
পৃথিবীতে মানুষকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব বলা হয় তার শক্তির জন্য নয়, তার বিবেকের জন্য। একটি পশু ক্ষুধা, ভয় কিংবা প্রবৃত্তির তাড়নায় কাজ করে; কিন্তু মানুষকে আলাদা করে তার বিচারবোধ, সহানুভূতি এবং আত্মসংযম। অথচ বাস্তবতা হলো, মানুষের ভেতরেও একটি পশুসুলভ সত্তা লুকিয়ে থাকে। সেই সত্তা কখনো ক্রোধে, কখনো লোভে, কখনো ক্ষমতার মোহে, কখনো আবার প্রতিশোধের আগুনে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তখন মানুষ নিজের পরিচয় ভুলে যায়, হারিয়ে ফেলে মানবিকতার আলো।
আজকের পৃথিবী প্রযুক্তিতে যত এগিয়েছে, মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বও যেন তত গভীর হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামান্য মতপার্থক্য থেকেই ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ে। পারিবারিক সম্পর্কে সামান্য ভুল বোঝাবুঝি ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সমাজে সহিংসতা, প্রতারণা, দুর্নীতি ও বিদ্বেষ আমাদের প্রতিদিনের সংবাদে পরিণত হয়েছে। এসব ঘটনার পেছনে অনেক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ থাকলেও একটি মৌলিক সত্য অস্বীকার করা যায় না—মানুষ যখন নিজের ভেতরের অন্ধকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, তখনই এসব অমানবিকতার জন্ম হয়।
পশু হওয়া সহজ, মানুষ হওয়া কঠিন। কারণ পশুর কোনো নৈতিক দায়িত্ব নেই; কিন্তু মানুষের আছে। রাগ হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু সেই রাগকে নিয়ন্ত্রণ করা মহত্ত্ব। ক্ষমতা পাওয়া সহজ হতে পারে, কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার না করা চরিত্রের পরিচয়। সম্পদ অর্জন করা সাফল্য হতে পারে, কিন্তু সেই সম্পদের অহংকারে অন্যকে তুচ্ছ না করা প্রকৃত মানবিকতা।
আমরা প্রায়ই অন্যের ভুল নিয়ে ব্যস্ত থাকি। কে কী বলল, কে কী করল, কে কতটা অন্যায় করল—এসব হিসাব করতে করতে নিজের ভেতরের পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা ভুলে যাই। অথচ সমাজের পরিবর্তন শুরু হয় ব্যক্তির পরিবর্তন দিয়ে। একজন মানুষ যদি নিজের রাগকে সংযত করতে শেখে, অন্যের কষ্ট বুঝতে শেখে, ক্ষমা করতে শেখে, তবে তার পরিবার বদলাবে; পরিবার বদলালে সমাজ বদলাবে; আর সমাজ বদলালে রাষ্ট্রও আরও সুন্দর হবে।
একটি শিশুর জন্মের সময় তার হৃদয়ে ঘৃণা থাকে না। সে ভালোবাসা শিখে, আবার বিদ্বেষও শেখে। তাই পরিবার, শিক্ষা ও সামাজিক পরিবেশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে শুধু ভালো ফলাফল অর্জনের শিক্ষা দিলেই হবে না; তাকে সততা, সহমর্মিতা, ধৈর্য ও মানবিকতার মূল্যও শেখাতে হবে। কারণ একজন শিক্ষিত মানুষ সব সময় মানবিক মানুষ নাও হতে পারেন, কিন্তু একজন প্রকৃত মানবিক মানুষ সমাজকে আলোকিত করতেই পারেন।
ধর্ম, দর্শন ও মানবতাবাদ—সব পথই মূলত মানুষকে আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়। নিজের অহংকারকে ছোট করা, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং ক্ষমাশীল হওয়া—এসবই মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণ। যে ব্যক্তি নিজের ক্রোধকে জয় করতে পারে, সে অন্যকে জয় করার চেয়েও বড় বিজয় অর্জন করে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ভেতরের পশুটি সব সময় হিংস্র রূপে আসে না। কখনো তা আসে লোভের মুখোশ পরে, কখনো ঈর্ষার ছদ্মবেশে, কখনো ক্ষমতার নেশায়, কখনো মিথ্যার আশ্রয়ে। ধীরে ধীরে এই প্রবৃত্তিগুলো মানুষের বিবেককে দুর্বল করে দেয়। একসময় অন্যায়কে অন্যায় মনে হয় না, অসত্যকে সত্য বলে মনে হতে থাকে। সেখান থেকেই শুরু হয় ব্যক্তি ও সমাজের নৈতিক অবক্ষয়।
তাই প্রতিদিন নিজের কাছে একটি প্রশ্ন রাখা জরুরি—আমি কি আজ কাউকে কষ্ট দিয়েছি? আমি কি কারও প্রতি অন্যায় করেছি? আমি কি নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি? এই আত্মসমালোচনাই মানুষকে পরিশুদ্ধ করে। কারণ যে ব্যক্তি নিজের ভুল দেখতে পারে, সে-ই প্রকৃত অর্থে উন্নতির পথে এগিয়ে যায়।
আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরও শক্তিশালী মানুষ নয়; আরও মানবিক মানুষ। এমন মানুষ, যে প্রতিশোধের বদলে ক্ষমা বেছে নেবে; ঘৃণার বদলে ভালোবাসা ছড়াবে; বিভেদের বদলে সম্প্রীতির কথা বলবে। মানুষের আসল শক্তি তার পেশিতে নয়, তার চরিত্রে। আর চরিত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় তখনই, যখন সে অন্যায় করার সুযোগ পেয়েও ন্যায়ের পথ বেছে নেয়।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, মানুষের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ বাইরের কোনো শত্রুর সঙ্গে নয়; নিজের ভেতরের অন্ধকারের সঙ্গে। যে এই যুদ্ধে জয়ী হয়, সে-ই প্রকৃত বিজয়ী। তাই আসুন, আমরা অন্যকে বদলানোর আগে নিজেকে বদলাই। নিজের ভেতরের রাগ, লোভ, হিংসা, অহংকার ও প্রতিহিংসাকে নিয়ন্ত্রণ করি। কারণ সভ্য পৃথিবী গড়ার প্রথম শর্ত হলো—মানুষের ভেতরের পশুটিকে দমন করে তার মানবিক সত্তাকে জাগিয়ে তোলা।
মানুষ হয়ে জন্ম নেওয়া আমাদের ভাগ্য, কিন্তু প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠা আমাদের প্রতিদিনের সাধনা।
লেখক: কবি কলামিস্ট ও সাংবাদিক