ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যা ৩০৭। এক দিনের ব্যবধানে আরও চারজনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ২ হাজার ১৬৭ জন। সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, স্বজন হারানোর বেদনা, চিকিৎসার ব্যয়ভার এবং অনিশ্চয়তায় কাটানো অসংখ্য মানুষের জীবন। অথচ ডেঙ্গুর এই বিস্তার দেখে মনে হয়, এ দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে মানুষের মৃত্যুও বুঝি বার্ষিক প্রতিবেদনের কয়েকটি সংখ্যামাত্র!
প্রশ্ন হচ্ছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এত আয়োজন, এত সভা, এত প্রচার, এত আশ্বাসের পরও পরিস্থিতি এমন কেন? প্রতিবছর বর্ষা আসে, এডিস মশার বিস্তার ঘটে, হাসপাতালের শয্যা পূর্ণ হয়, রোগীর স্বজনেরা ছোটাছুটি করেন, আর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় সতর্কবার্তা। তারপর আসে আশ্বাসের পালা। মশা অবশ্য এসব সভা-সেমিনার কিংবা আশ্বাসের ধার ধারে না। তার বংশবিস্তারের জন্য প্রয়োজন সামান্য জমে থাকা পানি, আর আমাদের প্রশাসনিক ব্যর্থতার জন্য প্রয়োজন দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ।
ডেঙ্গু এখন আর বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়। বছরের পর বছর ধরে এই রোগের প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র কোথায় তৈরি হয়, কোন সময়ে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে, কীভাবে মশার বিস্তার রোধ করা যায়, এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অজানা থাকার কথা নয়। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, জানা সমস্যার সমাধান হচ্ছে না কেন? নাকি সমস্যাটি সমাধান করার চেয়ে তা নিয়ে বক্তব্য দেওয়াই বেশি সহজ?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১ হাজার ৪৪২ জন। মারা গেছেন ৩০৭ জন। সেপ্টেম্বর মাসেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন। অক্টোবরের প্রথম ১২ দিনে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ২১ হাজার ৮২২ জন। অর্থাৎ পরিস্থিতি যে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। সাধারণ পরিসংখ্যান পড়তে জানলেই চলে।
কিন্তু আমাদের নগর ব্যবস্থাপনা ও মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের দিকে তাকালে মনে হয়, এই পরিসংখ্যান যেন কোনো অদৃশ্য দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে যাচ্ছে। নালা-নর্দমা, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত জমি, ছাদ, ফুলের টব কিংবা বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। এসব জায়গা নিয়মিত পরিদর্শন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত কাজ হওয়ার কথা। অথচ রোগীর সংখ্যা যখন বাড়তে থাকে, তখনই তৎপরতার দৃশ্যমান প্রদর্শনী শুরু হয়। মশা নিধনের ওষুধ ছিটানো হয়, অভিযান চালানো হয়, ছবি তোলা হয়, সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। তারপর পরিস্থিতি আবার আগের জায়গায় ফিরে যায় কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের নামে শুধু ওষুধ ছিটানোই যথেষ্ট নয়। কোন এলাকায় মশার ঘনত্ব কত, কোথায় প্রজননক্ষেত্র বেশি, কোন এলাকায় সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে, কোন পদক্ষেপে কতটা সুফল পাওয়া যাচ্ছে, এসব তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করতে হয়। প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, কার্যকর লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি। শুধু প্রাপ্তবয়স্ক মশা মারার উদ্যোগ নিয়ে প্রজননক্ষেত্র অক্ষত রেখে দিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মশার জীবনচক্র সম্পর্কে প্রকৃতির কোনো ভুল ধারণা নেই; ভুল ধারণা থাকলে তা আমাদের ব্যবস্থাপনায়।
এখানে নাগরিকদের দায়িত্বের প্রশ্নও আসে। বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করা, ছাদ ও বারান্দা পরিচ্ছন্ন রাখা এবং এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি। কিন্তু নাগরিক দায়িত্বের কথা বলে প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। ব্যক্তিগত সচেতনতা প্রয়োজন, আবার কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনাও অপরিহার্য। একটি শহরের নালা পরিষ্কার রাখা, বর্জ্য অপসারণ করা, নির্মাণস্থল তদারক করা কিংবা নিয়মিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা কোনো একক পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়। এসব দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকেই পালন করতে হবে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে চিকিৎসার ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। হাসপাতালে ভর্তি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের সঞ্চয় দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে এই ব্যয় ধারদেনার কারণ হয়। ফলে ডেঙ্গু কেবল জনস্বাস্থ্যের সংকট নয়, এটি অনেক পরিবারের জন্য আর্থিক সংকটও। রোগীর সংখ্যা বাড়লে হাসপাতালের ওপর চাপ বাড়ে, চিকিৎসাকর্মীদের কাজের চাপ বাড়ে এবং সময়মতো সেবা পাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। প্রতিরোধের ক্ষেত্রে আগাম উদ্যোগ নেওয়ার বদলে রোগী বাড়ার পর হাসপাতালের ওপর চাপ ছেড়ে দেওয়া কোনো দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার পরিচয় হতে পারে না।