
ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী: কুরআন মজীদে সাংবাদিকতা নিয়ে দু’টি বড় ধরনের ঘটনার উল্লেখ আছে। একটি ঘটনা হযরত নবী করিম (সা.)-এর সময়কার, আরেকটি ঘটনা অনেক আগেকার। রোমাঞ্চকর এ ঘটনার মূল চরিত্রে আছেন ইতিহাসের মহানায়ক বাদশাহ হযরত সুলায়মান (আ.), আরেকজন রমণী সাবার রাণী বিলকিস। তাদের মাঝখানে সাংবাদিকের ভূমিকায় ছিল হুদহুদ পাখি। আমাদের দেশে হুদহুদের নাম কাঠঠোকরা বা মোহনচূড়া। সূরা নামল-এর বরাতে ঘটনার বিবরণ এরূপ:
মানব-দানব, পশুপাখি, কীট-পতঙ্গের বাদশাহ আল্লাহর নবী সুলায়মান (আ.) লোক-লস্করসহ সফরে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে নিয়ম মাফিক কাফেলার সদস্যদের হাজিরা ডাকেন। দেখলেন, সাংবাদিক হুদহুদ নাই। সুলায়মান (আ.) রাগান্বিত হয়ে বললেন, বিনা অনুমতিতে হুদহুদ গরহাজির! তাকে অত্যন্ত কঠোর শাস্তি দেব, কিংবা একেবারে জবাই করে দেব। অন্যথায় তাকে উপযুক্ত কারণ দর্শাতে হবে।
কিছুক্ষণের মধ্যে হুদহুদ হাজির। কৈফিয়তের সুরে সে বলল, হে আল্লাহর নবী! আমি এমন এক রাজ্যের সংবাদ নিয়ে এসেছি, যে রাজ্য শাসন করছে এক রমণী। রাজ্যটি ধন-ঐশ্বর্যে ভরা, তবে সেখানকার লোকেরা সূর্র্যকে সিজদা করে, পুজো দেয়। রাণীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, তার একটি বিরাট সিংহাসন আছে। সুলায়মান (আ.) বললেন, তুমি সত্যবাদী কিনা আমি পরীক্ষা করব। আমার এই পত্র নিয়ে যাও, বিলকিস তার কী জবাব দেয় আমাকে এসে জানাও। হুদহুদ ঠোঁটে চিঠি নিয়ে পৌঁছে দিয়ে জবাবের অপেক্ষায় থাকে। রাণী বিলকিস চিঠি পেয়ে সভাসদদের বৈঠক আহ্বান করল। তারা জানমাল দিয়ে যুদ্ধ করতে নিজেদের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে রাণীকে বলল, সর্বাবস্থায় আপনার আদেশ আমাদের শিরোধার্য। বুদ্ধিমতি বিলকিস পরীক্ষা করতে চাইল, এই বাদশাহ কী সত্যিই আল্লাহর নবী, নাকি রাজ্যজয়ের স্বপ্নে বিভোর কোনো রাজা। তিনি মূল্যবান উপহার সামগ্রি পাঠালেন বাদশাহ সুলায়মানের কাছে। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সূরা নামল-এর ২০-৩১ আয়াতে বিদ্যমান।
হুদহুদকে পত্রবাহক নিযুক্ত করার বর্ণনা কুরআন মজীদে কেন দেয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই এর মাধ্যমে দুনিয়ার মুসলমানদের এই বার্তা দেয়া হয়েছে যে, ইসলামী সমাজ, সভ্যতা ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় তথ্য সরবরাহ বা আজকের পরিভাষায় সাংবাদিকতার বিরাট গুরুত্ব রয়েছে।
