আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পদায়ন ও বদলিতে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিনের। কোন থানায় কাকে ওসি হিসেবে পদায়ন করা হবে, তা নির্ধারণেও প্রভাবশালী সংসদ সদস্যদের ভূমিকা থাকার অভিযোগ ওঠে। রাজনৈতিক স্বার্থে পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহারের পাশাপাশি বিরোধী মতের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতে গায়েবি মামলা দেওয়ার অভিযোগও ছিল ব্যাপক।
সরকার পরিবর্তনের পর পুলিশ প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার প্রত্যাশা তৈরি হলেও আবারও একই ধরনের তৎপরতার অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ বিভাগের কয়েকটি থানার ওসি পদায়ন, বদলি ও দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, কয়েকজন সংসদ সদস্য নিজেদের পছন্দের পুলিশ পরিদর্শককে গুরুত্বপূর্ণ থানায় ওসি হিসেবে পদায়নের জন্য পুলিশ সুপার (এসপি) ও উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পর্যায়ে তদবির করছেন। এমনকি প্রশাসনিকভাবে পদায়নের আদেশ পাওয়ার পরও কোনো কোনো পুলিশ পরিদর্শক স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করে সংশ্লিষ্ট থানায় দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রগুলোর ভাষ্য, কোনো কোনো এলাকায় ওসি হিসেবে যোগদানের আগে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা অলিখিত শর্তে পরিণত হয়েছে। এতে পুলিশের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ও পেশাগত নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পুলিশের প্রচলিত প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী জেলা পর্যায়ে থানার ওসি পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে পুলিশ সুপারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন কয়েকজন সংসদ সদস্য।
সূত্রের দাবি, নিজেদের অনুগত পুলিশ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ থানায় পদায়নের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পছন্দের কর্মকর্তাকে পদায়ন করতে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অতীতের মতো আবারও পুলিশকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ময়মনসিংহ বিভাগে প্রভাব বিস্তার ও চাঁদাবাজির অভিযোগ:
ময়মনসিংহ বিভাগের কয়েকটি এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, কয়েকজন সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিরা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও তাঁদের পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করছেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভয়ভীতি প্রদর্শন, বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে একটি প্রভাবশালী মহল এলাকায় নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ময়মনসিংহ বিভাগের কয়েকটি থানায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের পক্ষ থেকে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সূত্রের দাবি, কয়েকজন সংসদ সদস্য নিজেদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থে পুলিশের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিষয়ে আইনগত সিদ্ধান্ত গ্রহণেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ময়মনসিংহের দুটি থানা এলাকায় বিএনপির স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। সূত্রের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী সংসদ সদস্যদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তিগত সহকারী, ব্যবস্থাপক ও গাড়িচালক বর্তমানে নতুন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন ধরনের তদবির ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের তৎপরতায় জড়িয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে সুবিধা নেওয়া একটি চক্র এখন নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে একই ধরনের কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছে।
পুলিশকে আবারও রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানোর শঙ্কা:
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে পুলিশের একটি অংশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা, গ্রেপ্তার, হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ছিল। সরকার পরিবর্তনের পর পুলিশের পেশাগত স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হয়।
কিন্তু ওসি পদায়নে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে থানায় দায়িত্ব গ্রহণের আগে রাজনৈতিক ব্যক্তির অনুমোদন বা সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে তা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।প্রশ্ন উঠেছে, থানার ওসি পদায়নের সিদ্ধান্ত কি পুলিশ প্রশাসনের নিজস্ব বিবেচনায় হবে, নাকি রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভর করবে?
ওসি পদায়নে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ছাড়িয়ে নেওয়ার তদবির, চাঁদাবাজি এবং বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।একই সঙ্গে থানার ওসি পদায়ন ও বদলিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর অবৈধ চাপ প্রয়োগ বন্ধ করা এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু পুলিশ প্রশাসনের নিরপেক্ষতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে না, বরং অতীতের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাও বাড়াবে। এখন বড় প্রশ্ন—পুলিশ কি জনগণের সেবক হিসেবে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করবে, নাকি আবারও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের স্বার্থরক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হবে? তবে এবিষয়ে জানতে ময়মনসিংহের ডিআইজি জাহিদুল ইসলামের বক্তব্য জানতে চাইলে ফোনে পাওয়া যায়নি।
দ.ক.২৬