যে নারী বা পুরুষ অর্থের বিনিময়ে যৌনসেবা প্রদান করেন, তাকে আমরা যৌনকর্মী বলি। তাঁর পেশা নিয়ে সমাজের নানা মত থাকতে পারে, কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে তাঁরও রয়েছে মর্যাদা, অধিকার এবং বেঁচে থাকার অধিকার।
কিন্তু আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়।
শুধু দেহই কি বিক্রি হয়?
বিক্রি হয় না কি বিবেকও?
একজন মানুষ যখন অর্থের বিনিময়ে নিজের শ্রম দেন, সেটি জীবিকার অংশ। কিন্তু যখন কেউ অর্থের বিনিময়ে নিজের নৈতিকতা, দায়িত্ব, ক্ষমতা, ন্যায়বোধ কিংবা বিবেককে বিক্রি করে দেন, তখন বিষয়টি আর সাধারণ জীবিকার মধ্যে থাকে না। সেখানে জন্ম নেয় দুর্নীতি।
একজন যৌনকর্মী অর্থের বিনিময়ে নিজের শ্রম দেন।
কিন্তু একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যদি অর্থের বিনিময়ে একটি অন্যায় ফাইলে স্বাক্ষর করেন, তিনি বিক্রি করেন তাঁর দায়িত্ব ও ক্ষমতা।
একজন মানুষ নিজের শ্রমের বিনিময়ে আয় করলে সেখানে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন নাও হতে পারে। কিন্তু একজন কর্মকর্তা যদি ঘুষের বিনিময়ে যোগ্যতার বদলে অযোগ্য কাউকে চাকরি দেন, তখন শুধু একটি চাকরি বিক্রি হয় না—বঞ্চিত হয় একজন যোগ্য মানুষের অধিকার।
একজন বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি যদি অর্থ, প্রভাব বা ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে আইনের স্বাভাবিক প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করেন, তখন শুধু একটি সিদ্ধান্তের মূল্য নির্ধারিত হয় না; মানুষের ন্যায়বিচারের ওপর আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একজন রাজনৈতিক সংগঠনের দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি অর্থের বিনিময়ে দলের পদ বিক্রি করেন, তাহলে সেখানে শুধু একটি পদ হাতবদল হয় না; প্রশ্নের মুখে পড়ে সংগঠনের আদর্শ, কর্মীদের শ্রম এবং মানুষের বিশ্বাস।
আর যখন অর্থের বিনিময়ে রাজনৈতিক মনোনয়ন কেনাবেচার অভিযোগ ওঠে, তখন বিষয়টি আরও গুরুতর। কারণ সেখানে ব্যক্তিগত লাভের পাশাপাশি জনগণের প্রতিনিধিত্বের অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
তাহলে পার্থক্যটা কোথায়?
দেহশ্রম আর দুর্নীতি এক জিনিস নয়।
দেহশ্রম একজন মানুষের জীবিকার পথ হতে পারে। একজন যৌনকর্মী তাঁর শ্রমের বিনিময়ে অর্থ উপার্জন করেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, পেশা ও সিদ্ধান্তকে মানবিক মর্যাদার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
অন্যদিকে দুর্নীতি হলো—অর্পিত দায়িত্ব, ক্ষমতা বা প্রতিষ্ঠানের অবস্থানকে ব্যক্তিগত বা অন্যায় লাভের জন্য অপব্যবহার করা।
এই পার্থক্যটি বোঝা খুব জরুরি।
কারণ সমাজে আমরা অনেক সময় অদ্ভুত এক দ্বিচারিতা দেখি।
যে নারী জীবিকার প্রয়োজনে নিজের শরীরের শ্রম বিক্রি করেন, তাঁকে আমরা সহজেই বিচার করি। তাঁর পেশার পরিচয় দিয়ে তাঁকে ছোট করি, সমাজের নিচের সারিতে ঠেলে দিই।
অথচ যে ব্যক্তি অর্থের বিনিময়ে মানুষের অধিকার বিক্রি করেন, অন্যায়কে বৈধতার পোশাক পরান, যোগ্যতার জায়গায় টাকার প্রভাব বসান কিংবা নিজের ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত লাভের জন্য ব্যবহার করেন—তাঁদের অনেকেই সমাজে সম্মান, পদ ও প্রতিপত্তি ধরে রাখেন।
কেন এই দ্বৈত মানদণ্ড?
একজন যৌনকর্মীর বিক্রি হয়তো আমাদের চোখে দৃশ্যমান।
কিন্তু একজন দুর্নীতিবাজের বিবেকের বিক্রি অনেক সময় লুকিয়ে থাকে ফাইলের পাতায়, সিলের নিচে, নিয়োগপত্রে, পদায়নের আদেশে কিংবা ক্ষমতার অলিন্দে।
একজন নারী হয়তো অর্থের বিনিময়ে নিজের দেহের শ্রম দেন।
কিন্তু একজন কর্মকর্তা যদি ঘুষের বিনিময়ে মানুষের অধিকার নিয়ে সিদ্ধান্ত দেন, তিনি কি শুধু অর্থ নিচ্ছেন?