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। কে কোন কাজ করবে, কোন এলাকায় কত ঘন ঘন অভিযান হবে, কোথায় কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং তার ফলাফল কী, এসব বিষয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার। দায়িত্ব ভাগ করে দিয়ে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখা যাবে না। কোনো এলাকায় বারবার মশার প্রজননক্ষেত্র পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যাখ্যা দিতে হবে। নির্ধারিত কার্যক্রম বাস্তবায়ন না হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি অর্থ ব্যয়ের হিসাবের পাশাপাশি সেই অর্থে কী ফল পাওয়া গেল, তারও মূল্যায়ন জরুরি।
এখন সময় এসেছে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রকাশ্য মূল্যায়নের। কোথায় কত অর্থ ব্যয় হয়েছে, কত এলাকায় প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করা হয়েছে, মশার ঘনত্ব কতটা কমেছে, কোন পদক্ষেপে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং কোথায় ব্যর্থতা রয়েছে, এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। কারণ সরকারি তৎপরতার প্রমাণ শুধু সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে থাকে না; তার প্রমাণ থাকার কথা পরিচ্ছন্ন পরিবেশে, কমে আসা সংক্রমণে এবং মানুষের নিরাপদ জীবনে।
একই সঙ্গে জ্বর হলেই আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ডেঙ্গু সন্দেহ হলে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বিশেষ করে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট কিংবা অস্বাভাবিক তন্দ্রার মতো বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ করা বিপজ্জনক হতে পারে। জনসচেতনতা বাড়াতে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
প্রতিবছর ডেঙ্গুর মৌসুমে মানুষকে সচেতন হতে বলা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কর্তৃপক্ষকে সচেতন করার দায়িত্ব নেবে কে? নাগরিকেরা নিজেদের বাড়ির পানি পরিষ্কার করবেন, অথচ সরকারি নালা-নর্দমা অবহেলায় পড়ে থাকবে, তা হতে পারে না। মানুষ মশারি ব্যবহার করবে, কিন্তু নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবে না, এমন দ্বিমুখী নীতি গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যক্তিগত সতর্কতা রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে, কিন্তু প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার বিকল্প হতে পারে না।
এক লাখের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও যদি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের কার্যকর, সমন্বিত ও পরিমাপযোগ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: এত দিন ধরে প্রস্তুতির নামে কী করা হয়েছে? আর কত মানুষ আক্রান্ত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বুঝবে যে সমস্যাটি মৌসুমি নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ?
ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাফল্য নির্ধারিত হবে না কতবার অভিযান চালানো হলো, কতটি সভা অনুষ্ঠিত হলো কিংবা কতটি আশ্বাস দেওয়া হলো, তা দিয়ে। সাফল্য নির্ধারিত হবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমল কি না, মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হলো কি না এবং মানুষ সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেল কি না, তার ভিত্তিতে।
মশা ছোট, কিন্তু তার বিস্তার ঠেকাতে ব্যর্থতার মূল্য বড়। সেই মূল্য মানুষ দিচ্ছে জীবন দিয়ে, পরিবার দিচ্ছে সঞ্চয় হারিয়ে, আর হাসপাতাল দিচ্ছে অতিরিক্ত চাপ সামলে। এখন প্রয়োজন দায়সারা তৎপরতা নয়, দৃশ্যমান ফলাফল। কারণ ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়াইয়ে মানুষের জীবনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মশা নিধনের ব্যর্থতা ঢাকতে আশ্বাসের ধোঁয়া ছড়ালে লাভ হবে না। মশা মরছে কি না, মানুষ বাঁচছে কি না, শেষ পর্যন্ত হিসাব হবে সেখানেই।
দ.ক.সিআর৷