চিকিৎসার প্রয়োজনে আর ঢাকা কিংবা বরিশাল যেতে হবে না! পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিদিন নানা রং বে-রংয়ের নজরকাড়া ব্যানার প্রদর্শন ও সুরেলা, মনকাড়া নারী কণ্ঠে মাইকিং করে প্রচার করা হচ্ছে—সব ধরনের কঠিন ও জটিল পুরাতন রোগের চিকিৎসা এখন মঠবাড়িয়াতেই সম্ভব। এমন আকর্ষণীয় প্রচারণা সাধারণ মানুষের মনে আশার আলো জাগালেও এর বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি।
যেসব প্রতিষ্ঠানে এমন প্রচারণা চালানো হচ্ছে, সেখানে কি সত্যিই সব ধরনের জটিল রোগের চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে? প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স, দক্ষ টেকনোলজিস্ট, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও জরুরি চিকিৎসাসেবা কি নিশ্চিত করা হয়েছে? প্রচারকারীরা কি নিজেরা এসব প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসাসেবার মান যাচাই করেছেন?
স্থানীয়ভাবে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা গড়ে ওঠা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সামর্থ্যের বাইরে প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করা হলে তা জনস্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে।
সম্প্রতি মিরুখালী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অফিস সহায়ক শাহিন জানিয়েছেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহে মঠবাড়িয়ায় একদিনে ১৬ হাজার টাকা ব্যয় শেষে বরিশালে গিয়ে তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা স্থানীয় চিকিৎসাসেবার সুযোগ, ব্যয় ও সক্ষমতা নিয়ে ভাবনার অবকাশ তৈরি করে। অন্যদিকে, কোথাও কোথাও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাগত কারণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করেই রোগীদের সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারে উৎসাহিত করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও রয়েছে। প্রয়োজনীয় সিজারিয়ান জীবন রক্ষা করে; কিন্তু অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার এড়াতে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ও রোগীর অবহিত সম্মতি নিশ্চিত করা জরুরি।
অভিযান হয়, আবার থেমে যায়—স্থায়ী সমাধান কোথায়?
দেশে বিগত দিনে ভুয়া চিকিৎসক গ্রেপ্তার, কথিত ভুয়া ক্লিনিকের বিরুদ্ধে অভিযান, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, জরিমানা, ক্লিনিক সিলগালা, রোগীর মৃত্যু ঘিরে মামলা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠিপত্র আদান-প্রদানের মতো ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, কদাচিৎ দু-চারটি অভিযান পরিচালিত হওয়ার পর কার্যক্রম আবার থেমে যায়। নিয়মিত নজরদারি ও ধারাবাহিক তদারকির অভাবে সমস্যাগুলো স্থায়ীভাবে সমাধান হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এত পদক্ষেপের পরও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমেছে কতটুকু? অভিযান পরিচালনা কিংবা জরিমানা করাই চূড়ান্ত সাফল্য নয়; অনিয়ম বন্ধ হওয়া এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়াই মূল লক্ষ্য।
কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার পর তার কার্যক্রম পুনরায় চালু হলে বৈধতা ও সক্ষমতা যাচাই করা হচ্ছে কি? অভিযোগের তদন্ত ও নিষ্পত্তি কতটা কার্যকর হচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, চিকিৎসকদের যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় জনবল ও সেবার মান নিয়মিত যাচাই করা। অভিযোগের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। এককালীন অভিযান নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিক নজরদারি, কার্যকর জবাবদিহি ও স্থায়ী সমাধান।
আমরা চাই না, মঠবাড়িয়ার মানুষ চিকিৎসার জন্য অকারণে ঢাকা কিংবা বরিশালে ছুটে যাক। আবার স্থানীয় চিকিৎসার আশ্বাসে প্রতারিত হয়ে কেউ অর্থ, সময় কিংবা মূল্যবান জীবন ঝুঁকিতে ফেলুক—সেটিও কাম্য নয়।
মাইকিংয়ের সুর যতই মধুর হোক, চিকিৎসার নিশ্চয়তা আসতে হবে যোগ্যতা, দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থেকে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জনস্বার্থে প্রশ্ন—অতীতের অভিযান ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের কার্যকারিতা পর্যালোচনা করে মঠবাড়িয়ায় নিরাপদ, সুলভ ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হবে কবে? কারণ, সাফল্যের মাপকাঠি কতটি অভিযান হয়েছে, তা নয়; বরং অভিযান শেষে অনিয়ম কতটা বন্ধ হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসাজনিত দুর্ভোগ কতটা কমেছে, সেটিই।
দ.ক.২৬