দ্বিতীয় ঘটনা নবী করিম (সা.)-এর সময়কার। মদীনার বাদশাহ নবীজি (সা.) ওয়ালিদ ইবনে আকাবা নামক এক ব্যক্তিকে যাকাত সংগ্রহের জন্য বনি মুস্তালিক গোত্রের কাছে প্রেরণ করেন। এই সংবাদে আনন্দচিত্তে তারা আল্লাহর রাসূলের (সা.) প্রতিনিধিকে সাদর অভ্যর্থনা জানানোর জন্য বের হন। শয়তান ওয়ালিদ এর মনে সংশয় সৃষ্টি করে যে, লোকেরা যেভাবে আসছে, তারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে এবং তাকে প্রতিরোধ করাই উদ্দেশ্য। ওয়ালিদ মদীনায় ফিরে এসে নবীজিকে বলেন, বনি মুস্তালিক যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে। নবীজি খুবই অন্তুষ্ট হলেন; এমনকি যাকাত দিতে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান প্রেরণের কথা ভাবতে লাগলেন। বনি মুস্তালিকের লোকেরা মদীনায় ছুটে এসে আল্লাহর নবীকে জানাল, আমরা আপনার প্রতিনিধিকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, এরইমধ্যে তিনি ফিরে এসেছেন। আমাদের আশঙ্কা হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল না জানি আমাদের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে তাঁর প্রতিনিধিকে মাঝপথ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন। তাদের কৈফিয়াত ও ক্ষমাপ্রার্থনার মধ্যে আসরের নামাজের আযান হলো। জামাত শেষে বনি মুস্তালিকের বক্তব্যের সমর্থনে এই আয়াত নাযিল হলো: ‘হে মুমিনগণ! যদি কোনো ফাসেক (পাপাচারি) ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করো; যেন অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো, ফলে পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে হয়।’Ñ(সূরা হুজুরাত, আয়াত-৬)
এই আয়াতে সতর্ক করা হয়েছে, ভুল তথ্য ও অপতথ্য সমাজে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। আয়াতে ফাসেক (পাপাচারি) শব্দ উল্লেখ করে প্রকারান্তরে মুত্তাকী লোকদেরকে সাংবাদিকতার কাজে উৎসাহিত করা হয়েছে। এর কারণ অত্যন্ত স্পষ্ট।
বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা হলো, বায়ুপ্রবাহের উপর যেমন জীবজগত টিকে আছে তেমনি সমাজ ও সভ্যতা চলমান রয়েছে সংবাদ সরবরাহের উপর। মানব সভ্যতা অতীতে কোনো সময় সংবাদ সরবরাহের উপর আজকের মতো এতখানি নির্ভরশীল ছিল কিনা জানি না।
আমাদের ছোটবেলায় সংবাদ সরবরাহের মাধ্যম ছিল সংবাদপত্র, রেডিও কিংবা টেলিভিশন। এই তিনটি মাধ্যম ছাড়া বাইরের দুনিয়া সম্পর্কে জানার অন্য কোনো মাধ্যমের কথা জানা নেই। সে তুলনায় বর্তমানে সংবাদ প্রবাহ বা মিডিয়ায় বিরাট বিপ্লব সৃষ্টি হয়েছে। ইন্টারনেটের সুবাদে গোটা পৃথিবী যেন ছোট্ট গ্রামে পরিণত হয়েছে। বিচিত্র সব সংবাদ মাধ্যমের সয়লাবে আমাদের চিন্তা, বিশ্বাস ও কর্মচাঞ্চল্য ভাসমান। মিডিয়ার এই উৎকর্ষের সাথে পাল্লা দিয়ে অপতথ্য, ভুল ও বিভ্রান্তি মহামারিতে পরিণত হয়েছে।
অনেকে কুরআন, হাদিস বা ইসলামী গবেষণার জন্য গুগল মাস্টারকে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করছেন। কিন্তু খুব বেশি অভিজ্ঞ ও সতর্ক না হলে গুগলের ভুল তথ্যের ছড়াছড়িতে মারাত্মক বিভ্রান্তির ঝুঁকি বিদ্যমান। বর্তমানে সংবাদপত্র জগত বা মিডিয়ার নাটাই ইসলাম বিরোধীদের হাতে, তারা যেদিকে ওড়ায় তথ্য প্রবাহের ঘুড়ি সেদিকেই ওড়ে, গণমানুষের মাথাও সেদিকেই ঘুরে। সংবাদ প্রবাহের এই গুরুত্ব আমাদের যারা শত্রু তারাই সবচেয়ে বেশি বুঝে। তাই সংবাদ সরবরাহ যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছে।
