
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি: হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী একসময়ের বর্ষায় উত্তাল খরস্রোতা করাঙ্গী নদী এখন পানি শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। পানি না থাকায় বিলুপ্ত হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ। নদীর তলদেশ শুকিয়ে যাওয়ায় নাব্যতা হারিয়েছে করাঙ্গী। দখল-দূষণ আর অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। নদীর বুকে পলি জমে উঁচু হয়েছে।নদীর দুই পার দখল করে করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ। দখল আর দূষণের কারণে দুই পাড় চেপে গেছে। ফলে খরস্রোতা করাঙ্গী নদী আজ শুধুই স্মৃতি, পরিণত হয়েছে মরা খালে।
এদিকে প্রভাবশালীদের হাতে চলছে নদী দখলের মহোৎসব। অনেকেই নদীর ভেতর গড়ে তুলেছেন দোকান, ঘরবাড়ী। পাশা-পাশি উপজেলার বিভিন্ন বাজারের ও কোম্পানির বর্জ্রও ফেলা হচ্ছে এই নদীর তীরে। এতে নদীর পানি শুধু দূষিতই হচ্ছে না, বরং বাতাসে ছড়াচ্ছে বিষ বাষ্প। কালের সাক্ষী হয়ে এখনো খুরিয়ে খুরিয়ে বয়ে চলছে এক কালের খরস্রোতা করাঙ্গী নদী। প্রভাবশালী ব্যাক্তিদের দখল, দূষণ, নদী ভরাটসহ নানাবিধ অত্যাচার চলছে এই নদীর উপর।
করাঙ্গী নদী বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের অন্যতম আন্তঃসীমান্ত খোয়াই নদীর একটি শাখা নদী। এটি ভারতের আসামের একটি নালা থেকে করাঙ্গী নদীর উৎপত্তি হয়ে হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট থানার সীমান্তবর্তী থেকে একই জেলার বাহুবল উপজেলা বয়ে বিভিন্ন হাওরে গিয়ে নিঃশেষ হয়েছে নদীটি। করাঙ্গী নদীটির দৈর্ঘ্য ৫৮ কিলোমিটার ও নদীটির গড় প্রস্থ ৩৫ মিটার। যা এক সময়ে কানায় কানায় পানিতে পূর্ণ থাকত নদীটি। খরস্রোতা এই নদীটি শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন মাস পর্যন্ত পানিতে পূর্ণ থাকলেও বাকি ৯ মাস মরা খালের রূপ নেয়। বর্ষা শেষে পানি শুকানো শুরু হলে স্থানীয়রা নদীর দুই পাশের ঢাল দখল করে চাষাবাদ করে।এতে কৃষিজমিসহ দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা নিবারণে তিন ইউনিয়নের জনসাধারণ পানি সংকটে ভুগছেন। হুমকির মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্য। এছাড়াও এক সময় নদীর তীরবর্তী এলাকার কৃষকরা বোরো মৌসুমে চাষাবাদের জন্য করাঙ্গী নদীর পানি ব্যবহার করতেন। কিন্তু কয়েক বছর ধরে নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় সেচযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন এলাকার কৃষকরা।
এখন কোনো কোনো স্থানে নদীর মাঝখানে চর জেগে ওঠে এবং তার দুই পাশ দিয়ে সরু নালার মতো সৃষ্টি হয়ে পানি প্রবাহিত হয়। কোথাও কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমর পর্যন্ত পানি থাকে তখন মানুষ নদী দিয়ে হেঁটে পার হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জেলেদের মৎস্য আহরণসহ এলাকার কৃষিকাজের পানির জন্য এই নদীর উপরই নির্ভরশীল ছিল উপজেলার হাজারো মানুষ। সম্প্রতি এক সময়ের পানি খরস্রোতা বাহুবলের করাঙ্গী নদী আজ পানিশূন্য। বিস্তৃর্ণ করাঙ্গী নদীর বুক যেন ফসলের মাঠ। নদীর বুকে পড়ছে চর, বুকে চিকচিক করছে ধু-ধু বালু। এরকম বাহুবল উপজেলার অধিকাংশ নদ-নদী খালবিল আজ পানিশূন্য।
পানি হচ্ছে নদীর প্রাণ। সেই পানির জন্য হাহাকার করছে উপজেলার করাঙ্গী নদী। অথচ কেউ শুনছে না নদীর এই কান্না। দখলে-দূষণে মরছে নদী। দীর্ঘদিন যাবৎ করাঙ্গী নদী খনন না করায় কালের আবর্তে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানির সাথে আসা বালি ও পলি পড়ে নদীর নাব্যতা হারিয়ে ফেলছে।
