়, তাহলে সেই সম্পদ তাঁকে কৃতী করে না। কেউ বড় ব্যবসায়ী হতে পারেন, কিন্তু ব্যবসার আড়ালে যদি সিন্ডিকেট, মজুতদারি বা মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করা হয়, তাহলে শুধু অর্থবিত্তের কারণে তাঁকে সমাজের কৃতী সন্তান বলা কতটা যুক্তিসঙ্গত—এ প্রশ্ন থাকবেই।
কখনো কখনো আরও বিস্ময়কর দৃশ্য দেখা যায়। যাঁদের বিরুদ্ধে ঘুষ, চাঁদাবাজি, দখল, অবৈধ ব্যবসা, মাদক কারবার কিংবা নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে, তাঁরাও কোনো কোনো অনুষ্ঠানে সম্মানের আসনে বসেন। ফুলের মালা পরানো হয়, ক্রেস্ট দেওয়া হয়, মাইকে প্রশংসা করা হয়, পোস্টারে ছবি ছাপা হয়। এতে শুধু ব্যক্তির সম্মানই প্রশ্নবিদ্ধ হয় না; ‘কৃতী সন্তান’ শব্দটির সামাজিক মূল্যবোধও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ অর্থ দিয়ে সম্মান কেনা যায়, কিন্তু কৃতিত্ব কেনা যায় না।
একজন প্রকৃত কৃতী সন্তানের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর মানবিকতা, সততা ও দায়িত্ববোধ। তিনি নিজের সাফল্যকে শুধু নিজের ভোগের জন্য ব্যবহার করেন না; তাঁর সামর্থ্য অন্যের জীবনেও আলো জ্বালায়।
একজন শিক্ষক তাঁর জ্ঞান দিয়ে প্রজন্ম গড়ে তোলেন। একজন চিকিৎসক মানুষের জীবন রক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। একজন বিজ্ঞানী নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষের জীবন সহজ করেন। একজন কৃষিবিদ কৃষির নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেন। একজন প্রকৌশলী দেশের অবকাঠামো নির্মাণে অবদান রাখেন। একজন সাহিত্যিক মানুষের চিন্তা ও বিবেককে জাগ্রত করেন। একজন শিল্পী জাতির সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেন। একজন উদ্যোক্তা মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন। একজন সমাজকর্মী অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান।
এঁদের প্রত্যেকের কৃতিত্বের সঙ্গে মানুষের জীবন ও সমাজের একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। তেমনি একজন প্রবাসীও নিঃসন্দেহে কৃতী সন্তান হতে পারেন। কিন্তু শুধু বিদেশে গিয়ে অর্থ উপার্জন করলেই তিনি কৃতী হয়ে যান না। তিনি যদি নিজের মেধা, শ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের পরিচয় উজ্জ্বল করেন, দেশে বিনিয়োগ করেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন, নিজ এলাকার শিক্ষাব্যবস্থা, চিকিৎসা, অবকাঠামো কিংবা জনকল্যাণে ভূমিকা রাখেন, দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ান—তাহলে তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য সামাজিক কৃতিত্বে পরিণত হয়।
একজন কৃতী মানুষের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি প্রচারের চেয়ে কাজকে বড় মনে করেন। তাঁর নাম হয়তো প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায় না, তাঁর ছবি হয়তো বিশাল ব্যানারে টাঙানো থাকে না, তাঁর সম্মানে হয়তো মাইকিং হয় না; কিন্তু তাঁর কাজ মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকে।
অন্যদিকে, আজ আমরা অনেক সময় কাজের চেয়ে প্রচারকে বড় করে ফেলেছি। কে কত বড় ব্যানার লাগাতে পারলেন, কে কতজন মানুষ নিয়ে অনুষ্ঠান করলেন, কে কতবার মাইকে প্রশংসা পেলেন—এসব যেন কৃতিত্বের নতুন মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ মানুষের উপকারে বাস্তবে কী করেছেন, সমাজের জন্য কী রেখে গেছেন, তাঁর কারণে কতজনের জীবন বদলেছে—সেই প্রশ্নটি অনেক সময় হারিয়ে যায়।
মনে রাখতে হবে, সংবর্ধনা দিয়ে কাউকে কৃতী বানানো যায় না; কৃতিত্বের কাজই একজন মানুষকে কৃতী করে তোলে। ফুলের মালা শুকিয়ে যায়, ক্রেস্টে ধুলো জমে, ব্যানার ছিঁড়ে যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট হারিয়ে যায়; কিন্তু একজন মানুষের ভালো কাজ মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। তাই ‘কৃতী সন্তান’ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও আমাদের বিবেকবান হওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে কাউকে সম্মানিত করার আগে তাঁর অর্থ-সম্পদ নয়, তাঁর কর্ম ও চরিত্র দেখতে হবে। পরিচিতি নয়, যোগ্যতা দেখতে হবে। ক্ষমতা নয়, সততা দেখতে হবে। ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, সামাজিক অবদান দেখতে হবে।
কারণ আমরা যদি ভুল মানুষকে কৃতী বানাই, তাহলে প্রকৃত কৃতী মানুষগুলো একদিন নীরবে আড়ালে চলে যাবেন। আর সমাজে এমন একটি বার্তা প্রতিষ্ঠিত হবে যে—অর্থ থাকলেই সম্মান, প্রভাব থাকলেই কৃতিত্ব, আর প্রচার থাকলেই মহত্ত্ব। এই ধারণা একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
আমাদের সন্তানদেরও তাই শেখাতে হবে—কৃতী হওয়া মানে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়; কৃতী হওয়া মানে ভালো মানুষ হওয়া। কৃতী হওয়া মানে নিজের জ্ঞানকে মানুষের কাজে লাগানো। কৃতী হওয়া মানে অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করা। কৃতী হওয়া মানে নিজের সাফল্যের সঙ্গে সমাজের সাফল্যকে যুক্ত করা।
একটি সমাজে সত্যিকারের কৃতী মানুষের সংখ্যা যত বাড়বে, তত বাড়বে জ্ঞান, নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও শান্তি। আর যদি কৃতী সন্তানের সংখ্যা শুধু পোস্টার, ব্যানার, মাইকিং আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় বাড়তে থাকে, অথচ মানুষের জীবনে তার কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন না আসে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যাবে—
এত কৃতী সন্তানের ভিড়েও আমাদের সমাজ এত অশান্ত কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ‘কৃতী’ শব্দটির মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে হবে। কৃতিত্বের সংজ্ঞা বদলাতে হবে না; বরং সংজ্ঞাটিকে যথার্থভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
কৃতিত্বের আসল মাপকাঠি প্রচার নয়—কর্ম। অর্থ নয়—সততা।
ক্ষমতা নয়—মানবিকতা।
পরিচিতি নয়—অবদান। নামের পাশে ‘কৃতী সন্তান’ লেখা থাকলেই কেউ কৃতী হয়ে যান না। বরং এমন কাজ করে যেতে হয়, যাতে নামের পাশে কোনো বিশেষণ না থাকলেও মানুষ ভালোবেসে বলে—“তিনি আমাদের সমাজের একজন সত্যিকারের কৃতী সন্তান।”
সেই দিনই হয়তো আমাদের কৃতী সন্তানের মেলা সত্যিকার অর্থে সমাজের শান্তি, উন্নতি ও মানবিকতার মেলায় পরিণত হবে।
লেখক: কলামিস্ট ও সাংবাদিক