
নিপুণ চন্দ্র : পৃথিবী যখন সকালের আলোয় জেগে উঠছে, তখন ইরানের কারাজের কাছে একটি সেতু ধসে পড়ল। উচ্চতায় মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে লম্বা সাসপেনশন ব্রিজ—বি১ ব্রিজ বা কারাজ ব্রিজ। তেহরান থেকে মাত্র ৩৫-৫০ কিলোমিটার দূরে, উত্তর কারাজ ফ্রিওয়ের অংশ। ১০৫০ মিটার লম্বা, সর্বোচ্চ স্তম্ভ ১৩৬ মিটার উঁচু। নির্মাণাধীন এই সেতুটি তেহরান-কারাজের যানজট কমানোর জন্য তৈরি হয়েছিল, একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সেতু। কিন্তু সেদিন সকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় সেটি দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। দুই দফা আক্রমণ, এক ঘণ্টার ব্যবধানে। ইরানি রাষ্ট্রীয় মিডিয়া ফার্স নিউজ জানাল—৮ জন নিহত, ৯৫ জন আহত। সেতুটি আর কখনো ব্যবহারযোগ্য হবে না।
এই একটি সেতুর পতন শুধু একটি অবকাঠামোর ধ্বংস নয়। এটি একটি যুগের প্রতীক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে ভিডিও পোস্ট করে লিখলেন, “The biggest bridge in Iran comes tumbling down, never to be used again — Much more to follow!” (ইরানের সবচেয়ে বড় সেতু ধসে পড়েছে, আরও অনেক কিছু আসছে!)। এর আগের দিন প্রাইম-টাইম ভাষণে তিনি বলেছিলেন, “We are going to bring them back to the Stone Ages, where they belong” (আমরা তাদের প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেব, যেখানে তাদের জায়গা)। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও একই সুরে কথা বললেন। এটি ২০২৬-এর ইরান যুদ্ধের দ্বিতীয় মাস। যুদ্ধ যেখানে সামরিক লক্ষ্যের পাশাপাশি সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রাস্তা—সবকিছুকে লক্ষ্য করে চলছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, এই সেতু ইরানি সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি’র মিসাইল-ড্রোন সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত হতো। কিন্তু বাস্তবে এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের অংশ ছিল।
এই “প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়া”র হুমকি শুধু কথার কথা নয়। এটি একটি নতুন ধরনের যুদ্ধের ঘোষণা—অবকাঠামো যুদ্ধ। যেখানে শত্রুর অর্থনীতি, যোগাযোগ ও জীবনযাত্রাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। ইরানের উত্তর কারাজ ফ্রিওয়ের এই সেতু শুধু একটি সেতু নয়; এটি তেহরানের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের বাণিজ্য ও যাতায়াতের মেরুদণ্ড। নির্মাণ শুরু হয়েছিল ২০১৫-১৬ সালে, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি, ব্যয় প্রায় ৫০০ বিলিয়ন রিয়াল (প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার)। এর ধ্বংস ইরানের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সাময়িকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়া আরও ভয়ংকর।
ইরান তাৎক্ষণিকভাবে “ব্রিজ ফর ব্রিজ” নীতি ঘোষণা করেছে। ফার্স নিউজসহ অন্যান্য মিডিয়ায় ৭-৮টি গুরুত্বপূর্ণ সেতু চিহ্নিত করে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এগুলো মূলত মার্কিন মিত্র দেশগুলোতে—গাল্ফ স্টেটস, জর্ডান, ইসরায়েল। ইরান বলছে, এগুলো “বৈধ লক্ষ্য”। ইতিমধ্যে গাল্ফ দেশগুলোতে তেল ট্যাঙ্কার ও রিফাইনারিতে ইরানি হামলা হয়েছে। এখন সেতু-সেতুর লড়াই শুরু হয়েছে।