করাঙ্গী নদীর তলদেশে এখন ধান চাষ হচ্ছে। অপরদিকে চুনারঘাট উপজেলার রানিগাও এলাকায় করাঙ্গী নদীতে বাঁধ দিয়ে এবং উজানে তৈরি করা কয়েকটি ড্যাম ও ব্যারাজ পানির গতি পরিবর্তন করে করাঙ্গী নদীকে বাহুবল উপজেলায় পানিশূন্য করা হয়েছে।
এছাড়া অতিরিক্ত পলি জমে নদীটি ভরাট হয়ে গেছে। নানা ধরনের শিল্প বর্জ্যরে দূষণে নদীর প্রাণ বৈচিত্র্যও এখন হুমকির মুখে। পাশাপাশি নদীর পাড় দখল করে, কিংবা নদীর বুকেই চলছে অবৈধ নির্মাণ।
এক সময়ের অন্যতম নদী হিসাবে পরিচিত করাঙ্গী এখন বিশাল বালিচরের নিচে চাপা পড়ে হাহাকার করছে। দেখলে মনে হয় নদী নয় যেন নদীর ক্ষীণ ধারা। একসময়ের চঞ্চলা দূরন্ত যৌবনা আর দূরন্ত হয়ে ছুটে চলা করাঙ্গী এখন মরা নদীর নাম।
সচেতন মহল বলছেন, এক সময় বাঁধ দিয়ে স্রোত আটকানোর কারণে পলি জমে নাব্যতা হারিয়ে ভরাট হয়ে যায় নদী। ফলে যেমন পরিবেশ দূষণ হয়, তেমনি নদীতে পানি না থাকায় বিলুপ্ত হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ। দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষা করতে নদীটি পুনঃখনন প্রয়োজন। ফলে পানির বহুমুখী ব্যবহারসহ দেশীয় মাছের জীববৈচিত্র্য রক্ষাও সম্ভব হবে। এ ছাড়া দুই পারের জমি কর্ষণ বন্ধ করলে আবার নাব্যতা ফিরে পাবে। সেই সঙ্গে পরিবেশ দূষণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।
পরিবেশবিদদের অভিযোগ, খরস্রোতা এ নদীর যৌবন ফিরিয়ে আনতে নেই সরকারি কোনো উদ্যোগ; বরং কৃত্রিম সংকটের মাধ্যমে এ নদীকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা চলছে। নদীর উজানে চুনারুঘাট অংশে অপরিকল্পিত বাঁধ তৈরি করে ভাটি জনপদে পানির সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে নদীর দুই তীরের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পানি ব্যবহার ও গৃহপালিত পশু পালনে বিড়ম্বনায় পড়ছেন।
রাজাপুর গ্রামের কৃষক রাসেল মিয়া বলেন, উপজেলার বাহুবল সদর, ভাদেশ্বর ও সাতকাপন ইউনিয়নের কয়েক হাজার কৃষক আবহমানকাল থেকে করাঙ্গী নদীর পানি দিয়ে চাষাবাদ করতেন। তারা হাঁসের খামার ও গরু-ছাগল পালনে এ নদীর পানিতেই নির্ভরশীল ছিলেন।
স্থানীয় কৃষকরা বলেন, ‘একটা সময় ছিল যখন করাঙ্গী নদী দিয়ে বড় বড় নৌকা চলত। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এখন আর সে দৃশ্য দেখা যায় না। বড় নৌকাতো দূরের কথা এখন করাঙ্গী নদীটি একটি মরা খালে পরিণত হতে চলেছে।
বর্তমানে নদীতে পানি না থাকায় উপজেলার হাজারো রোরো ধানের জমি পানির অভাবে নষ্ট হতে যাচ্ছে। এছাড়া অব্যাহত দখল আর দূষণ তো রয়েছেই। তাই এখন যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এর কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তা হলে অচিরেই হারিয়ে যাবে করাঙ্গী নদী’।
শিক্ষানবিশ আইনজীবী মিজানুর রহমান মিজান বলেন, ‘নদীর ঢালে চাষাবাদ বন্ধ করে পুনঃখনন করলেই নাব্যতা ফিরে পাবে, তখন দেশীয় মাছগুলো বিচরণ করতে পারবে।’
এ ব্যাপারে জানতে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ মাহবুবুল ইসলাম-এর সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে প্রতিনিধি খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে তিনটি বিষয়ে জানতে চান। প্রশ্নগুলো ছিল—
১/ করাঙ্গী নদীর মূল সীমানা (আরএস/এসএ রেকর্ড অনুযায়ী) চিহ্নিতকরণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি?
