রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ :
শায়েস্তাগঞ্জে মাদক, জুয়া ও অপরাধ প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা নারী চা শ্রমিকদের মাঝে ৮৫০ পিস রেইনকোট বিতরণ করলেন চেয়ারম্যান জাকির হোসেন পলাশ লটারির মাধ্যমে স্কুলে ভর্তির ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা হারিয়ে গেছেন: জি কে গউছ সরকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও চা শ্রমিকদের টেকসই উন্নয়নে কাজ করছে: এমপি ফয়সল টেকসই অর্থনীতির সমাধান যখন বিজ্ঞানের হাতে- ঝুমি রানী পাল জীবন্ত কবর দেওয়া বাংলার নবাব কন্যার রহস্যময় ইতিহাস ১১ মামলার আসামি ‘ডাকাত কামরুল’ জামিনে বেরিয়েই ফের তাণ্ডবে—গোয়াইনঘাটে আতঙ্কের রাজত্ব! বাবার লাশ সৎকার না করেই যুদ্ধে গিয়েছিলেন যে নারী জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে ভোট চাইলেন সজল সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয়, এটি জাতির প্রতি অঙ্গীকার : খায়রুল আলম সুমন

টেকসই অর্থনীতির সমাধান যখন বিজ্ঞানের হাতে- ঝুমি রানী পাল

  • প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬
  • ঝুমি রানী পাল: একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক বাস্তবতায় অর্থনৈতিক শক্তি ও জাতীয় পরাক্রমের সংজ্ঞা পুরোপুরি বদলে গেছে। একসময় যে দেশের ভূখণ্ড যত বিশাল ছিল কিংবা যার মাটির নিচে খনিজ তেল আর সোনার মজুদ ছিল, তাকেই ধরা হতো বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল নিয়ামক। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে সেই ধারণা ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। মাটির নিচে জমা থাকা খনিজ সম্পদের চেয়েও এখন অনেক বেশি মূল্যবান মানুষের মেধা, বিজ্ঞানচর্চা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, শিল্পবিপ্লবের পর থেকে যেসব জাতি বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে তাদের অর্থনৈতিক উৎপাদনের মূল হাতিয়ার করতে পেরেছে, তারাই বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বিপরীতে, বিজ্ঞান ও গবেষণাকে অবহেলা করে শুধু প্রথাগত উপায়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা দেশগুলো আজও অনুন্নত বা উন্নয়নশীল স্তরেই থমকে আছে।

যেকোনো দেশের অর্থনীতির সার্বিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে তিনটি প্রধান খাতের ওপর যেগুলো হচ্ছে কৃষি, শিল্প এবং সেবা। এই তিনটি খাতেই কাঙ্ক্ষিত গতি আনতে বিজ্ঞান সরাসরি ভূমিকা রাখে।

কৃষিতে বৈজ্ঞানিক আধুনিকায়ন:
ঐতিহ্যগত কৃষিব্যবস্থা দিয়ে আজকের বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব। কয়েক দশক আগেও যেখানে ফসল ফলানোর বিষয়টি পুরোপুরি প্রকৃতির দয়ার ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেখানে বায়োটেকনোলজি বা জৈবপ্রযুক্তি এসে দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা আবহাওয়ার প্রতিকূলতা, যেমন: খরা, বন্যা বা চরম লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে এমন সব নতুন শস্যের জাত উদ্ভাবন করেছেন। এর ফলে সীমিত জমিতেও আগের চেয়ে বহুগুণ বেশি ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। শুধু তাই নয়, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও সেন্সরের সাহায্যে মাটির আর্দ্রতা মেপে সঠিক পরিমাণে সেচ ও সার প্রয়োগের ব্যবস্থা করায় অপচয় যেমন কমছে, তেমনি কমছে উৎপাদন খরচও। কৃষির এই বৈজ্ঞানিক আধুনিকায়ন কেবল কৃষকের আয় বাড়াচ্ছে না, বরং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এনে জাতীয় অর্থনীতির ওপর চাপ অনেকটা কমিয়ে দিচ্ছে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবনতুন শিল্প খাত:
শিল্পখাতের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অবদান আরও বেশি প্রত্যক্ষ। বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যেখানে আগের শিল্পবিপ্লবগুলোতে মানুষের কায়িক শ্রম কমানোর দিকে নজর দেওয়া হয়েছিল, সেখানে বর্তমান যুগে জোর দেওয়া হচ্ছে স্বয়ংক্রিয়তা বা অটোমেশনের ওপর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স এবং অ্যাডভান্সড মেটেরিয়ালসের কল্যাণে কারখানায় অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও ত্রুটিমুক্ত পণ্য উৎপাদন হচ্ছে কম সময়ে ও কম খরচে। যেসব দেশ এই প্রযুক্তি দ্রুত গ্রহণ করতে পেরেছে, বিশ্ববাজারে তাদের পণ্যের দাম প্রতিযোগিতামূলক রাখা সম্ভব হচ্ছে। ফলে তারা রপ্তানি আয়ে অন্যান্য দেশকে সহজেই পেছনে ফেলে দিচ্ছে। বিজ্ঞান কেবল পুরনো শিল্পকেই আধুনিক করে না, বরং ন্যানোটেকনোলজি বা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফার্মাসিউটিক্যালস, ইলেকট্রনিক্স ও অটোমোবাইলের মতো সম্পূর্ণ নতুন নতুন খাতের সৃষ্টি করছে, যা দেশের অভ্যন্তরে অগণিত কর্মসংস্থান তৈরি করে।

