অক্টোবর মাসের ৫ তারিখ এলেই শিক্ষকদের নিয়ে আমাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। কোথাও ফুল, কোথাও ক্রেস্ট, কোথাও আলোচনা সভা, কোথাও আবার শিক্ষকের হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে ওঠে শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অসংখ্য বার্তা। বক্তৃতার মঞ্চে শিক্ষক হয়ে ওঠেন জাতির কারিগর, আলোকবর্তিকা, ভবিষ্যৎ নির্মাতা। কথাগুলো নিঃসন্দেহে সত্য; কিন্তু অনুষ্ঠান শেষ হলে, ব্যানার নামিয়ে ফেললে, ফুল শুকিয়ে গেলে, করতালি থেমে গেলে শিক্ষক ফিরে যান তার চেনা বাস্তবতায়।
তখন প্রশ্নটি করতেই হয়, শিক্ষককে আমরা সত্যিই সম্মান করি, নাকি বছরে এক দিন সম্মান করার আনুষ্ঠানিকতা পালন করি? শিক্ষকের হাতে ফুল তুলে দেওয়া সহজ; কিন্তু তার হাতে প্রয়োজনীয় সময় তুলে দেওয়া কঠিন। ক্রেস্ট দেওয়া সহজ; কিন্তু শ্রেণিকক্ষের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ নিশ্চিত করা কঠিন। বক্তৃতায় শিক্ষকের মর্যাদা ঘোষণা করা সহজ; কিন্তু নীতিনির্ধারণের টেবিলে তার মতামতের জায়গা তৈরি করা কঠিন। অথচ শিক্ষক দিবসের প্রকৃত দাবি এখানেই। ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য, “স্ট্যান্ডিং উইথ টিচার্স: সিক্সটি ইয়ার্স অব প্রোটেক্টিং দ্য প্রফেশন, অ্যাডভান্সিং ইটস স্ট্যাটাস অ্যান্ড শেপিং আওয়ার ফিউচার্স”। অর্থাৎ শিক্ষকতার পেশার সুরক্ষা, মর্যাদার উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান। এ বছর ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের আইএলও ও ইউনেস্কোর শিক্ষকের মর্যাদা সম্পর্কিত সুপারিশের ৬০ বছর পূর্তি। ছয় দশক পর এই বার্তা আমাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন সামনে আনে। শিক্ষকতার পেশাকে আমরা কতটা মর্যাদাপূর্ণ করেছি? শিক্ষককে কতটা পেশাজীবী হিসেবে বিবেচনা করি? শিক্ষা সংস্কারের কথা বলার সময় শিক্ষক নিজেই কতটা কথা বলার সুযোগ পান? বাংলাদেশে শিক্ষককে নিয়ে আমাদের কথার সঙ্গে কাজের একটি বড় ফারাক আছে।
আমরা বলি শিক্ষক জাতি গড়েন; কিন্তু যে শিক্ষক জাতি গড়বেন, তার নিজের পেশাগত পরিসর কতটা গোছানো? আমরা বলি শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। কিন্তু শিক্ষকের সময়ের কতটা আমরা শিক্ষাদানের জন্য রেখে দিই? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে বই পড়ান না। তাকে পাঠ পরিকল্পনা করতে হয়, শিক্ষার্থীর শিখন অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে হয়, খাতা দেখতে হয়, অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়, দুর্বল শিক্ষার্থীকে আলাদা সহায়তা দিতে হয়।
এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজ, বিভিন্ন সভা, কাগজপত্র ও অশিক্ষণীয় নানা দায়িত্ব, তাহলে শিক্ষকতার মূল কাজটি কোথায় দাঁড়ায়? শিক্ষকের সময় যদি শিক্ষাদানের জন্য না থাকে, তাহলে শিক্ষার মান বাড়ানোর দাবি কি নিছক প্রশাসনিক স্লোগান হয়ে যায় না? আমরা শিক্ষকের কাছে সৃজনশীলতা চাই, প্রযুক্তির ব্যবহার চাই, নতুন শিক্ষণপদ্ধতি চাই, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষা চাই। কিন্তু শিক্ষককে সেই পরিবর্তনের জন্য কতটা সময়, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিচ্ছি? শুধু নির্দেশ দিয়ে শিক্ষার পরিবর্তন হয় না। নির্দেশের সঙ্গে প্রয়োজন সক্ষমতা। শিক্ষক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। প্রশিক্ষণ হয়েছে, এটি একটি তথ্য। কিন্তু প্রশিক্ষণ শ্রেণিকক্ষে কাজে লাগছে কি না, সেটিই আসল প্রশ্ন।