২/ দখলদারদের বিরুদ্ধে কি মামলা বা জরিমানা করা হয়েছে?
৩/ নদী দখলমুক্ত করতে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কোনো রোডম্যাপ ঘোষণা করা হবে কি?
তবে উক্ত খুদে বার্তার বিপরীতে কোনো উত্তর বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে জানতে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সামিউন আসিফ-এর কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেন প্রতিনিধি।
প্রথম প্রশ্ন ছিল— করাঙ্গী নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় দেশীয় প্রজাতির মাছ কি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে?
এ প্রশ্নের জবাবে তিনি সংক্ষেপে বলেন, “হ্যাঁ।”
দ্বিতীয় প্রশ্নে জানতে চাওয়া হয়— করাঙ্গী নদী পুনরুদ্ধারে মৎস্য বিভাগের কোনো সুপারিশ বা পরিকল্পনা আছে কি?
জবাবে তিনি বলেন, “না।”
তৃতীয় প্রশ্ন ছিল— পানি উন্নয়ন বোর্ড বা উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিত কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়েছে কি?
এর উত্তরে তিনি বলেন, “এটি মৎস্য কর্মকর্তার দায়িত্ব নয়।”
মৎস্য কর্মকর্তার এই সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্ট বক্তব্যের পর স্থানীয়দের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সচেতন মহলের মতে, নদী শুকিয়ে গেলে মাছের প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়া স্বাভাবিক হলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ না থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চিন্ময় কর অপু বলেন, নদী খনন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দায়িত্ব নয়। তবে তার জানা মতে, বিএডিসি কিছু খাল খননের উদ্যোগ নিতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কৃষি বিভাগ বিভিন্ন স্থান উপযোগী প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বলে জানান তিনি। বাহুবলে ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তি সম্প্রসারণে এডব্লিউডি পদ্ধতিতে ধান চাষ, তাপ সহিষ্ণু গমের জাত, ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার, নবায়নযোগ্য শক্তিনির্ভর সেচ ও মালচিং পদ্ধতি প্রচলনের চেষ্টা চলছে। এছাড়া দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা খিলবামৈই সেচ প্রকল্প শিগগিরই চালু হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এ বিষয়টি জানতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) লিটন চন্দ্র দে-র সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
পরে প্রতিনিধি খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জানতে চান—
প্রথম প্রশ্ন ছিল— করাঙ্গী নদী পুনঃখনন বা নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল— নদীর বর্তমান অবস্থা নিরূপণে সর্বশেষ কবে কোনো সরকারি জরিপ বা সমীক্ষা পরিচালিত হয়েছে? তার ফলাফল কী?
তৃতীয় প্রশ্ন ছিল— নদী দখল, ভরাট বা অবৈধ স্থাপনার বিষয়ে কোনো তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে কি?
তবে খুদে বার্তা পাঠানোর পরও এ বিষয়ে কোনো ধরনের উত্তর বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না পাওয়ায় নদী পুনরুদ্ধার ও দখলমুক্তকরণ কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
উল্লেখ্য, এক সময়ের খরস্রোতা করাঙ্গী নদী খননের অভাবে ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে কৃষিকাজে পানি সরবরাহসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত স্থানীয়রা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালে হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০ কিলোমিটার নদী খনন প্রকল্প হাতে নিয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ২০২২ সালের ৩১ মে।২০ কিলোমিটার এলাকা খনন করা হলেও নানা অনিয়মের কারণে প্রকল্পটি ব্যর্থ হয়েছে।কিন্তু কাজের শুরুতেই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।নদী খননে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প শেষ হলেও নদীর বড় একটি অংশ এখন পানিশূন্য। ফলস্বরূপ করাঙ্গী নদী আজ মরা খালে পরিণত হয়েছে।
দ.ক.সিআর.২৬