গ্রামাঞ্চলে এক সময় সন্ধ্যার পর বই পড়ার শব্দে পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে উঠত। ছোট-বড়, ছেলে-মেয়ে, যুবক-যুবতী, সবাই নিজেদের পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকত। সন্ধ্যা হলেই একে অপরকে বই পড়ার পরামর্শ দেওয়ার মাঝে শুরু হয়ে যেত পড়ার দৃশ্য। কখনো কখনো একে অপরের পড়া শুনে, কখনো কখনো স্বর ভঙ্গিতে পড়ার আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ত চারপাশে। এতেই ছিল একটি শৈশবের বিশেষত্ব, এক ধরনের প্রতিযোগিতাও যেন ছিল।
পড়াশোনার প্রতি এক ধরনের আগ্রহ ছিল সবার। বিশেষ করে বোর্ড পরীক্ষার আগে, দিন-রাত এক করে পড়ত সবাই। স্কুলের বন্ধুদের মধ্যে গোপনে একে অপরের পড়ার সময় নিরীক্ষণ করা হত। কে কত সময় পড়েছে, কে কি পড়ছে—এগুলো ছিল এক ধরনের প্রতিযোগিতা। সবচেয়ে খারাপ ছাত্রও পড়তে বসতো, যেন যেন সে কিছু কম না পড়ে, এমন যেন কিছু না ঘটে। তার জন্য অ্যালার্ম ঘড়িরও একটা আলাদা কদর ছিল। গভীর রাতের পর, ঘুম থেকে উঠে পড়তে বসা এক ধরনের রুটিন হয়ে গিয়েছিল।
এমনকি যে কোনো পরীক্ষার আগে ‘শিওর সাকসেস’ বা ‘টপ ব্রিলিয়ান্ট সাজেশন’গুলোরও আলাদা কদর ছিল। পরীক্ষার আগের বছর যারা পাস করেছে, তাদের কাছ থেকে সাজেশন নিতে শুরু হতো। ওই সাজেশনগুলি যেন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, পরীক্ষা ভালো দিতে হবে—এমন একটি চেতনা গ্রামে গ্রামে ছিল।
কিন্তু আজ, মাত্র ৫/১০ বছরের ব্যবধানে, সব কিছু পালটে গেছে। আজকাল সন্ধ্যার পর আর বই পড়ার আওয়াজ শোনা যায় না। গ্রামাঞ্চলের ছাত্ররা এখন সবাই মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত। অনলাইন গেমস, গ্রুপ চ্যাটিং, পাবজি, ফ্রী ফায়ার, টিকটক—এসবই তাদের নতুন পছন্দের তালিকা। পড়াশোনা এখন তাদের কাছে বড় নয়, তাদের কাছে বড় হলো এসব গেম আর সামাজিক মাধ্যমের দুনিয়া।
আর এই সব আসক্তির মাঝে তারা হারিয়ে ফেলেছে তাদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ। গ্রাম্য শিক্ষা গুরুদের প্রতি সম্মানও কমেছে। অনেকেই এখন শিক্ষককে মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করে, নিয়ম ভাঙে, বেয়াদবি করে। স্কুলে বা শিক্ষকের কাছে গিয়ে কথা বলা, শিখতে চাওয়া—এই জিনিসগুলোর জন্য এখন আর কারো আগ্রহ নেই।
বছরের পর বছর, দিনে দিনে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার গৌরব হারিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা এখন তাদের কাছে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। এমন একটি সময়ে, যখন মোবাইলের গেম আর সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়ায় তাদের সময় চলে যাচ্ছে, তখন একে অপরকে বই পড়ার পরামর্শ দেওয়ার মতো দিনগুলি যেন হারিয়ে গেছে।
এই পরিবর্তন, এই হারিয়ে যাওয়া সময়, এই সিস্টেমের শিফট—সব কিছুই যেন আমাদের সমাজের এখন নতুন মুখ।
দ.ক.২৬