
ভোট মানে শুধু ব্যালট পেপারে একটি সিল নয়। ভোট মানে নাগরিকের অধিকার, ভোট মানে আশা, ভোট মানে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও ন্যায্য রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত নিয়ে আসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২৬ এবং সংবিধান সংশোধন গণভোট। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার, সারাদেশে একযোগে এই নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক আয়োজন নয়—এটি জাতির গণতান্ত্রিক আত্মপরিচয়ের এক বড় পরীক্ষা। কিন্তু একটি প্রশ্ন আজও সাধারণ মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে—এই ভোট কি সত্যিই হবে মুক্ত, নির্ভীক ও শান্তিপূর্ণ? নাকি ভোটের হাট আবারও ভয়, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার ছায়ায় ঢাকা পড়বে? এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই নির্ভর করছে প্রশাসনের ভূমিকার ওপর। তাই প্রশাসনের প্রতি জনগণের পক্ষ থেকে আজ একটি আবেগী কিন্তু ন্যায্য আহ্বান—ভোটের পরিবেশকে ভয়মুক্ত ও আস্থাভিত্তিক করে তুলুন।
আমাদের দেশের ভোটাররা অতীতে বারবার এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে ভোট মানেই উদ্বেগ। ভোটকেন্দ্রে গেলে বাধা আসবে কি না, ভয় দেখানো হবে কি না, নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে কি না—এসব দুশ্চিন্তা সাধারণ মানুষের মনে নতুন নয়। এই ভয় কোনো কল্পনা নয়; এটি অতীত বাস্তবতার ফল। অথচ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যদি নাগরিক তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতেই শঙ্কিত হয়, তবে সেটি রাষ্ট্রের জন্য গভীরভাবে বেদনাদায়ক।
প্রশাসনের কাছে জনগণের প্রত্যাশা খুবই সাধারণ—আমরা নিরাপদে ভোট দিতে চাই। ১২ ফেব্রুয়ারি যেন মানুষ বুক ভরা সাহস নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে। কোনো অস্ত্রের ঝনঝনানি, কোনো মাস্তানি, কোনো জোরজবরদস্তির দৃশ্য যেন ভোটের দিনে দেখা না যায়। প্রশাসনের দৃঢ়, নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গত অবস্থানই পারে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে।
ভোটের হাটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলো ভোটার। সেই ভোটার যদি ভীত থাকে, তাহলে নির্বাচন কাগজে-কলমে সম্পন্ন হলেও তার গণতান্ত্রিক মূল্য থাকে না। তাই প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ—প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে পর্যাপ্ত ও নিরপেক্ষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করুন। ভোটার যেন নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারে, নিজের ভোট নিজে দিতে পারে এবং নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারে—এটাই জনগণের মৌলিক দাবি। নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রশাসনের নিরপেক্ষতা জনগণের আস্থার প্রধান ভিত্তি। কোনো দল বা প্রার্থীর প্রতি পক্ষপাত নয়—আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতি শুধু কথায় নয়, বাস্তব কাজেও প্রতিফলিত হতে হবে। মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সবাইকে মনে রাখতে হবে—তারা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নন, তারা রাষ্ট্র ও জনগণের সেবক।
নির্বাচনী প্রচারণা ও গণভোট সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমেও শালীনতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি। আচরণবিধি লঙ্ঘন, উসকানিমূলক বক্তব্য, গুজব ছড়ানো কিংবা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর মতো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। ভোটের মাঠ হোক যুক্তির, সহিংসতার নয়।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও ভোটের পরিবেশে বড় প্রভাব ফেলছে। মিথ্যা তথ্য, গুজব ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ভোটারদের বিভ্রান্ত করে এবং উত্তেজনা বাড়ায়। প্রশাসনের উচিত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ব্যবহার করে এসব অপতৎপরতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং সত্য ও নির্ভরযোগ্য তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
এই লেখা প্রশাসনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নয়। এটি জনগণের পক্ষ থেকে একটি সহযোগিতামূলক, দায়িত্বশীল আহ্বান। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণভোট হলে বিজয়ী হবে শুধু কোনো দল বা পক্ষ নয়—বিজয়ী হবে বাংলাদেশ, বিজয়ী হবে গণতন্ত্র।
শেষ কথা একটাই—আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি যেন আতঙ্কের দিন না হয়ে উৎসবের দিনে পরিণত হয়। বৃদ্ধ মা-বাবা, তরুণ ভোটার, নারী-পুরুষ সবাই যেন নিশ্চিন্তে ভোট দিতে পারে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব প্রশাসনের কাঁধেই।
প্রশাসনের প্রতি তাই বিনীত কিন্তু দৃঢ় অনুরোধ—ভোটের হাটে ভয় নয়, আস্থা ফিরিয়ে দিন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২৬ ও সংবিধান সংশোধন গণভোটকে ইতিহাসে স্মরণীয় করে রাখুন একটি মুক্ত, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক দৃষ্টান্ত হিসেবে।
দ.ক.সিআর.২৬