
ইতিহাসের পাতায় ক্ষমতার পরিবর্তন খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা। রাজা বদলেছে, শাসক বদলেছে, সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক মতাদর্শের উত্থান-পতন ঘটেছে। কখনো পরিবর্তন এসেছে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, কখনো এসেছে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়, কখনো আবার এসেছে মানুষের দীর্ঘদিনের অসন্তোষের বিস্ফোরণে। কিন্তু এই সমস্ত পরিবর্তনের ভিড়ে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—শাসক বদলালেও সাধারণ মানুষের ভাগ্য কেন অনেক সময় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে?
এই প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, দল বা সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়। এটি একজন সাধারণ নাগরিকের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা প্রশ্ন। যে মানুষটি প্রতিদিন জীবিকার সন্ধানে বের হন, যে কৃষক মাটির সঙ্গে যুদ্ধ করে খাদ্য উৎপাদন করেন, যে শ্রমিক ঘাম ঝরিয়ে শহরের অর্থনীতিকে সচল রাখেন, যে তরুণ বছরের পর বছর পড়াশোনা করে একটি কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় থাকেন—রাষ্ট্রের প্রতিটি পরিবর্তনের দিকে তাদেরও তাকিয়ে থাকা থাকে। তারা রাজনীতির জটিল সমীকরণ বোঝার চেয়ে বেশি বোঝেন নিজেদের জীবনের হিসাব।
তাদের কাছে পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অর্থ—জীবন কি একটু সহজ হলো?
একটি সরকার আসে। নতুন স্বপ্নের কথা বলা হয়। মানুষের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। জনগণও আশাবাদী হয়। তারা ভাবে, হয়তো এবার দ্রব্যমূল্যের চাপ কিছুটা কমবে, সন্তানটি ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারবে, বেকার তরুণটির জন্য একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, অসুস্থ মানুষটি চিকিৎসার জন্য সর্বস্বান্ত হবে না, অন্যায়ের শিকার হলে সে ন্যায়বিচার পাবে।
কিন্তু সময় গড়ায়। রাজনৈতিক ব্যস্ততা বাড়ে, ক্ষমতার হিসাব বদলায়, নতুন নতুন সংকট সামনে আসে। আর সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে—যে স্বপ্ন নিয়ে তারা অপেক্ষা করেছিল, তার অনেকটাই এখনো দূরের আকাশে ঝুলে আছে।
এখানেই প্রশ্ন আসে—সমস্যাটা কোথায়?
সমস্যা কি শুধু শাসকের মধ্যে? নাকি রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোর মধ্যেই এমন কিছু দুর্বলতা রয়েছে, যা শাসক পরিবর্তনের পরও সমস্যাগুলোকে একইভাবে টিকিয়ে রাখে?
বাস্তবতা হলো, একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি সংকট কোনো এক ব্যক্তি বা একটি সরকারের হাতে তৈরি হয় না। একইভাবে, এক ব্যক্তি বা একটি সরকারের পক্ষেও সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি—সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একটি জায়গায় দুর্বলতা থাকলে তার প্রভাব অন্য জায়গাতেও পড়ে।
তাই শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনকে পরিবর্তনের শেষ কথা মনে করা ভুল।
শাসক পরিবর্তন রাজনৈতিক পরিবর্তন হতে পারে; কিন্তু মানুষের জীবনের পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন।
একজন কৃষকের কথা ভাবা যাক। তিনি হয়তো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী নন। কোনো রাজনৈতিক সভায় তার উপস্থিতি নেই। কিন্তু দেশের অর্থনীতির সঙ্গে তার শ্রমের সম্পর্ক গভীর। তিনি জমিতে বীজ বোনেন, ফসল ফলান। তার উৎপাদন খরচ বাড়ে, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা তাকে বিপন্ন করে, বাজারের ওঠানামা তাকে চিন্তিত করে। তিনি চান তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য।
একজন শ্রমিকও খুব বেশি কিছু চান না। তিনি চান তার শ্রমের যথাযথ মূল্য, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পরিবারের জন্য একটু স্বস্তি।