ডিজিটাল সেবাঅর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অভাবনীয় গতি সেবা খাতকে অর্থনীতির অন্যতম বৃহৎ স্তম্ভে পরিণত করেছে। আধুনিক ইন্টারনেটের কল্যাণে ভৌগোলিক সীমানার ধারণা আজ অর্থহীন। আজকের বিশ্ববাজার এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে বসে প্রান্তিক কোনো তরুণও বিদেশের বড় কোনো কোম্পানির প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান করে দিচ্ছে। এই ডিজিটাল রূপান্তর বৈদেশিক মুদ্রার আগমন সহজ করার পাশাপাশি দেশের ভেতরে বিশাল এক উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরি করেছে। মোবাইল ব্যাংকিং বা ডিজিটাল আর্থিক সেবার মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষও এখন মূল অর্থনীতির মূলধারার সঙ্গে যুক্ত হতে পারছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে মাঝারি উদ্যোক্তারাও এখন নিজেদের মূলধন দ্রুত খাটাতে পারছেন, যার সামগ্রিক প্রভাব গিয়ে পড়ছে জাতীয় জিডিপিতে।

সুস্থ মানবসম্পদসবুজ প্রযুক্তি:
তবে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি বা ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারই অর্থনীতির শেষ কথা নয়; টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন সুস্থ ও কার্যকর মানবসম্পদ। এই জায়গাতেও বিজ্ঞান সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের আধুনিক আবিষ্কার, প্রতিষেধক টিকা ও উন্নত জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থার ফলে মানুষের গড় আয়ু আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। রোগব্যাধির প্রাদুর্ভাব কমে যাওয়ায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দীর্ঘকাল ধরে জাতীয় উৎপাদনে ভূমিকা রাখতে পারছে। চিকিৎসা ও ওষুধ খাতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রসার একদিকে যেমন নাগরিকদের চিকিৎসার পেছনে ব্যক্তিগত ব্যয় কমায়, অন্যদিকে ওষুধ শিল্পকে স্বাবলম্বী করে রপ্তানির নতুন দুয়ার খুলে দেয়।

একইভাবে পরিবেশ ও প্রবৃদ্ধির মধ্যকার দ্বন্দ্ব মেটাতেও বিজ্ঞান আমাদের সামনে পথ দেখাচ্ছে। ঐতিহ্যগত জীবাশ্ম জ্বালানি বা তেল-কয়লার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বিশাল হুমকি। বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেই দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এর টেকসই সমাধান লুকিয়ে রয়েছে নবায়নযোগ্য শক্তিতে। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং সবুজ প্রযুক্তির (Green Technology) কার্যকারিতা বাড়াতে বিজ্ঞানীরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। পরিবেশবান্ধব এই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতি না করেই দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে।

গবেষণায় বাজেট বরাদ্দমেধা পাচার রোধ: এত সুফল থাকা সত্ত্বেও প্রশ্ন থেকে যায় ‘উন্নয়নশীল দেশগুলো কেন বিজ্ঞানের পূর্ণ সুফল পেতে ব্যর্থ হচ্ছে?’ এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে বিজ্ঞানে আমাদের বিনিয়োগের মানসিকতায়। অনুন্নত বা মাঝারি আয়ের দেশগুলোতে গবেষণাগারকে একটি ব্যয়বহুল জায়গা হিসেবে দেখা হয়, বিনিয়োগ হিসেবে নয়। দেখা যায়, এসব দেশে জিডিপির এক শতাংশেরও কম অংশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণার জন্য বরাদ্দ করা হয়। অন্যদিকে, উন্নত বিশ্ব তাদের জিডিপির একটি বড় অংশ নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে ঢেলে দেয়।
শুধু বাজেট বরাদ্দ বাড়ালেই চলবে না, শিক্ষা ব্যবস্থাকেও আধুনিক বিশ্বের উপযোগী করে পুনর্গঠন করতে হবে। মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা ব্যবস্থার বদলে উদ্ভাবনী চিন্তা, গণিত ও প্রযুক্তিভিত্তিক বাস্তবমুখী শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে। পাশাপাশি, দেশীয় মেধাবীরা যেন উপযুক্ত পরিবেশ ও মূল্যায়ন পেয়ে দেশে বসেই কাজ করতে পারে, সেই ব্যবস্থা না করলে মেধা পাচার কোনোভাবেই ঠেকানো যাবে না।

পরিশেষে এ কথা স্পষ্ট করেই বলা যায় যে, বর্তমান বিশ্বে বিজ্ঞান কোনো বিলাসী চর্চার বিষয় নয়, বরং এটি একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের প্রাথমিক শর্ত। পৃথিবীর বুকে কোনো দেশই কেবল প্রথাগত ব্যবস্থার ওপর ভর করে দীর্ঘমেয়াদে সমৃদ্ধি ধরে রাখতে পারেনি। বিজ্ঞানের আলো যেখানে যত বেশি পড়েছে, সেখানকার অর্থনীতি তত বেশি মজবুত ও শক্তিশালী হয়েছে। নীতি-নির্ধারকদের এটি উপলব্ধি করতে হবে যে, গবেষণাগারে একটি আবিষ্কারের পেছনে ব্যয়িত অর্থ প্রকৃতপক্ষে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির এক লাভজনক বিনিয়োগ। তাই জাতীয় অগ্রগতির চাকা সচল রাখতে হলে প্রথাগত চিন্তাভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর নীতি গ্রহণ করার কোনো বিকল্প নেই।

দ.ক/জেআরপি

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© 𝐰𝐰𝐰.𝐤𝐚𝐚𝐥𝐧𝐞𝐭𝐫𝐨.𝐜𝐨𝐦
Theme Customized By BreakingNews