ইরাকের উপর আমেরিকার নেতৃত্বে বিশ্বশক্তিগুলোর আগ্রাসনের সময় সংবাদ মাধ্যমে এসেছিল, আমেরিকা ইরাক অভিযানের জন্য অস্ত্রশস্ত্র তথা সামরিক খাতে যত ব্যয় করেছে, তার দ্বিগুণ ব্যয় করেছে সেই অভিযানের সংবাদ কভার করার জন্য সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিকদের পেছনে। এ কারণেই তারা ইরাকের হতে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে বলে মিথ তৈরি করে ইসলামী সভ্যতার অন্যতম লালনভূমি ইরাক ও বাগদাদে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্র তৈরি করতে পেরেছিল।
হাদিস শরীফের ভাষ্য অনুযায়ী মুসলমানরা পৃথিবীর যে অংশেই থাকুক প্রেম-প্রীতি ভালোবাসা ও সহানুভূতিতে এক দেহের একেকটি অঙ্গের মতো। দেহের কোনো অঙ্গে আঘাত আসলে যেমন সমগ্র শরীর ব্যথায় কাতর হয়, জ্বরে বিনিদ্র রজনী কাটায় তেমনি প্রত্যেক মুসলমান অন্য মুসলমানের দুঃখ-বেদনার ভাগী হয়।’ হাদিসের এই বাণীকে আমরা জীবনে তখনই ধারণ করতে পারব, যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা মুসলমানদের ব্যাপারে জানতে পারব। এই জানার জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিকতা।
সংবাদ মাধ্যমের এই গুরুত্বের ব্যাপারে আমরা সম্পূর্ণ উদাসীন। এই উদাসীনতার কারণ হচ্ছে, আমাদের ধর্মীয় মহল ওয়াজ, নসিহতের মাহফিলকে যতখানি গুরুত্ব দেন, সে তুলনায় মিডিয়ার কোনো কদর তাদের কাছে আছে বলে মনে হয় না। অতীতের যতো মণীষীদের কথা আমরা জানি তারা প্রত্যেকে বই পুস্তক রচনা করেছেন, ইসলামী জ্ঞানভা-ারের ঐতিহ্য তাদের লিখুনির কাছে ঋণি। তখন বই-পুস্তকই ছিল নির্ভরযোগ্য সংবাদ মাধ্যম। মকতুবাত নামে বুযর্গানে দ্বীনের রচনাবলীর কথা আমরা জানি। মকতুবাত মানে পত্রাবলী। পত্র আদান-প্রদানই ছিল তখনকার সংবাদ সরবরাহ মাধ্যম এবং তারা তার সর্বোত্তম ব্যবহার করেছেন।
কুরআন মজীদের সূরা ইবরাহীমের ৪ নং আয়াতের বরাতে বিজ্ঞ আলেমগণ বলেন, আল্লাহর কোনো নবী বা রাসূল যদি বাংলার জমিনে আসতেন তাহলে অবশ্যই তিনি বাংলা ভাষায় আসমানী কিতাব সাথে নিয়ে আসতেন। অথচ আমরা মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চার প্রতি উদাসীন। ফারসি ভাষা ছিল অগ্নি-উপাসকদের ভাষা। অথচ সাদী রূমী হাফেজ জামি প্রমুখ মনীষীগণ ফারসি ভাষাকে সমৃদ্ধ ইসলামী ভাষায় রূপান্তরিত করেছেন। বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশের খুব কম সংখ্যক আলেমই স্বজাতির ভাষা বাংলায় বইপুস্তক লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। মনে হয়, তারা এখনো ভাবেন যে, বাংলা চর্চা করলে তাদের বুযর্গি নষ্ট হয়ে যাবে, যার প্রভাবে ধর্মীয় অঙ্গনে বাংলার পাঠক নিতান্তই কম।