প্রশিক্ষণ যদি উপস্থিতি, বক্তৃতা, কিছু উপস্থাপনা এবং সনদ বিতরণের আনুষ্ঠানিকতায় আটকে থাকে, তবে তা শিক্ষকতার পেশাগত উন্নয়নের স্থায়ী হাতিয়ার হতে পারে না। প্রশিক্ষণ হতে হবে প্রয়োজনভিত্তিক, শ্রেণিকক্ষ কেন্দ্রিক, অনুশীলননির্ভর এবং ধারাবাহিক। শিক্ষককে শুধু নতুন পদ্ধতি শেখালে হবে না, সেই পদ্ধতি প্রয়োগের পরিবেশও দিতে হবে। আর এখানেই আসে শিক্ষকতার পেশাগত স্বাধীনতার প্রশ্ন। শিক্ষককে যদি প্রতিটি বিষয়ে শুধু নির্দেশের অপেক্ষায় থাকতে হয়, তবে তার পেশাগত বিচারবোধের বিকাশ কীভাবে হবে? শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা এক রকম নয়। তাদের শেখার গতি এক নয়, পারিবারিক পরিবেশ এক নয়, আগ্রহ এক নয়, সক্ষমতাও এক নয়।
একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক এসব পার্থক্য সবচেয়ে ভালো বোঝেন। তাই শিক্ষকের পেশাগত বিবেচনার জায়গা না রেখে শুধু একমুখী নির্দেশ দিয়ে শিক্ষা পরিচালনা করা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। তবে স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও থাকতে হবে। শিক্ষক মর্যাদা মানে শিক্ষক জবাবদিহির বাইরে থাকবেন, এমন ধারণা যেমন ভুল, তেমনি শিক্ষককে সব সমস্যার জন্য দায়ী করাও অন্যায্য। ভালো শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক পাবেন মর্যাদা ও স্বাধীনতা, বিনিময়ে থাকবে পেশাগত নৈতিকতা, দক্ষতা, উপস্থিতি ও জবাবদিহি। মর্যাদা ও জবাবদিহি পরস্পরের শত্রু নয়, বরং প্রকৃত পেশাদারিত্বের দুই স্তম্ভ। বাংলাদেশে শিক্ষককে নিয়ে আরেকটি অস্বস্তিকর বৈপরীত্য আছে। শিক্ষা সংস্কারের প্রায় প্রতিটি আলোচনায় শিক্ষকের ওপর নতুন দায়িত্বের কথা বলা হয়। নতুন পাঠ্যক্রম, নতুন মূল্যায়ন, নতুন প্রযুক্তি, নতুন পদ্ধতি, সবকিছুর বাস্তবায়নের ভার শেষ পর্যন্ত শ্রেণিকক্ষের শিক্ষকের ওপর পড়ে। কিন্তু পরিকল্পনা তৈরির সময় সেই শিক্ষক কতটা অংশীদার? যিনি নীতির শেষ বাস্তবায়নকারী, তাকে নীতি তৈরির প্রথম আলোচনায় রাখা হবে না কেন? শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা সম্পর্কে শিক্ষক যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তা কোনো ফাইলের নোটে পুরোপুরি ধরা পড়ে না। কোন নির্দেশ বাস্তবসম্মত, কোন প্রশিক্ষণ কার্যকর, কোন মূল্যায়ন পদ্ধতি শিক্ষার্থীর শেখাকে সহায়তা করছে এবং কোনটি বাড়তি চাপ তৈরি করছে, এসব প্রশ্নের উত্তর শিক্ষকের কাছে আছে। তাই শিক্ষককে কেবল নির্দেশ বাস্তবায়নকারী হিসেবে দেখার সংস্কৃতি বদলাতে হবে। শিক্ষকের পেশাগত অগ্রগতির প্রশ্নও সামনে আনতে হবে।
একজন শিক্ষক ভালো কাজ করবেন, অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন, নতুন দক্ষতা শিখবেন, তারপর কী? পেশাগত উন্নতির পথ কোথায়? শিক্ষকতা কি এমন একটি পেশা, যেখানে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব ও নেতৃত্বের নতুন দরজা খুলবে? নাকি বছরের পর বছর একই কাঠামোর মধ্যে কাজ করাই নিয়তি? যোগ্য শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষেই নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষক, মেন্টর, গবেষক, একাডেমিক নেতা, বিভিন্ন পেশাগত ভূমিকার পথ তৈরি করতে হবে। এতে শিক্ষকতা শুধু একটি চাকরি থাকবে