আজ শিক্ষক দিবস। ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে ইউনেসকো ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার উদ্যোগে শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার, দায়িত্ব, পেশাগত প্রস্তুতি, নিয়োগ, বেতন ও কর্মপরিবেশ নিয়ে ঐতিহাসিক সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছিল। সেই ঘটনার ছয় দশক পূর্ণ হচ্ছে এ বছর। ১৯৯৪ সাল থেকে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে। এবারের প্রতিপাদ্য—‘শিক্ষকদের পাশে: পেশা সুরক্ষা, মর্যাদা উন্নয়ন এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ার ৬০ বছর’। প্রতিপাদ্যের মধ্যেই যেন একটি মৌলিক সত্য উচ্চারিত হয়েছে—শিক্ষকের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যায় না।
ছয় দশকে পৃথিবী অনেক বদলেছে। প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ, জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক বৈষম্য, অভিবাসন ও দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মবাজার শিক্ষার সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সেই সঙ্গে বদলে গেছে শিক্ষকের ভূমিকাও। শিক্ষক এখন আর শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণকারী নন; তিনি শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির অন্যতম নির্মাতা। ফলে পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষকের দক্ষতা, পেশাগত স্বাধীনতা ও প্রস্তুতিও বদলাতে হবে।
বাংলাদেশে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। ২০২২ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের উদ্যোগে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালনের সূচনা হয়। পরের বছর ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে সরকারি বার্ষিক ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষক সম্মাননার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ বছর দেশের বিভিন্ন স্তরের ১০০ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়ার কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে। একজন শিক্ষকের কাজের স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এতে শিক্ষক যেমন অনুপ্রাণিত হন, তেমনি সমাজেও পেশাটির মর্যাদা বাড়ে।
তবে শিক্ষক দিবসের আনুষ্ঠানিকতা যতই বাড়ুক, শিক্ষকের প্রকৃত মর্যাদা নিশ্চিত হয় তাঁর প্রতিদিনের কর্মপরিবেশে। একটি নির্দিষ্ট দিনে সম্মাননা দেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি সারা বছর শিক্ষককে সম্মানজনক বেতন, চাকরির নিরাপত্তা, পেশাগত স্বাধীনতা, প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতির নিশ্চয়তাও দিতে হবে। শিক্ষককে সম্মান জানানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় আসলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তিনি দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছন্দ, নিরাপদ ও মর্যাদাবোধ করেন।
শিক্ষার মান নিয়ে আমরা প্রায়ই আলোচনা করি। কিন্তু শিক্ষার মান যে শিক্ষকের মানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত, সে বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন ভবন নির্মাণ, প্রযুক্তি সরঞ্জাম সরবরাহ কিংবা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে শিক্ষক তৈরিতে। একজন দক্ষ শিক্ষক একটি শ্রেণিকক্ষ বদলে দিতে পারেন; আর একটি প্রজন্মের দক্ষ শিক্ষক একটি জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারেন।
বাংলাদেশে এ জায়গাতেই বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। প্রাথমিক শিক্ষা শিশুর জীবনের ভিত্তি তৈরি করে। এই স্তরে শিক্ষককে শুধু পাঠ্যসূচি শেষ করার দায়িত্ব দিলে চলবে না। শিশুমনস্তত্ত্ব, ভাষা ও গণিত শেখানোর আধুনিক পদ্ধতি, প্রযুক্তি ব্যবহার, সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা—সব ক্ষেত্রেই তাঁদের দক্ষ হতে হবে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শিক্ষক নিজেই যদি নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত না হন, তাহলে শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