হয়ত বলবেন, ইদানিং ধর্মীয় মহল থেকে অনেক লেখক তৈরি হয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে অনুবাদ নির্ভর ও বর্ণনামূলক বই পুস্তক দিয়ে লেখক নাম ধারণ করা যায়; সাহিত্য বা গবেষণা বলতে যে সৃষ্টিকর্ম তা হয় না এবং তা শিক্ষিত যুব সমাজকে আকৃষ্ট করে না।
এখন তো আরেক মহাবিপদ সমাজ সভ্যতাকে গ্রাস করছে। তা হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এআই। অবস্থা দেখে মনে হয়, এআই জীবনের অনস্বীকার্য বাস্তবতায় পরিণত হবে। কিন্তু এআই থেকে নগদ সুবিধা নিতে গিয়ে মেধা ও মননের যে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে, তাতে মানুষের মেধা, মনন ও সৃজনশীলতার উপর বুলডোজার শুরু হয়েছে। অবশেষে এআই এর ভুল ও অপতথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করার মতো মানুষেরও আকাল তৈরি হবে।
এসব বহুমুখি আগ্রাসন থেকে ইসলাম ও মানব সভ্যতাকে রক্ষা করতে হলে অতীতের মণীষীদের দৃষ্টান্ত সামনে রেখে বাংলাদেশের ধর্মীয় মহলকে সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় এগিয়ে আসতে হবে। লক্ষ্য করুন, সারারাত ওয়াজ নাসিহত করে যে প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে, তার চেয়ে সংবাদ মাধ্যমের দু’-চার লাইন লেখা অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করছে।
আমাদের সমাজ ওয়ায়েজ বা বক্তাদের সম্মান দেয়, বক্তৃতার মাঠে অর্থের যোগ আছে, তাই আমাদের সমাজে ওয়ায়েজ ও বক্তার কমতি নেই। সে তুলনায় লেখক ও সাংবাদিকদের মোটেও গুরুত্ব দেয়া হয় না, তাই প্রতিভাবান লেখক সাংবাদিক সৃষ্টি হচ্ছে না। কিছু স্বল্পশিক্ষিত অল্পবয়সী সংবাদকর্মী দেখে অনেকে সাংবাদিকতার অবমূল্যায়ন করেন; কিন্তু যাদের কথায় দেশ চলে, সমাজ ভাঙে বা গড়ে তাদের কথাগুলোর সঠিক প্রতিফলন করতে হলে শিক্ষিত জ্ঞানী সাংবাদিকের ময়দানে আসতে হবে। তখন নকল সাংবাদিকরা উধাও হয়ে যাবে।
আরেকটি বাস্তবতা হলো, সংবাদপত্র জগতে এখনো বাম ঘরানার লোকদের বিচরণ বেশি। কারণ এখানে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, না খেয়ে থাকতে হয়। যে কারণে নগদপ্রাপ্তিতে বিশ্বাসী ধর্মীয় মহলের লোকেরা ঝুঁকি নেয় না।
আমাদের চিন্তার এই অচলায়তন ভাঙ্গার স্বপ্ন নিয়ে দৈনিক ইনকিলাব যাত্রা করেছিল। আমাদের ধর্মীয় মহলে বাংলা চর্চার বিস্তার, বাংলায় ইসলামী জীবনবোধের উজ্জীবন ও বাস্তব জগতের সাথে চার দেয়ালে অন্তরীণ বুযর্গদের সংযোগ সৃষ্টির ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে দৈনিক ইনকিলাবের অবদান অনস্বীকার্য। মনে রাখতে হবে ইসলামে ‘অসির চেয়ে মসির গুরুত্ব বেশি। জ্ঞানীর কলমের কালী শহীদের রক্তের চেয়ে উত্তম।’ আধুনিকতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে স্বজাতির ভাষায় লেখা ও সাংবাদিকতাকে জিহাদের ময়দান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
লেখক: আমীর, ইসলামী ঐক্য আন্দোলন
দ.ক.সেই আর.২৬