বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্র সৃষ্টিশীলতার প্রখর তেজোদীপ্তকালের শেষপাদে একই সঙ্গে পাণ্ডিত্য ও রম্যবোধে অতুল সাহিত্য স্রষ্টা সৈয়দ মুজতবা আলী। বিভিন্ন ভাষা থেকে আনা শ্লোক ও রূপকের যথার্থ ব্যবহার, হাস্যরস সৃষ্টিতে পারদর্শিতা এবং এর মধ্য দিয়ে গভীর জীবনবোধ ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা তার মতো আর কোনো বাঙালি লেখকের ছিলো কিনা বলা মুশকিল। সহজ জীবনবোধে পথে পথে বা আটপৌরে মানবজীবনে ঘটমান নিত্য স্বাভাবিক ঘটনাবলী থেকে তিনি কুড়িয়ে নিয়েছেন রম্যরসের অবিরল ধারা, যা আকাশের নক্ষত্রের মতো এখনও সমুজ্জ্বল। সৈয়দ মুজতবা আলী আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম এক শিক্ষাবিদ, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, অনুবাদক, রম্যরচয়িতা, সুপণ্ডিত, ভ্রমণপিপাসু, বহুভাষাবিদ, বাঙালি, ভারতীয় এবং পাকিস্তানি— এই তিনটি জাতীয়তা বহন করা একজন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একান্ত সান্নিধ্য পাওয়া, স্নেহধন্য, শান্তিনিকেতনে পড়ুয়া অতি মেধাবী ও পাণ্ডিত্যের অধিকারী কোনো মুসলমান সম্ভবত সৈয়দ মুজতবা আলী একাই একজন। ভ্রমণসাহিত্য এবং রম্যরচনা-বাংলা সাহিত্যের এই দুইটি ধারায় তার সৃষ্টি অনন্য রূপলাভ করেছে।
সৈয়দ মুজতবা আলী জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ সেপ্টেম্বর অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতে আসামের অন্তর্ভুক্ত সিলেটের করিমগঞ্জে। পিতা খান বাহাদুর সৈয়দ সিকান্দার আলী সাব-রেজিস্ট্রার ছিলেন। তার পৈতৃক ভিটা মৌলভীবাজার জেলায়, তবে পূর্বপূরুষের নিবাস হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলায়।
তিনি শান্তিনিকেতনে (বিশ্বভারতী) পড়ার সময় থেকেই লেখালেখি করতেন। ‘সত্যপীর’, ‘ওমর খৈয়াম’, ‘টেকচাঁদ’, ‘প্রিয়দর্শী’ প্রভৃতি ছদ্মনামে তিনি বিভিন্ন পত্রিকা যেমন- ‘দেশ’, ‘মোহাম্মদী’, ‘সত্যযুগ’, ‘আনন্দবাজার’, ‘বসুমতী’-তে কলাম লিখতেন। অধ্যাপনা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন জীবনের অনেকগুলো বছর। অধ্যাপনা ও চাকরিসূত্রে সৈয়দ মুজতবা আলীর ওঠাবসা-চলাফেরা হতো শিক্ষাবিভাগ ও দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন রাশভারী লোকজনদের সঙ্গে। তিনি নিজেও ব্যক্তিজীবনে ছিলেন অত্যন্ত শিক্ষানুরাগী এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। তথাপি এতো রসবোধ ও রসিক মনোভাবসম্পন্ন সাহিত্য যে কী করে রচনা করেছেন তা ভেবে আশ্চর্য না হয়ে পারি না! রবীন্দ্রযুগে খোদ রবীন্দ্রানুসারী হয়েও এতোটা অনন্যতা আর কোনো সাহিত্যিকের মধ্যে খুব একটা চোখে পড়ে না। পড়াশোনা ও চাকরিসূত্রে বিভিন্ন দেশ যেমন- ভারত, জার্মানি, আফগানিস্তান, মিশরে বসবাস করেছেন। ফলশ্রুতিতে উপন্যাস, ছোটগল্প ছাড়াও বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের কাহিনীগুলো তার লেখনীতে উঠে এসেছে। অগাধ পাণ্ডিত্য এবং সূক্ষ্ণ রসবোধ এই দুইয়ের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন সৈয়দ মুজতবা আলীর সাহিত্য। তার লেখার প্রধান বিশেষত্ব হলো, তিনি বাস্তবজীবনের নিরেট অভিজ্ঞতালব্ধ ঘটনাগুলোকে রসিয়ে রসিয়ে কাহিনীর মতো করে অনর্গল বর্ণনা করে যেতেন। বিভিন্ন দেশের ইতিহাস, মানুষ ও জীবন, সমাজ, রাজনীতি, জীবনপ্রণালীর রীতিনীতি থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষুদ্র বিষয়ও তিনি তার লেখায় চমৎকার রূপ দিয়েছেন। বিশ্বের প্রায় অনেক দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য কীভাবে একটির সঙ্গে অন্যটির মূলসূত্র গ্রন্থিত তাও অতি সহজ ভাষায় তিনি বর্ণনা করেছেন।
তার সাহিত্যসৃষ্টিতে ভ্রমণকাহিনীগুলোই উল্লেখযোগ্য। ‘দেশে বিদেশে’ (১৯৪৯) তার শ্রেষ্ঠ ভ্রমণকাহিনী। কাবুল ভ্রমণের কাহিনী নিয়ে তিনি এটি রচনা করেন । কলকাতা থেকে পেশোয়ার হয়ে কাবুলে যাত্রার ঘটনা দিয়ে এর কাহিনী শুরু হয়। এরপর তিনি কাবুলের বিভিন্ন মানুষজন ও তাদের রীতিনীতি ছাড়াও কাবুলে তার সঙ্গে পরিচিত হওয়া অনেক আকর্ষণীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচয়, কথোপকথন এবং দৈনন্দিন জীবনের কার্যকলাপ অত্যন্ত সূক্ষ্ণ রসবোধের সঙ্গে এতে তুলে ধরেছেন। কাবুলের আগা আবদুর রহমানকে আমরা কে না চিনি? সৈয়দ মুজতবা আলীর ভ্রমণকাহিনী ‘দেশে বিদেশে’র একটি অন্যতম প্রধান চরিত্র আবদুর রহমান। আমার মনে হয় ‘দেশে বিদেশে’ ভ্রমণকাহিনীর পাঠকমাত্রই মানসচোখে এই চিত্রকল্পটি অবশ্যই দেখে থাকবেন- ‘বরফাচ্ছাদিত জনাকীর্ণ কাবুলের পথে বিশাল বপু পাঠান আবদুর রহমানের পিঠে একটা বিরাট বোঁচকা; তার পিছু পিছু ক্ষীণ বপুর বাঙালি সৈয়দ মুজতবা আলী হেঁটে হেঁটে যাচ্ছেন’!
‘দেশে বিদেশে’-কে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ভ্রমণকাহিনী হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। অন্য কোনো ভ্রমণকাহিনী আজ পর্যন্ত এটির মতো জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারেনি। হাস্যরসে পূর্ণ বর্ণনার আশ্চর্য সুন্দর ও চমৎকার প্রাঞ্জলতাই এর কারণ। বহুভাষাবিদ সৈয়দ মুজতবা আলী বাংলা ছাড়াও ইংরেজি, সংস্কৃত, উর্দু, হিন্দি, আরবি, ফারসি, মারাঠি, গুজরাটি, পশতু, ফরাসি, জার্মানি, গ্রিক, ইতালিয়ান ভাষায় সমান পারদর্শী ছিলেন। এ কারণে তার রচনায় বিভিন্ন ভাষার শব্দের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো; তেমনি ‘দেশে বিদেশে’ ভ্রমণকাহিনীতে হিন্দি, উর্দু, আরবি, ফারসি, পশতু, ইংরেজি শব্দ ছাড়াও ফরাসি এমনকি রুশ শব্দও ব্যবহার করতে ছাড়েননি! অথচ রচনাটি কিছুমাত্রও এর সুবোধ্যতা হারায়নি! বিবিধ ভাষা থেকে শ্লোক ও রূপকের যথার্থ ব্যবহার, হাস্যরস সৃষ্টিতে পারদর্শিতা এবং এর মধ্য দিয়ে গভীর জীবনবোধ ফুটিয়ে তোলার আশ্চর্য ক্ষমতা