প্রথম লক্ষ্য কুয়েতের শেখ জাবের আল-আহমাদ আল-সাবাহ সি কজওয়ে। ৩৬.১ কিলোমিটার লম্বা মেইন লিঙ্ক, বিশ্বের চতুর্থ দীর্ঘতম রোড ব্রিজ। কুয়েত সিটিকে উত্তরাঞ্চলের সুবিয়াহ ও বুবিয়ান আইল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত করে। এটি কুয়েতের ২০৩৫ ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানের অংশ। ধ্বংস হলে কুয়েতের যাতায়াত ও অর্থনীতি পুরোপুরি থেমে যাবে।
দ্বিতীয়, সৌদি আরব-বাহরাইনের কিং ফাহদ কজওয়ে। ২৫ কিলোমিটার লম্বা, ১৯৮৬ সালে চালু। খোবার (সৌদি) থেকে আল জাসরা (বাহরাইন) পর্যন্ত। এটি দুই দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগের মূল সেতু। প্রতিদিন হাজার হাজার গাড়ি চলাচল করে। ধ্বংস হলে গাল্ফের বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে।
তৃতীয় ও চতুর্থ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের শেখ জায়েদ ব্রিজ ও শেখ খলিফা ব্রিজ। শেখ জায়েদ ব্রিজ (৮৪২ মিটার লম্বা, ৬৪ মিটার উঁচু) জাহা হাদিদের ডিজাইন করা আইকনিক স্ট্রাকচার। আবু ধাবি আইল্যান্ডকে মেইনল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত করে। তরঙ্গের মতো আকৃতি, বালুর টিলার প্রতীক। এটি ধ্বংস হলে আমিরাতের রাজধানীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
জর্ডানের কিং হুসেইন ব্রিজ (আলেনবি ব্রিজ) ও ডামিয়া ব্রিজ, আবদৌন ব্রিজ। কিং হুসেইন ব্রিজ জর্ডান নদী পেরিয়ে জেরিকোর কাছে। জর্ডান-প্যালেস্টাইন-ইসরায়েলের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বর্ডার ক্রসিং। এটি ধ্বংস হলে আঞ্চলিক যোগাযোগ পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।
ইসরায়েলের আরিক ব্রিজ (হাইওয়ে ৮৭)। জর্ডান নদীর উপরে, লোয়ার গ্যালিলি থেকে গোলান হাইটসে যাওয়ার রাস্তা। এটি ধ্বংস হলে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ বিঘ্নিত হবে।
ইরানের এই হুমকি শুধু প্রতিশোধ নয়, এটি একটি স্পষ্ট বার্তা—যদি আমাদের অবকাঠামো ধ্বংস হয়, তাহলে তোমাদেরও। কিন্তু এই সেতু যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
এই যুদ্ধে (২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত) মৃত্যুর সংখ্যা ভয়াবহ। ইরানে মোট মৃত্যু ২,০০০ থেকে ৭,৩০০-এর বেশি। ইরানি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও আল জাজিরা অনুসারে প্রায় ২,০৭৬ নিহত, ২৬,৫০০+ আহত। স্বাধীন মানবাধিকার গ্রুপ এইচআরএএনএ বলছে ৩,৫৩১ (১,৬০৭ সিভিলিয়ান, ১,২১৩ মিলিটারি)। হেঙ্গাও (কুর্দি মানবাধিকার গ্রুপ) প্রথম ৩৪ দিনে ৭,৩০০+ (৬,৪১০+ মিলিটারি/আইআরজিসি, ৮৯০ সিভিলিয়ান)। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল দাবি ৬,০০০+ ইরানি সামরিক মৃত্যু। সিভিলিয়ান ক্ষতি সবচেয়ে বেশি—৭০০-১,৫০০+ (শিশু-নারীসহ)। অনেক হামলা স্কুল, হাসপাতাল, আবাসিক এলাকায় হয়েছে।
ইসরায়েলে মোট মৃত্যু ১৯-২৮ (বেশিরভাগ সিভিলিয়ান, ইরানি মিসাইল হামলায়)। সামরিক ১১ জন। আহত ৬,০০০+। যুক্তরাষ্ট্রে ১৩-১৫ সামরিক মৃত্যু, ২০০-৫২০+ আহত। লেবানন/হিজবুল্লাহতে ৪০০-১,৩৬৮+। গাল্ফ দেশে প্রাথমিকভাবে ২৭ জন। মোট মৃত্যু ৮,০০০-১০,০০০+ ছাড়িয়ে যেতে পারে। সংখ্যাগুলো বিতর্কিত—ইরান সরকার কম দেখায়, পশ্চিমা সূত্র বেশি। কিন্তু সত্য একটাই: যুদ্ধ চলমান, প্রতিদিন বাড়ছে।