মাধ্যমিক শিক্ষার বড় অংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এ স্তরের শিক্ষকদের নিয়োগ, বেতন, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি ও চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। শুধু এমপিওভুক্ত করে বেতন দেওয়াই যথেষ্ট নয়। শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ থাকতে হবে। স্থানীয় প্রভাব কিংবা অস্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা যেন একজন শিক্ষকের পেশাগত স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
উচ্চশিক্ষায়ও একই প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে মেধা, গবেষণা ও একাডেমিক যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ যদি কোনো ধরনের পক্ষপাত বা অস্বচ্ছতার দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু একজন শিক্ষকের ক্যারিয়ারে পড়ে না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো শিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে তাই শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের দায়িত্বে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। তাঁকে গবেষণা, জ্ঞান সৃষ্টি ও নীতিনির্ধারণী আলোচনার সক্রিয় অংশীদার করতে হবে।
একই সঙ্গে শিক্ষকের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকতার মর্যাদা যেমন রাষ্ট্র ও সমাজকে রক্ষা করতে হবে, তেমনি শিক্ষকদেরও পেশাগত নৈতিকতা, দায়িত্বশীলতা ও আদর্শ বজায় রাখতে হবে। একজন শিক্ষকের আচরণ শুধু তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় বহন করে না; অনেক সময় তা শিক্ষার্থীর মূল্যবোধ গঠনে প্রভাব ফেলে। তাই শিক্ষক উন্নয়ন ও শিক্ষক জবাবদিহিকে একই কাঠামোর মধ্যে দেখতে হবে।
শিক্ষকের আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেধাবী তরুণদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে হলে এ পেশাকে আর্থিক ও সামাজিকভাবে সম্মানজনক করে তুলতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষকতার পেশাকে আকর্ষণীয় করে তুলতে বেতন, গবেষণার সুযোগ, প্রশিক্ষণ ও কর্মজীবনের নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও শিক্ষকতার পেশাকে মেধাবীদের প্রথম সারির পছন্দে পরিণত করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিও ইতিবাচক পদক্ষেপ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এটি বৃদ্ধি হলেও আন্তর্জাতিকভাবে শিক্ষা খাতে যে মাত্রার বিনিয়োগের কথা বলা হয়, তার তুলনায় এখনও তা কম। আরও বড় কথা, বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা, প্রযুক্তি, শিক্ষার মান যাচাই ও শিক্ষার্থীর শেখার ফল উন্নয়নে বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট ফল দেখতে হবে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস তাই কেবল শিক্ষককে শুভেচ্ছা জানানোর দিন নয়; এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার দিন। আমরা কি এমন শিক্ষক তৈরি করছি, যাঁরা আগামী দিনের শিক্ষার্থীকে আগামী দিনের পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করতে পারবেন? আমরা কি তাঁদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিচ্ছি? তাঁদের পেশাগত স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি? মেধাবীদের এই পেশায় আকৃষ্ট করার মতো পরিবেশ তৈরি করতে পারছি? এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের শিক্ষার ভবিষ্যৎ।
শিক্ষা কোনো ব্যয় নয়, এটি ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। আর সেই বিনিয়োগের কেন্দ্রবিন্দুতে শিক্ষক। একটি বিদ্যালয়ের ভবন উন্নত হতে পারে, প্রযুক্তির সরঞ্জাম বাড়তে পারে, পাঠ্যবই পরিবর্তিত হতে পারে; কিন্তু যোগ্য শিক্ষক ছাড়া এসবের কোনোটিই শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত ফল নিশ্চিত করতে পারে না।
ষাট বছর আগে বিশ্ব যে অঙ্গীকার করেছিল, আজ তার মূল কথাটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক—শিক্ষককে শক্তিশালী করলেই শিক্ষা শক্তিশালী হবে। আর শিক্ষা শক্তিশালী হলেই শক্তিশালী হবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ।
তাই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হোক, শুধু একজন শিক্ষককে ফুল দিয়ে সম্মান জানানো নয়; শিক্ষকতার পুরো পেশাটিকে মর্যাদা, দক্ষতা, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো। কারণ শিক্ষকের মানোন্নয়নেই শিক্ষার ভবিষ্যৎ, আর শিক্ষার ভবিষ্যতের মধ্যেই নিহিত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
দ.ক.২৬