
পারভেজ হাসান, লাখাই : হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার ১ নং লাখাই ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের একটি গ্রাম ‘শিবপুর’। নাম শুনলে মনে হতে পারে সাধারণ কোনো জনপদ, কিন্তু বাস্তবে এটি যেন এক আধুনিক যুগের ‘বিচ্ছিন্ন দ্বীপ’। ৫ হাজার ভোটারের বিশাল এই বসতি আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা থেকে এতটাই দূরে যে, একে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা কোনো জনপদ মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সম্প্রতি এক সরেজমিন অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে এই জনপদের মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের চিত্র।
শিবপুর গ্রামটির অবস্থান এমন এক স্থানে, যার চতুর্দিকে শুধু হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি। এর উত্তরে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম থানার আদমপুর গ্রাম, আর পূর্বে লাখাইয়ের মাদনা বাজার। অবাক করার মতো বিষয় হলো, প্রশাসনিকভাবে গ্রামটি লাখাই উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও যোগাযোগের দিক থেকে লাখাইয়ের সাথে এর কোনো ন্যূনতম সংযোগ নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভাষার দিক দিয়ে কিশোরগঞ্জের সাথে মিল থাকলেও তাদের লাখাইয়ের সাথে রাখা হয়েছে, অথচ দেওয়া হয়নি কোনো চলাচলের পথ।
লাখাই থেকে শিবপুর যেতে হলে প্রথমে নৌকা দিয়ে সুতাং নদী পার হতে হয়। এরপর মোটরসাইকেল নিয়ে প্রায় দুই-আড়াই কিলোমিটারের যে পথ, তাকে কোনোভাবেই রাস্তা বলা চলে না। এটি মূলত ক্ষেতের আইল বা সরু পাকা ও কাঁচা মাটির পথ। অবস্থা এতটাই করুণ যে, একটি মোটরসাইকেল সচল রাখতে কোথাও কোথাও তিন-চার জনের ধাক্কার প্রয়োজন হয়। সন্ধ্যা হলে দূর থেকে লাখাইয়ের নিভু নিভু আলো দেখা যায় ঠিকই, কিন্তু সেই আলো দেখার সুযোগ এই শিবপুরবাসীর নেই।
শিবপুর গ্রামের একজন বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের ভোট আছে, কিন্তু রাস্তা নেই। আমাদের হাতে স্মার্টফোন পৌঁছেছে কিন্তু পায়ে হাঁটার পথ তৈরি হয়নি। অসুস্থ রোগী কিংবা শিক্ষার্থীদের কষ্টের কোনো সীমা নেই।
৫ হাজার ভোটের এই গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও উচ্চশিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। ভালো কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র না থাকায় জরুরি প্রয়োজনে জেলা সদরে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। শিক্ষার আলো ও কর্মসংস্থানের অভাবে এই এলাকার অধিকাংশ মানুষ মৎস্যজীবী এবং কৃষক। আধুনিকতা থেকে পিছিয়ে থাকায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও যথাসময়ে পৌঁছাতে পারেন না।
শিবপুরকে আধুনিকতার ছোঁয়ায় আনতে হলে এবং একে একটি বাসযোগ্য গ্রাম হিসেবে গড়ে তুলতে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:
সুতাং নদীর ওপর ব্রিজ: লাখাই গুদারাঘাট এলাকায় সুতাং নদীর ওপর একটি স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণ করা।
রাস্তা নির্মাণ:ক্ষেতের আইল বা কাঁচা রাস্তার পরিবর্তে পাকা সড়ক নির্মাণ করা। এবং পাকা সড়ক কে সংস্কার করা।
কালভার্ট নির্মাণ:হাওরের বিভিন্ন খালে ছোট ছোট কালভার্ট তৈরি করে যোগাযোগের নিরবচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করা।
প্রতিষ্ঠান স্থাপন:মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন।
শিবপুরের মানুষের জন্য এটি কেবল রাস্তা বা ব্রিজের দাবি নয়, এটি তাদের অস্তিত্বের দাবি। এই অবহেলিত জনপদকে অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে। তা না হলে শিবপুর নামের এই ‘দ্বীপ রাজ্য’ চিরকালই সভ্যতার আলো থেকে বঞ্চিত থেকে যাবে।
দ.ক.সিআর.২৬