একজন তরুণ চান তার শিক্ষার মূল্যায়ন হোক যোগ্যতার ভিত্তিতে। তিনি চান না বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে করতে তার যৌবন কেটে যাক। তিনি চান নিজের সামর্থ্য দিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে।
একজন মা চান তার সন্তান নিরাপদে স্কুলে যাক। একজন বাবা চান অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য তাকে জমি বিক্রি করতে না হয়। একজন মধ্যবিত্ত মানুষ চান মাসের শেষে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে যেন তাকে প্রতিদিন নতুন দুশ্চিন্তার মুখোমুখি না হতে হয়।
এই চাওয়াগুলো খুব বড় কোনো দাবি নয়। এগুলো মানুষের মৌলিক প্রত্যাশা।
কিন্তু যখন এই প্রত্যাশাগুলো দীর্ঘদিন পূরণ হয় না, তখন মানুষের মনে এক ধরনের নীরব ক্লান্তি জন্ম নেয়। সে হয়তো প্রতিবাদ করে না, উচ্চস্বরে অভিযোগও করে না; কিন্তু তার ভেতরে রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রতি এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—যখন মানুষ পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস হারাতে শুরু করে।কারণ একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার অর্থনীতি বা সামরিক ক্ষমতা নয়; তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নাগরিকের আস্থা।
মানুষ যদি বিশ্বাস করে যে আইন তার পাশে থাকবে, প্রশাসন তাকে ন্যায়সংগত আচরণ দেবে, রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করে এবং তার সন্তান যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে পারবে—তাহলে সেই মানুষ রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাশীল থাকে।
কিন্তু যখন সে দেখে পরিচয়, প্রভাব, অর্থ কিংবা ক্ষমতার কাছে যোগ্যতা বারবার পরাজিত হচ্ছে, তখন তার মনে প্রশ্ন জাগে—এই রাষ্ট্র কি সত্যিই আমার?
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া জরুরি।
রাষ্ট্র কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্র কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পদও নয়। রাষ্ট্র জনগণের। সরকার জনগণের সেবক—এই ধারণাটি শুধু বইয়ের পাতায় নয়, বাস্তব রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও তাই পরিবর্তন দরকার। রাজনীতিকে যদি কেবল ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতায় থাকার প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে জনগণের স্বার্থ ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যেতে পারে। অথচ রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় করে তোলা।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। গণতন্ত্রে মতের ভিন্নতা থাকবে, বিতর্ক থাকবে, সমালোচনা থাকবে। কিন্তু মতের পার্থক্য যেন রাষ্ট্রের স্বার্থকে দুর্বল না করে। ক্ষমতার পরিবর্তন যেন প্রতিহিংসার সংস্কৃতিকে শক্তিশালী না করে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যেন রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোও অনিশ্চয়তার মধ্যে না পড়ে। কারণ সরকার অস্থায়ী; রাষ্ট্র স্থায়ী।
আজ যে ক্ষমতায় আছে, আগামীকাল সে ক্ষমতায় নাও থাকতে পারে। আজ যে বিরোধী, আগামীকাল সে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেতে পারে। সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় বদলায়। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবন প্রতিদিন চলতে থাকে। তাই রাষ্ট্রের এমন একটি কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে ব্যক্তি পরিবর্তিত হলেও ন্যায়বিচারের নীতি পরিবর্তিত হবে না; সরকার পরিবর্তিত হলেও নাগরিক অধিকার পরিবর্তিত হবে না; রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার মৌলিক লক্ষ্য থেকে রাষ্ট্র বিচ্যুত হবে না।