না।
তিনি বিক্রি করছেন তাঁর দায়িত্ব।
একজন নিয়োগদাতা যদি অর্থের বিনিময়ে চাকরি দেন, তিনি বিক্রি করছেন যোগ্যতার ন্যায়বিচার।
একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি যদি অর্থের বিনিময়ে দলীয় পদ দেন, তিনি বিক্রি করছেন সংগঠনের বিশ্বাস।
আর কেউ যদি অর্থের বিনিময়ে রাজনৈতিক মনোনয়ন বেচাকেনার সঙ্গে যুক্ত হন, তাহলে সেখানে প্রশ্ন ওঠে জনগণের প্রতিনিধিত্বের মর্যাদা নিয়ে।
এখানেই আমাদের ভাবতে হবে—কোন বিক্রি ব্যক্তিগত জীবিকার অংশ, আর কোন বিক্রি সমাজের ওপর অন্যায় চাপিয়ে দেয়।
কারণ একজন মানুষ নিজের শ্রম বিক্রি করতে পারেন; কিন্তু তাঁর কাছে অর্পিত জনস্বার্থ, ন্যায়বিচার কিংবা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বিক্রি করার অধিকার তাঁর নেই।
তাই যৌনকর্মীকে অপমান করে সমাজের দুর্নীতি দূর হবে না। বরং আমাদের প্রশ্ন করতে হবে সেই মানুষদের, যাঁদের হাতে ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অর্পিত হয়েছে।
যে ব্যক্তি ঘুষ নিয়ে ফাইল অনুমোদন করেন,
যে ব্যক্তি অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেন,
যে ব্যক্তি ব্যক্তিগত স্বার্থে ন্যায়বিচারকে প্রভাবিত করেন,
যে ব্যক্তি অর্থের বিনিময়ে সাংগঠনিক পদ বা রাজনৈতিক সুযোগের দরদাম করেন—
তাঁদের কর্মকাণ্ডের সামাজিক প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছায়।
কারণ সেখানে একজন মানুষের নয়, অসংখ্য মানুষের অধিকার ও ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে।
তবে এখানেও একটি মানবিক সত্য ভুলে গেলে চলবে না।
কেউ যৌনকর্মী হলেই তিনি খারাপ মানুষ—এমন সিদ্ধান্ত যেমন অন্যায়, তেমনি কোনো পেশার পরিচয় দিয়ে একজন মানুষকে নৈতিকভাবে বিচার করাও অনুচিত। মানুষকে তার পেশা দিয়ে নয়, তার আচরণ, সততা ও মানবিকতা দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত।
দারিদ্র্য, প্রতারণা, সামাজিক বৈষম্য, পারিবারিক সংকট কিংবা জীবনের নানা কঠিন বাস্তবতা অনেক মানুষকে এমন পেশায় ঠেলে দিতে পারে। তাই তাঁদের প্রতি ঘৃণা নয়, প্রয়োজন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অধিকারভিত্তিক আচরণ।
আর দুর্নীতির ক্ষেত্রে প্রয়োজন কঠোর জবাবদিহি।
কারণ দেহের শ্রমের বিনিময়ে অর্থ উপার্জন আর দায়িত্বের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ—দুটি এক নয়।
একটিতে মানুষ তার শ্রম বিক্রি করে।
অন্যটিতে কেউ তার অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে।
আমাদের সমাজকে তাই শুধু কে কী বিক্রি করছে—এই প্রশ্ন করলেই চলবে না।
প্রশ্ন করতে হবে—
কে কী বিক্রি করছে, কেন বিক্রি করছে, এবং তার বিনিময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কে?
একজন মানুষ হয়তো নিজের শ্রমের বিনিময়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
কিন্তু একজন ক্ষমতাবান মানুষ যখন অর্থের বিনিময়ে অন্যের অধিকার বিক্রি করেন, তখন তাঁর লেনদেনের মূল্য শুধু টাকায় মাপা যায় না।
সেখানে বিক্রি হয়ে যায় বিশ্বাস।
বিক্রি হয়ে যায় ন্যায়।
বিক্রি হয়ে যায় যোগ্যতার মূল্য।
কখনো কখনো বিক্রি হয়ে যায় মানুষের ভবিষ্যৎও।
তাই সমাজের আয়নায় শুধু যৌনকর্মীর দিকে তাকালে চলবে না।
আমাদের তাকাতে হবে সেই আয়নার অন্য পাশেও—যেখানে স্যুট-পরা মানুষ, ক্ষমতাবান মানুষ, সম্মানিত মানুষ, দায়িত্বশীল মানুষও কখনো কখনো টাকার কাছে নিজের বিবেকের দরদাম করেন।
দেহের শ্রমকে অপমান নয়, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় নয়—
মানুষের মর্যাদা হোক মানবিকতায়,
আর দায়িত্বের মূল্য নির্ধারিত হোক সততায়।
কারণ— বিক্রি শুধু দেহ হয় না।
কখনো কখনো বিক্রি হয়ে যায় বিবেকও। আর দেহের শ্রমের বাজারকে ঘৃণা করার আগে আমাদের ভাবতে হবে—
বিবেকের বাজারটি বন্ধ করার জন্য আমরা কী করছি?
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট