
দিল্লির সিংহাসনে আজ পর্যন্ত একজনই নারী বসেছেন। তাঁর নাম রাজিয়া। সময়টা ত্রয়োদশ শতকের গোড়ার দিক, যখন ক্ষমতা মানেই ছিল তলোয়ার আর তুর্কি আমিরদের মর্জি। সেই দরবারে একজন নারী চার বছর রাজত্ব করেছেন, এটাই তাঁর গল্পকে আলাদা করে তোলে।
রাজিয়ার জন্ম আনুমানিক ১২০৫ সালে। বাবা সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশ। রাজপরিবারের মেয়ে হিসেবে তিনি শুধু অন্দরমহলে আটকে থাকেননি। বাবার পাশে থেকে রাজ্য চালানোর হালচাল দেখেছেন, শিখেছেন। ইলতুৎমিশ নিজেও বুঝেছিলেন, ছেলেদের চেয়ে মেয়েই এই দায়িত্বের জন্য বেশি উপযুক্ত। তাই মৃত্যুর আগে তিনি রাজিয়াকেই উত্তরাধিকারী ঠিক করেন।
কিন্তু ১২৩৬ সালে সুলতান মারা যাওয়ার পর সেই ইচ্ছার দাম দিল না কেউ। তুর্কি আমিররা একজন নারীর অধীনে চলতে রাজি ছিলেন না। তাঁরা সিংহাসনে বসালেন রাজিয়ার সৎভাই রুকনুদ্দিন ফিরোজকে। ফিরোজ ছিলেন আরামপ্রিয় মানুষ, রাজ্য সামলানোর মতো মনোযোগ তাঁর ছিল না। কয়েক মাসের মধ্যেই দরবারে বিশৃঙ্খলা শুরু হলো। ঠিক তখনই সুযোগ এল রাজিয়ার সামনে। দিল্লির সাধারণ মানুষের সমর্থন নিয়ে ১২৩৬ সালের নভেম্বরে তিনি সিংহাসনে বসলেন।
একটা কথা এখানে বলে রাখা ভালো। আমরা তাঁকে “সুলতানা রাজিয়া” বলে ডাকি, কিন্তু তিনি নিজে এই উপাধি পছন্দ করতেন না বলেই ধারণা করা হয়। তখনকার দিনে “সুলতানা” বলতে বোঝাত সুলতানের স্ত্রী বা পরিবারের নারীকে। রাজিয়া চেয়েছিলেন নিজের পরিচয়ে সুলতান হিসেবেই পরিচিত হতে।
সিংহাসনে বসে তিনি আর দশজন শাসকের মতোই কাজ করেছেন। নিজে দরবার চালিয়েছেন, প্রজাদের অভাব-অভিযোগ শুনেছেন, প্রয়োজনে সেনাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিবরণ অনুযায়ী, তিনি পর্দা ছেড়ে পুরুষদের মতো পোশাক পরে প্রকাশ্যে বের হতেন। সমকালীন ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ তাঁর বিচক্ষণতা আর ন্যায়বিচারের প্রশংসা করেছেন। তবে একই লেখায় এ কথাও আছে যে, তিনি নারী বলেই এসব গুণ নাকি কোনো কাজে আসেনি। এই এক বাক্যেই বোঝা যায়, রাজিয়ার আসল বাধা কী ছিল।
আমিরদের সঙ্গে তাঁর টানাপোড়েন বাড়তে থাকে। বিশেষ করে জামালউদ্দিন ইয়াকুত নামে এক আবিসিনীয় কর্মকর্তাকে তিনি উঁচু পদে বসানোর পর তুর্কি অভিজাতদের ক্ষোভ ফেটে পড়ে। তাঁদের কাছে এটা ছিল নিজেদের একচেটিয়া ক্ষমতায় হাত পড়া।
১২৪০ সালে ভাটিন্ডার শাসক মালিক আলতুনিয়া বিদ্রোহ করলেন। রাজিয়া সেনা নিয়ে তাঁকে দমন করতে গেলেন। কিন্তু লড়াইয়ে ইয়াকুত মারা পড়লেন, আর রাজিয়া বন্দি হলেন। এরপর বহু বিবরণ বলছে, আলতুনিয়ার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। দুজনে মিলে দিল্লি ফেরার চেষ্টা করলেন, কিন্তু রাজিয়ার আরেক সৎভাই মুইজউদ্দিন বাহরাম শাহের বাহিনীর কাছে হেরে গেলেন।
১২৪০ সালের অক্টোবরে রাজিয়ার মৃত্যু হয়। কীভাবে, ঠিক কোথায়, সে বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। বেশির ভাগ সূত্রে বলা হয়, পরাজয়ের পর পালানোর পথে তিনি ও আলতুনিয়া নিহত হন। পরের যুগের লোককাহিনিতে ঘটনাটা আরও নানা রঙে এসেছে।
রাজিয়া রাজত্ব করেছেন মাত্র কয়েক বছর। তবু এই সময়টুকুতেই তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, শাসন করার যোগ্যতা কোনো এক লিঙ্গের একার সম্পত্তি নয়। তাঁর সময়ের ক্ষমতাবানেরা সেটা মানেননি, সেই দাম তিনি নিজের জীবন দিয়েই চুকিয়েছেন। তবু আট শ বছর পরেও দিল্লির ইতিহাসে তিনি একা দাঁড়িয়ে আছেন: প্রথম নারী সুলতান, এবং আজ পর্যন্ত একমাত্র।
দ.ক/ইতিহাস