না, এটি হয়ে উঠবে একটি বিকাশমান পেশা। কারণ মেধাবী তরুণদের শিক্ষকতায় আনতে শুধু দেশ গড়ার আহ্বান যথেষ্ট নয়। একটি পেশাকে আকর্ষণীয় করতে হলে তার মর্যাদা, ক্যারিয়ার সম্ভাবনা, কর্মপরিবেশ ও সামাজিক স্বীকৃতিকে বাস্তব করে তুলতে হয়। আজকের শিক্ষক আরও একটি কঠিন পরিবর্তনের মুখোমুখি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তি শিক্ষার প্রচলিত কাঠামো বদলে দিচ্ছে। শিক্ষার্থী এখন মুহূর্তে তথ্য পেতে পারে। ফলে শিক্ষক আর শুধু তথ্যের উৎস নন। তার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ, তথ্যের সত্যতা যাচাই, বিশ্লেষণী চিন্তা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা এবং মানবিক বোধ গড়ে তোলা; কিন্তু শিক্ষককে যদি এই নতুন দায়িত্ব নিতে হয়, তাকে নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগও দিতে হবে। প্রযুক্তির যুগে শিক্ষকের কাছ থেকে নতুন দক্ষতা চাইব, অথচ সেই দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেব না, এটি নীতি নয়, বৈপরীত্য। আরেকটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশের সব শিক্ষক একই বাস্তবতায় কাজ করেন না। শহর ও গ্রামের প্রতিষ্ঠান, সুযোগ সুবিধাসম্পন্ন ও সীমিত সম্পদের প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি সমৃদ্ধ ও প্রযুক্তিবঞ্চিত শ্রেণিকক্ষ, সব জায়গার বাস্তবতা এক নয়। ফলে একই নির্দেশ, একই প্রত্যাশা এবং একই মূল্যায়ন কাঠামো প্রয়োগের আগে বাস্তব বৈষম্যগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। শিক্ষকের মর্যাদা তাই শুধু বেতন বা পদোন্নতির প্রশ্ন নয়। এটি একটি সামগ্রিক পেশাগত প্রশ্ন। শিক্ষক কী পরিবেশে কাজ করছেন, কতটা সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন, তার দক্ষতা কীভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে, প্রশিক্ষণ কতটা কার্যকর, পেশাগত উন্নতির পথ কতটা উন্মুক্ত এবং তার কাজের সামাজিক মূল্য কতটা বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে, সবকিছু মিলিয়েই মর্যাদা। এখন প্রয়োজন কথার পরিবর্তে কাঠামোগত পরিবর্তন। শিক্ষককে অশিক্ষণীয় দায়িত্ব থেকে যতটা সম্ভব মুক্ত করতে হবে। প্রশিক্ষণকে করতে হবে প্রয়োগমুখী। পদোন্নতি ও পেশাগত অগ্রগতিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষ শিক্ষককে নেতৃত্বের সুযোগ দিতে হবে। শিক্ষা নীতি ও সংস্কারের আলোচনায় শিক্ষককে অংশীদার করতে হবে। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শেখাতে হবে। একই সঙ্গে পেশাগত নৈতিকতা ও জবাবদিহির মানও শক্তিশালী করতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। শিক্ষককে আর শুধু জাতি গড়ার কারিগর বলে প্রশংসা করলেই হবে না, তাকে সেই কারিগরের মতো কাজ করার উপযুক্ত কর্মশালা দিতে হবে। শিক্ষক দিবসে ফুল থাকুক। ফুল ভালোবাসার প্রতীক, সম্মানেরও প্রতীক। কিন্তু ফুল যেন বাস্তব দায়িত্বের বিকল্প না হয়। ক্রেস্ট যেন ন্যায্য কর্মপরিবেশের বিকল্প না হয়। বক্তৃতা যেন পেশাগত মর্যাদার বিকল্প না হয়। কারণ একজন শিক্ষককে একদিন সম্মানিত করে পরের ৩৬৪ দিন অবহেলা করলে সেই সম্মান আসলে কতটা অর্থবহ? ৫ অক্টোবর তাই শুধু শিক্ষককে ধন্যবাদ জানানোর দিন নয়, নিজেদের শিক্ষা দর্শনকে প্রশ্ন করার দিন। আমরা কি সত্যিই শিক্ষককে বিশ্বাস করি?
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ময়মনসিংহ।