এই যুদ্ধের পটভূমিতে ইরানের অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নের ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ শুরুর আগে (২০২৬ ফেব্রুয়ারির আগে) সরকার আন্দোলন দমনে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। ২০২২-২০২৩-এর “ওম্যান, লাইফ, ফ্রিডম” আন্দোলন—মাহসা (ঝিনা) আমিনির মৃত্যুর পর। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অনুমান ৫৫১ জন নিহত (ইরান হিউম্যান রাইটস ও ইউএন ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন)—৬৮ শিশু, ৪৯ নারী। এইচআরএএনএ বলছে ৪৬৯-৫৫১। বিবিসি-অ্যামনেস্টি ৪০০-৫০০+। আহত হাজার হাজার, গ্রেফতার ১৪,০০০-২২,০০০+। ৩১টি প্রদেশের ২৬টিতে ছড়িয়ে পড়া এ আন্দোলনে “ব্লাডি ফ্রাইডে” (জাহেদানে ১০৪+ নিহত) হয়েছে।
২০১৯ নভেম্বরে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে অ্যামনেস্টি অনুসারে ১,৫০০+ নিহত। ২০২৪-২৫-এ ছোট-বড় প্রতিবাদে শত শত গ্রেফতার, কয়েক ডজন নিহত। সার্বিক অনুমান—যুদ্ধের আগে প্রায় ২,০০০+ নিহত। এসব সংখ্যা শুধু প্রত্যক্ষ গুলিতে নয়; কারাগারে নির্যাতন, সন্দেহজনক মৃত্যুও আছে। ইরান সরকার এগুলোকে “দাঙ্গা” বলে অস্বীকার করে।
এখন এই অবকাঠামো যুদ্ধ বেসামরিক মানুষের জীবনকে আরও বিপন্ন করছে। ইরানে ব্রিজ ধ্বংসে যান চলাচল বন্ধ, খাদ্য-পানি-বিদ্যুৎ সংকট, হাসপাতাল অচল, অর্থনৈতিক ধস, শরণার্থী স্রোত, দূষণ। তেহরানকে ইতিমধ্যে “ভূতের শহর” বলা হচ্ছে। গাল্ফ দেশগুলোতে (সৌদি, ইউএই, কুয়েত, জর্ডান) ব্রিজ হামলায় বেসামরিক যাত্রী মৃত্যু, যান দুর্ঘটনা, তেল রপ্তানি বন্ধ—জ্বালানি সংকট, দাম বৃদ্ধি, বাণিজ্য বিঘ্ন, পর্যটন ধস। ইসরায়েলে সীমিত ঝুঁকি কিন্তু অর্থনৈতিক চাপ। বিশ্বব্যাপী তেলের দাম আকাশছোঁয়া, মুদ্রাস্ফীতি, সাপ্লাই চেইন বিঘ্ন—স্ট্রেইট অব হরমুজ ঝুঁকিতে।
ইউএন ইতিমধ্যে “মানবিক সংকট” সতর্ক করেছে। এটি প্রত্যক্ষ বেসামরিক অবকাঠামো যুদ্ধ। ইরানে বেসামরিক হতাহত ইতিমধ্যে হয়েছে। ইরানের প্রতিশোধ হলে গাল্ফের সাধারণ মানুষের যাতায়াত, চাকরি, জ্বালানি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যুদ্ধ যত বাড়বে, মানবিক ক্ষয়ক্ষতি তত বাড়বে।
“প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়া” শুধু একটি হুমকি নয়—এটি একটি দর্শন। যেখানে আধুনিক অবকাঠামোকে ধ্বংস করে অতীতের অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয়। কিন্তু ইতিহাস বলে, সেতু ধ্বংস করলে শুধু রাস্তা বন্ধ হয় না, মানুষের আশা-স্বপ্নও ভেঙে যায়। ইরানের অভ্যন্তরীণ দমন ও বাইরের যুদ্ধ একসঙ্গে চলছে। মাহসা আমিনির আন্দোলন থেকে আজকের ব্রিজ যুদ্ধ—সবই একই সূত্রে গাঁথা। সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করা, তাদের জীবনযাত্রা ধ্বংস করা।
পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। শান্তি ও মানবিক ক্ষয়ক্ষতি কমানোই এখন সবচেয়ে জরুরি। প্রস্তর যুগে ফেরার হুমকি যেন কোনো জাতির ভাগ্য না হয়। কারণ সেতু পুনর্নির্মাণ করা যায়, কিন্তু হারানো প্রাণ ফিরিয়ে আনা যায় না।
দ.ক.সিআর.২৬