পুরোনো স্থাপত্যের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে হবিগঞ্জের সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সুলতানি, মোগল ও ব্রিটিশ আমলের নানা গল্প। জেলার প্রাচীন মসজিদ, রাজকীয় জমিদার বাড়ি এবং ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপনাগুলো আজও অতীতের রাজসাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
হবিগঞ্জের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে এমন কিছু উল্লেখযোগ্য প্রাচীন স্থাপত্য নিচে তুলে ধরা হলো:
শঙ্করপাশা শাহী জামে মসজিদ (উচাইলের গায়েবি মসজিদ)
ইতিহাস ও স্থাপত্য: এটি হবিগঞ্জের অন্যতম প্রাচীন এবং দৃষ্টিনন্দন সুলতানি আমলের স্থাপত্য। আনুমানিক ১৪৯৩ সালে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে তাঁর প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহ মজলিশ আমিন এই মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু করেন এবং এটি ১৫১৩ সালে সম্পন্ন হয়। লাল ইটের তৈরি এক গম্বুজ বিশিষ্ট এই প্রাচীন মসজিদটি স্থানীয়ভাবে অনেকের কাছে 'গায়েবি মসজিদ' নামেও পরিচিত।
অবস্থান: হবিগঞ্জ সদর উপজেলার রাজিউরা ইউনিয়নের শঙ্করপাশা গ্রামে।
গোপাল পোদ্দার জমিদার বাড়ি—
ইতিহাস ও স্থাপত্য: হবিগঞ্জ জেলা সদরের গোপায়া ইউনিয়নে বহুলা পৌদ্দার জমিদারবাড়ি অবস্থিত। জমিদারবাড়িটি জেলার ঐতিহ্যবাহী একটি প্রাচীন নিদর্শন। কালের বিবর্তনে এর জৌলুস কিছুটা কমলেও ভবনটির নির্মাণশৈলী এবং দেয়ালের কারুকার্য এখনও অতীত জমিদারদের বৈভব এবং আভিজাত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। বর্তমানে আলোকচিত্রপ্রেমীদের কাছে এটি একটি অন্যতম জনপ্রিয় স্থান।
এছাড়াও এখানে রয়েছে কয়েকশ’ বছরের পুরনো একটি জমিদারবাড়ি। এ বাড়িতেই একদা বাস করতেন দাপুটে এক জমিদার। নাম তার গোপাল পৌদ্দার। দাপটের সঙ্গে তার পরবর্তী বংশধররাও জমিদারি করে গেছেন।
এখন এ বাড়িতে জমিদারদের কেউ থাকেন না। তবে অন্য লোকজন বসবাস করছেন পরিত্যাক্ত এ বাড়িটিতে। কালের সাক্ষী হয়ে জমিদারবাড়ির ভবনগুলো আজো দণ্ডায়মান আছে। বাড়ির সামনে রয়েছে বড় একটি পুকুর। পুকুর পাড়ে জমিদারদের দানকৃত জমিতে বানানো হয়েছে স্কুল। শুধু নেই জমিদারের বংশধরদের কেউ। এখানে সদর উপজেলা পরিষদ ভবনও রয়েছে।
যদিও পৌদ্দার বাড়ির জমিদাররা এখানে নেই। রয়েছে তাদের নামের সঙ্গে স্মৃতি জড়িত পৌদ্দার বাড়ি। এ নামটির অনুসন্ধানেই বেরিয়ে আসবে তাদের কথা। আরো আসবে তাদের জমিদারির ইতিহাস। এখনও বাড়িটি দেখলে তার প্রাচীন ঐতিহ্য মনে দাগ কাটে। মলিন হলেও এক সময় জমিদারবাড়িই ছিল!
স্থানীয়রা জানান, নানা কারণে জমিদারের বংশধরদের বেশিরভাগই জমিদারি ছেড়ে ভারতের কলকাতায় চলে গেছেন। আবার কিছু বংশধর জেলা শহর হবিগঞ্জ ও মাধবপুরে বসবাস করছেন।
অবস্থান: হবিগঞ্জ সদর।
মুড়ারবন্দ দরবার শরিফ
ইতিহাস ও স্থাপত্য: এটি মূলত কোনো সাধারণ ভবন নয়, বরং হযরত শাহ জালাল (র.)-এর অন্যতম সঙ্গী এবং তরফ রাজ্য বিজয়ের প্রধান সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (র.)-এর পবিত্র মাজার শরিফ। এখানকার প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী এবং শান্ত পরিবেশ হবিগঞ্জের ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শত বছরের সুফি ঐতিহ্যের কথা বহন করে।
অবস্থান: চুনারুঘাট উপজেলা, হবিগঞ্জ।
ব্রিটিশ ও ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপনা—
ব্রিটিশ শাসনামলে হবিগঞ্জ যখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছিল, তখন এখানে বেশ কিছু পশ্চিমা ও মিশ্র স্থাপত্যশৈলীর ভবন তৈরি হয়।
হবিগঞ্জ পৌরসভা ভবন: ১৯৪০ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত এই পৌর ভবনটি জেলার স্থানীয় সরকার কাঠামোর এক প্রাচীন স্মারক।
আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের পুরোনো স্টেশন: ১৯২৮-১৯২৯ সালের দিকে নির্মিত হবিগঞ্জ বাজার-শায়েস্তাগঞ্জ-বাল্লা রেললাইনের স্টেশন এবং কোয়ার্টারগুলোর অবশিষ্টাংশ আজও ব্রিটিশ আমলের যাতায়াত ও বাণিজ্যিক ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয়।
প্রাচীন এই স্থাপত্যগুলোর অনেকগুলোই এখন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ও সংস্কারের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কোথাও কোথাও এগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলেও তা পর্যাপ্ত নয়।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক
দ.ক.২৬