আমাদের আরও একটি বিষয় বুঝতে হবে—পরিবর্তন শুধু সরকারের হাতে সম্ভব নয়। সমাজের প্রতিটি মানুষ পরিবর্তনের অংশীদার। একজন নাগরিক যখন ঘুষকে প্রত্যাখ্যান করেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, দায়িত্বশীলভাবে ভোট দেন, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকেন, নিজের দায়িত্ব পালন করেন এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করেন—তখন তিনিও রাষ্ট্র পরিবর্তনের কাজে ভূমিকা রাখেন। কারণ একটি ভালো রাষ্ট্র শুধু ভালো শাসক দিয়ে তৈরি হয় না; ভালো প্রতিষ্ঠান, সচেতন নাগরিক এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমন্বয়ে একটি ভালো রাষ্ট্র গড়ে ওঠে।
আমরা হয়তো এমন একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যখন মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরেকটি স্লোগান নয়—একটি বিশ্বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ।
মানুষ এমন একটি সকাল দেখতে চায়, যেখানে তার সন্তানকে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পেতে হবে না। এমন একটি সমাজ চায়, যেখানে দরিদ্র হওয়া অপরাধ নয়, রাজনৈতিক পরিচয় না থাকা দুর্বলতা নয় এবং সাধারণ মানুষ হওয়া অবহেলার কারণ নয়।
মানুষ চায়—তার পরিশ্রমের মর্যাদা থাকুক।
সে চায়—ন্যায়বিচার যেন কেবল শক্তিশালীর জন্য না হয়।
সে চায়—রাষ্ট্র যেন তার পাশে থাকে, তার ওপরে নয়।
এই প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে হলে আমাদের পরিবর্তনের সংজ্ঞাটিই নতুন করে ভাবতে হবে।
শুধু ক্ষমতার চেয়ারে নতুন মুখ বসানো পরিবর্তন নয়। শুধু পতাকা বদলানো পরিবর্তন নয়। শুধু নতুন স্লোগান, নতুন প্রতিশ্রুতি কিংবা নতুন রাজনৈতিক সমীকরণও পরিবর্তনের পূর্ণ অর্থ বহন করে না।
প্রকৃত পরিবর্তন তখনই, যখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিও অনুভব করেন—এই পরিবর্তনের সুফল তার জীবনেও পৌঁছেছে।
যে কৃষক সন্তানের মুখে হাসি দেখতে চান, যে শ্রমিক নিজের ঘরে শান্তি চান, যে তরুণ একটি সুযোগের অপেক্ষায় আছেন, যে মা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন—তাদের জীবনে যদি আশার আলো না জ্বলে, তাহলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাফল্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
ইতিহাসে শাসকদের নাম লেখা থাকে। ক্ষমতার পালাবদলের ঘটনাও ইতিহাসে স্থান পায়। কিন্তু একটি জাতির প্রকৃত সাফল্য মাপা হয় তার সাধারণ মানুষের জীবনের মান দিয়ে।
কতজন মানুষ নিরাপদে ঘুমাতে পারে?
কতজন তরুণ নিজের যোগ্যতায় কর্মসংস্থান পায়?
কতজন পরিবার চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে নিঃস্ব হয় না?
কতজন কৃষক তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য পায়?
কতজন নাগরিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচারের আশ্বাস পায়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আসলে বলে দেয়—একটি দেশ কতটা এগিয়েছে।
শাসক বদলাবে। ক্ষমতার পালাবদল ঘটবে। সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক মানচিত্রও বদলাবে। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা হওয়া উচিত—এই পরিবর্তনের প্রতিটি ধাপ যেন মানুষের জীবনকে একটু একটু করে উন্নত করে।
কারণ মানুষ চিরকাল অপেক্ষা করতে পারে না।
তারও একটি জীবন আছে। তার সন্তানদেরও একটি ভবিষ্যৎ আছে। তার স্বপ্নেরও একটি সময়সীমা আছে।
তাই আজ সবচেয়ে প্রয়োজন এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতা মানুষের ওপরে নয়, মানুষের সেবায় নিয়োজিত হবে; যেখানে রাজনীতি বিভাজনের বদলে দায়িত্বের প্রতীক হবে; যেখানে প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি ও দলের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করবে; যেখানে ন্যায়বিচার হবে সবার জন্য সমান; যেখানে উন্নয়নের সুফল সমাজের প্রান্তিক মানুষটির ঘরেও পৌঁছাবে।
তবেই একদিন হয়তো ইতিহাসের এই দীর্ঘ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে—
“শাসক বদলেছে, সরকার বদলেছে—এবার সত্যিই মানুষের ভাগ্যও বদলেছে।”
আর সেই দিনই হবে প্রকৃত পরিবর্তনের দিন।
লেখক: কবি কলামিস্ট ও সাংবাদিক
দ.ক.সিআর