তাকে বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। ভ্রমণকাহিনী হওয়া সত্ত্বেও ‘দেশে বিদেশে’ আফগানিস্তানের ইতিহাসের একটি লিখিত দলিল। তার রম্য-রসাত্মক বর্ণনা, মানুষের সঙ্গে রসালাপ, ভ্রমণের সময় বিভিন্ন স্থানের বর্ণনার মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের ইতিহাস ও রাজনীতিক প্রেক্ষাপট দেখা যায়। শুধু আফগানিস্তান নয়; ভারত, ইংল্যাণ্ড, জার্মান, রাশিয়া, চীন প্রভৃতি দেশের ইতিহাস এবং তৎকালীন রাজনীতিক পরিপ্রেক্ষিত ও সম্পর্কও তিনি তুলে ধরেছেন। কাবুলে অবস্থানের শেষ পর্যায়ে আফগানিস্তানের রাজনীতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন শুরু হয় এবং বাচ্চায়ে সাকোর আক্রমণে বিপর্যস্ত কাবুল ত্যাগের করুণ কাহিনীর মধ্য দিয়ে শেষ হয় ‘দেশে বিদেশে’। করুণ বলছি এ কারণে, আবদুর রহমানের সঙ্গে লেখকের বিচ্ছেদ মুহূর্তটি দিয়েই কাহিনী শেষ হয়; মুহূর্তটি আদতেই হৃদয়বিদারক।
পরবর্তীতে ইউরোপ, কায়রো ও বরোদার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে তার রম্য ধাঁচে লেখা ‘পঞ্চতন্ত্র’ (১৯৫২), ‘জলে-ডাঙ্গায়’-ও (১৯৫২) ও তার অন্যতম ভ্রমণকাহিনী। তার লেখা উপন্যাস- ‘অবিশ্বাস্য’ (১৯৫৪), ‘শবনম’ (১৯৬০), ‘শহরইয়ার’ (১৯৬৯) ও রম্যরচনা ‘ময়ূরকণ্ঠী’ (১৯৫২)।
বিখ্যাত ছোটগল্পগুলোর মধ্যে ‘চাচাকাহিনী’, ‘টুনি মেম’, ‘ধূপছায়া’, ‘রাজা উজির’, ‘বেঁচে থাক সর্দি-কাশি’, ‘তীর্থহীনা’, ‘পুনশ্চ’, ‘কর্ণেল’, ‘ক্যাফে-দি-জেনি’, ‘স্বয়ম্বরা’, ‘বেল তলায় দু-দুবার’, ‘রাক্ষসী’, ‘রসগোল্লা’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ছোটগল্পগুলোর বেশিরভাগেই পাঠককে তিনি দ্বিধায় ফেলে দেন এ কারণে যে, গল্পের চরিত্র বা ঘটনাবলী বাস্তব নাকি নিছক গল্প তা নিয়ে মনের মধ্যে একটা দোলাচল সৃষ্টি হয়। তবে প্রতিটি গল্পের কাহিনী, চরিত্র, কথোপকথন সবকিছুই তার উইট ও সূক্ষ্ণ রসবোধে এমনভাবে সিক্ত যে, মোটামুটি সব বয়সী পাঠকই তার রচনার রসাস্বাদনে সক্ষম। তার লেখার ধরনই এমন যে পাঠমাত্রই অন্যরকম অনুভূতি দেয়।
১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি নরসিংহ দাস পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে আনন্দ পুরস্কার প্রদান করা হয়। বাংলাদেশে ২০০৫-এ তাঁকে একুশে পদক-এ ভূষিত করা হয়।
১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারি সৈয়দ মুজতবা আলী মৃত্যুবরণ করেন।
সৈয়দ মুজতবা আলী একজন বহুমাত্রিক প্রতিভার সব্যসাচী লেখক, ক্ষণজন্মা পুরুষ। বাংলাভাষী মানুষের নিত্যদিনের তুচ্ছ ঘটনায় রস সঞ্চার করেছেন অবিরত মাতৃভাষায়। তাঁর সাহিত্য তাই জীবন-ঘনিষ্ট। তাই তাঁর প্রয়োজন কখনো ফুরিয়ে যাবার নয়; অসংখ্য সৃষ্টিকমই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে যুগযুগান্তর।
লেখকঃ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক
kamal100.ka@gmail.com