বাংলাদেশ তথা এশিয়া মহাদেশের প্রকৌশল-শিক্ষা জগতে যে নামটি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চরিত হয় তিনি হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাটের কৃতি সন্তান ও বুয়েটের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য ড. এম এ রশীদ। নিজ কর্মক্ষেত্রের পরিধি ছাড়িয়ে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জগতেও তিনি সমানভাবে অবদান রেখে গেছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে নির্লোভ ও নিঃস্বার্থ এই মহাপুরুষ সারা জীবন উৎসর্গ করেছেন মানুষের জন্য, দেশের জন্য। তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ ও কর্মকাণ্ড আজও আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়।
জন্ম ও বংশপরিচয়
১৯১৯ সালের ১৬ জানুয়ারি, আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি আগে, সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার বগাডুবি (কিরতাই) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ড. এম. এ. রশীদ (পূর্ণনাম: মুহাম্মদ আবদুর রশীদ)। তাঁর পিতা মুহাম্মদ সা’দ ও মাতা কুলসুমা মজুমদার। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। ভাইরা— এম. এ. রহিম, এম. এ. সালেক; বোনরা— ছমিলা খাতুন, হাজেরা খাতুন ও আমিনা খাতুন। বর্তমানে কেবল ছমিলা খাতুন বেঁচে আছেন।
পিতা মুহাম্মদ সা’দ ছিলেন ধার্মিক, সমাজসেবক ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি। তিনি তৎকালীন সিলেট জেলার দায়রা জজের সহযোগী "জুড়ি" হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। মাতা কুলসুমা মজুমদার ছিলেন সিলেটের সর্বশেষ কাননগো মুহাম্মদ বখত মজুমদারের বংশধর এবং একজন গুণবতী, পর্দানশীন নারী। বাবা-মায়ের শিক্ষানুরাগ ও সৎ প্রচেষ্টায়ই ড. রশীদ হয়ে উঠেছিলেন জাতির এক কীর্তিমান সন্তান।
শিক্ষাজীবন
ড. রশীদের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় রাজার বাজার মধ্যবঙ্গ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৩৬ সালে হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর সিলেট এম.সি. কলেজ থেকে ১৯৩৮ সালে আই.এসসি. পাশ করেন প্রথম বিভাগে।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতার শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন পুরাকৌশল বিভাগে। ছাত্রজীবনের তৃতীয় বর্ষেই তাঁর মেধার স্বীকৃতি আসে— পান স্লেটার মেমোরিয়াল গোল্ডমেডেল ও টেট মেমোরিয়াল মেডেল। ১৯৪২ সালে প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে বি.ই. ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ট্রেভর মেমোরিয়াল মেডেল লাভ করেন।
১৯৪৫ সালে ভারত সরকারের "অল ইন্ডিয়া স্টেট স্কলারশিপ" পেয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান। পেনসিলভেনিয়ার কার্নেগি ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি (বর্তমান কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে ১৯৪৭ সালে এম.এস. এবং ১৯৪৮ সালে ডি.এসসি. ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণা প্রবন্ধ ছিল— "Mechanics of Pre-stressed Reinforced Concrete Beams in Bending"— যা সে সময়ে বিশ্বে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
বর্ণাঢ্য কর্মজীবন
ড. রশীদ কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৪২ সালে আসাম সরকারের গণপূর্ত বিভাগে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে। ১৯৪৮ সালে দেশে ফিরে আসেন এবং ঢাকা আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে যোগ দেন সহকারী অধ্যাপক হিসেবে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিভাগের প্রধান, পরে অধ্যাপক এবং ১৯৫৪ সালে কলেজের প্রথম বাঙালি অধ্যক্ষ হন।
তাঁর উদ্যোগেই টেক্সাস এ অ্যান্ড এম কলেজের সঙ্গে শিক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের পাঠ্যক্রম, সেমিস্টার ব্যবস্থা এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
১৯৬১ সালে তিনি কারিগরি শিক্ষা পরিচালক ও পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বর্তমান বুয়েট) প্রথম উপাচার্য নিযুক্ত হন। তাঁর দক্ষ নেতৃত্বে নবগঠিত বিশ্ববিদ্যালয় দ্রুত আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়। তিনি দুই মেয়াদে উপাচার্য ছিলেন।
পরে তিনি পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান, স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা, জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষক ও সংগঠক হিসেবে ভূমিকা
ড. রশীদ ছিলেন সততা, আদর্শ ও কর্মনিষ্ঠার প্রতীক। কঠিন বিষয়কে সহজভাবে উপস্থাপনের অদ্বিতীয় দক্ষতা ছিল তাঁর। ছাত্রদের জন্য তিনি নিজের বাসভবনের কক্ষ পর্যন্ত উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন।
তিনি চেয়েছিলেন প্রতিটি ছাত্র প্রথমে মানুষ হয়ে উঠুক। তাঁর হাতে গড়ে ওঠে বুয়েটের শৃঙ্খলা, গবেষণার মান এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতি। স্থাপত্য অনুষদ প্রতিষ্ঠা, রেন্টাল লাইব্রেরি চালু, বিতর্ক ও প্রকাশনা কার্যক্রম— সবকিছুই ছিল তাঁর দূরদর্শী পদক্ষেপ।
পারিবারিক জীবন
১৯৪১ সালে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তানজুন্নেসা খাতুনের সঙ্গে। তিনি ছিলেন আদর্শ গৃহিণী। ড. রশীদের চার পুত্র ও এক কন্যা— সকলেই উচ্চশিক্ষিত; তিনজন প্রকৌশলী, একজন চিকিৎসক এবং কন্যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত।
সম্মাননা ও স্বীকৃতি
পাকিস্তান সরকার তাঁকে ১৯৬৬ সালে সিতারা-এ-পাকিস্তান খেতাবে ভূষিত করে।
বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৮২ সালে (মরণোত্তর) স্বাধীনতা পদক প্রদান করে।
বুয়েটে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ড. এম. এ. রশীদ ভবন, ড. এম. এ. রশীদ হল এবং বিভিন্ন পুরস্কার ও বৃত্তি।
তাঁর নামে গঠিত হয়েছে ড. রশীদ ফাউন্ডেশন, যার কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ড. রশীদ চেয়ার, স্মরণ বক্তৃতা ও স্বর্ণপদক।
আকস্মিক মৃত্যু
১৯৮১ সালের ৬ নভেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় মাত্র ৬২ বছর বয়সে তিনি পরলোকগমন করেন। পরদিন বুয়েটের মাঠে জানাজা শেষে তাঁর গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জের বগাডুবিতে সমাহিত করা হয় পিতা-মাতার কবরের পাশে।
উপসংহার: ড. এম. এ. রশীদ ছিলেন কেবল একজন প্রকৌশলী বা শিক্ষাবিদ নন— তিনি ছিলেন একজন দিকপাল, জাতির সত্যিকারের আলোকবর্তিকা।
কালের মহাপুরুষ এই ক্ষণজন্মা ড.এম এ রশীদ আজও অগণিত ছাত্র-সহকর্মীর অণুপ্রেরণার সার্বক্ষণিক উৎস। তার ৪৫ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
তথ্যসূত্র: ড. এম এ রশিদ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ: মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান (জলফু) ২০০৩
প্রচ্ছদ : আশীষ আচার্য্য
কালনেত্র