
মাওলানা নাজমুল হাসান কাসেমী : মানব সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে দারিদ্র্য এক অমীমাংসিত অভিশাপ। একদল মানুষের বিলাসী জীবন আর অন্যদলের নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর চিরন্তন হাহাকার— এই বৈষম্য যেন আধুনিক অর্থনীতির এক অনিবার্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ইসলামি জীবনদর্শনে সম্পদকে কেবল ব্যক্তিগত ভোগের বস্তু হিসেবে দেখা হয়নি, বরং একে সামাজিক আমানত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই আমানত রক্ষার অন্যতম প্রধান ও বাধ্যতামূলক হাতিয়ার হলো ‘জাকাত’। এটি কেবল দয়া বা করুণা নয়, বরং ধনীর সম্পদে দরিদ্রের এক অলঙ্ঘনীয় আইনি ও নৈতিক অধিকার। পবিত্র কুরআনের অমোঘ ঘোষণা: তাদের (ধনীদের) সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে। (সুরা আয-যারিয়াত: ১৯)
বর্তমান বিশ্ব যখন অসম বণ্টন আর মুদ্রাস্ফীতির যাতাকলে পিষ্ট, তখন দারিদ্র্য বিমোচনে জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা হতে পারে এক টেকসই ও মানবিক মহৌষধ।
জাকাতের সামাজিক দর্শন
ইসলামি অর্থব্যবস্থার মূল স্তম্ভ হলো জাকাত। পবিত্র কুরআনে নামাজের ঠিক পরপরই জাকাতের নির্দেশ প্রায় ৩২ বার এসেছে। এই পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে আল্লাহর ইবাদত (নামাজ) এবং সৃষ্টির সেবা (জাকাত) অবিচ্ছেদ্য। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনুল কারিমে বলেছেন : তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং জাকাত প্রদান করো। (সুরা আল-বাকারা: ৪৩)
জাকাত ব্যবস্থার মূল দর্শন হলো সম্পদের সুষম আবর্তন নিশ্চিত করা। পুঁজি যখন গুটিকয়েক মানুষের হাতে বন্দি থাকে, তখন সমাজ আক্ষরিক অর্থেই স্থবির হয়ে পড়ে। জাকাত হলো অর্থের সেই জীবনীশক্তি যা সমাজের নিচুতলার মানুষের শিরায় শিরায় রক্ত প্রবাহের মতো পৌঁছে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে এবং সমাজকে গতিশীল রাখে।
হাদিসের আলোকে দারিদ্র্য বিমোচন
রাসুলুল্লাহ (সা.) জাকাতকে ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং এর সামাজিক গুরুত্ব বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন। তিনি সাহাবি মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে যখন ইয়ামেনে শাসক হিসেবে পাঠিয়েছিলেন, তখন নির্দেশ দিয়েছিলেন: তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের ওপর জাকাত ফরজ করেছেন, যা তাদের ধনীদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে এবং তাদের দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। (বুখারি: ১৪৯৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার মূল লক্ষ্য ছিল স্থানীয় দারিদ্র্য দূর করা। তাঁর যুগে জাকাত ছিল দারিদ্র্য নিরসনের প্রধান রাষ্ট্রীয় হাতিয়ার, যা পরবর্তীকালে খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল।
জাকাত যে দারিদ্র্যকে চিরতরে নির্বাসনে পাঠাতে পারে, তার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হলো খলিফা হজরত উমর ইবনে আবদুল আজিজের (র.) শাসনকাল। তাঁর সময়ে জাকাত ব্যবস্থাপনা এতটাই দক্ষ ও স্বচ্ছ ছিল যে, মানুষ জাকাতের অর্থ হাতে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরত, কিন্তু তা নেওয়ার মতো একজন অভাবী মানুষও খুঁজে পাওয়া যেত না। এটি কোনো রূপকথা নয়, বরং সুষ্ঠু পরিকল্পনার ফসল। তিনি জাকাতকে কেবল অভাব মিটানোর কাজে নয়, বরং মানুষের ঋণের বোঝা হালকা করা এবং স্থায়ীভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যবহার করেছিলেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সঠিক জাকাত ব্যবস্থাপনা কোনো জাতিকে পরনির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি দিয়ে আত্মনির্ভরশীলতার শিখরে নিয়ে যেতে পারে।
আধুনিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও জাকাতের ভূমিকা
বর্তমান বিশ্ব এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ধনবৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছে। অক্সফাম-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, তা কয়েকশ কোটি দরিদ্র মানুষের মোট সম্পদের সমান। এই বৈষম্য দূর করতে আধুনিক অর্থনীতিবিদরা প্রগতিশীল কর ব্যবস্থার কথা বললেও তা ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি।
বিপরীতে, জাকাত হলো একটি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দায়িত্ব। এখানে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ কম, কারণ এটি সরাসরি মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার সাথে জড়িত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যাপক সাফল্য দেখালেও এখনো একটি বড় অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। প্রতি বছর ব্যক্তিগতভাবে মানুষ প্রচুর জাকাত দিলেও তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লুঙ্গি বা শাড়ি বিতরণের মতো সাময়িক সাহায্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে দারিদ্র্য দূর হয় না, বরং তা বছর বছর পুনরাবৃত্তি ঘটে।
আমাদের দেশে যদি পরিকল্পিতভাবে জাকাত সংগ্রহ ও বণ্টন করা হয়, তবে তা দারিদ্র্য বিমোচনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ জাকাত যোগ্য সম্পদ রয়েছে, তার সঠিক ব্যবস্থাপনা হলে কয়েক বছরের মধ্যে দেশে কোনো ভিক্ষুক থাকবে না।
উপসংহার
দারিদ্র্য বিমোচনে জাকাত কেবল একটি ধর্মীয় বিধান নয়। এটি দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে বিদ্বেষ দূর করে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করে। সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে জাকাতের চেয়ে কার্যকর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা আর নেই। আজ আমাদের প্রয়োজন ব্যক্তি পর্যায়ে জাকাত প্রদানের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে এর সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
জাকাত হোক দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার। সম্পদের পাহাড় না গড়ে আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসাই হোক আমাদের ব্রত। কারণ, একটি শোষণমুক্ত ও দারিদ্র্যমুক্ত সমাজই পারে পৃথিবীতে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে। সমাজ যখন দারিদ্র্যমুক্ত হয়, তখন সেই সমৃদ্ধি সবার জন্যই কল্যাণ বয়ে আনে।
মাওলানা নাজমুল হাসান কাসেমী প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, আস-সুফফাহ মডেল মাদরাসা, গাজীপুর
দ.ক.সিআর.২৬