ধর্মীয় অবমাননা, দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও প্রশাসনিক অসদাচরণের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হবিগঞ্জের জেলা কালচারাল অফিসার অসিত বরণ দাশ গুপ্তকে বদলি করা হয়েছে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর ‘হবিগঞ্জের সচেতন নাগরিক ও সংস্কৃতিকর্মী সমাজ’-এর প্রায় দেড় শতাধিক কর্মীর স্বাক্ষরিত একটি আবেদন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক বরাবর জমা দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে অসিত বরণ দাশ গুপ্তের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই শেষে গত ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহা. হারুন-অর-রশীদ স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাঁকে মৌলভীবাজারে বদলি করা হয়।
কিছুদিন আগে হামদ-নাত প্রতিযোগিতায় তিনজন হিন্দু বিচারককে দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ বিষয়টিও খতিয়ে দেখে অসিত বরণ দাশ গুপ্ত ও তার একান্ত সহকারী বিকাশ পালের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ইসলামী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, সিলেটে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ, প্রশিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, শিল্পী সম্মানী নিয়ে অনিয়ম, নারী হয়রানি ও শ্লীলতাহানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে শিল্পকলা একাডেমির হল ব্যবহারে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের প্রতিবাদে সেখানে প্রশিক্ষকদের কর্মবিরতি, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের ঘটনাও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে বরিশালে বদলি করা হলে সেখানেও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টিসহ একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে বলে জানা যায়।
অভিযোগ রয়েছে, হবিগঞ্জ থেকে একাধিকবার বদলি করা হলেও বিভিন্ন কৌশলে তিনি নিজ জন্মস্থান হবিগঞ্জে ফিরে আসেন। হবিগঞ্জ জেলার বাসিন্দা হওয়ায় তিনি নিজের আত্মীয়স্বজন, পছন্দের ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে সরকারি অনুদান ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রকৃত সংস্কৃতিকর্মী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো অনুদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে হবিগঞ্জে তৃতীয়বারের মতো দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে সরকারি সাংস্কৃতিক অনুদান বণ্টনে পক্ষপাত ও অনিয়ম, নির্দিষ্ট সংগঠনকে অনুদান পাইয়ে দেওয়া, শিল্পকলা একাডেমির প্রাঙ্গণে দোকান বসিয়ে ভাড়া আদায় এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ‘নজরুল বর্ষ’ আয়োজনের ব্যয় ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ছাড়া শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, জেলা শিল্পকলা একাডেমির হলরুমে লাইট, সাউন্ডসহ বেশ কিছু সরঞ্জাম নিখোঁজ রয়েছে। ফলে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে বাইরে থেকে লাইট ও সাউন্ডের সরঞ্জাম ভাড়া করে এনে অনুষ্ঠান আয়োজন করতে হচ্ছে।
জেলা শিল্পকলা একাডেমির সম্মাননা প্রদান নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের অভিযোগ, প্রকৃত ও প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সম্মাননা না দিয়ে একাডেমিতে কর্মরত দুই উদীয়মান প্রশিক্ষকের নাম সম্মাননার জন্য প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি গবেষণার সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই—এমন ব্যক্তিকেও সম্মাননা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত পাঁচ বছরে দেওয়া ২৫টি সম্মাননার মধ্যে আবৃত্তি ও লোকসংস্কৃতিতে কোনো সম্মাননা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা।
এসব বিষয়ে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এ নিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, এসব বিতর্ক আড়াল করতে তিনি বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। বিগত সরকারের সময়ে মুজিববর্ষ উপলক্ষে ‘সাংস্কৃতিক জোট’-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ভাউচার বাণিজ্য করে অর্থ আত্মসাৎ এবং প্রকৃত সংস্কৃতিকর্মীদের অবমূল্যায়নের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বর্তমানেও একই ধরনের বিতর্কে জড়িয়েছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন।
একই কর্মকর্তাকে ঘিরে পূর্ববর্তী ও বর্তমান কর্মস্থলে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের আশঙ্কা, এসব অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তি না হলে সচেতন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে পারে।
এমতাবস্থায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ভাবমূর্তি, সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের স্বার্থ রক্ষায় অসিত বরণ দাশ গুপ্তকে হবিগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমির দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে অন্যত্র পদায়ন এবং তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে তাঁর দায়িত্বকালীন সরকারি অনুদান, হল বরাদ্দ, অনুষ্ঠান আয়োজন, শিল্পী সম্মানী, ক্রয়সংক্রান্ত বিল, ভাউচার এবং একাডেমির প্রাঙ্গণ ব্যবহারের যাবতীয় নথিপত্র ও আর্থিক হিসাব যাচাই-বাছাই এবং নিরীক্ষার দাবি জানানো হয়েছে।
দ.ক.২৬