বাঁশ
তাইজুল ইসলাম
আমাদের সমাজে একটা বহুল প্রচলিত কথা আছে, বাঁশ না খেলে বুদ্ধি হয় না। কথাটা শুনতে খারাপ লাগলেও যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস খুব কম মানুষেরই আছে।
জীবনে আমরা যতগুলো বিপদ, ব্যর্থতা, অপমান, হতাশার মুহূর্তের মুখোমুখি হয়েছি, সেগুলোর অধিকাংশই ছিল একেকটা বাঁশ। পার্থক্য শুধু এই যে, কেউ বাঁশ খেয়ে শিক্ষা নেয়, আর কেউ শিক্ষা বাদ দিয়ে শুধু বাঁশের ব্যথাটুকু নেয়।
বাংলাদেশে বাঁশের অনেক জাত আছে। তা নিয়ে কথা বলছি না, কারণ এগুলো প্রায় একই ধরনের। তবে আজ আমি বলব চাইনিজ ব্যাম্বুর কথা।
চীনে এক ধরনের বাঁশ আছে, যেটাকে বলা হয় চাইনিজ ব্যাম্বু। এই গাছের সবচেয়ে আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য হলো—চার বছর পর্যন্ত মাটির ওপরে দাঁড়িয়ে থেকে সে প্রায় কিছুই করে না। না লম্বা হয়, না প্রতিবেশীদের তাক লাগায়, না ফেসবুকে নিজের বৃদ্ধি নিয়ে হতাশাজনক পোস্ট দেয়।
আপনি বছরের পর বছর পানি দিচ্ছেন, সার দিচ্ছেন, যত্ন নিচ্ছেন—কিন্তু গাছের কোনো উন্নতি নেই। আমাদের সময় হলে এর মধ্যেই তিনবার মোটিভেশনাল পোস্ট, পাঁচবার হতাশার স্ট্যাটাস আর অন্তত একবার “আমি আর পারছি না” ঘোষণা দিয়ে ফেলতাম। মাঝে-মধ্যে তো বাঁশ নিয়ে হাসিঠাট্টাও করি। কিন্তু চাইনিজ ব্যাম্বু এসব বুঝে না। সে চার বছর ধরে মাটির নিচে নিজের ভিত্তি শক্ত করে, শিকড় বিস্তার করে। তারপর পঞ্চম বছরে গাছটি সপ্তাহে আশি থেকে নব্বই ফুট লম্বা হয়।
এই গল্প বলার কারণ আছে।
আজকাল আমাদের সমাজে পাঠকের চেয়ে কবি বেশি। দু-চারটা কবিতা পড়ে, কয়েকটা উদ্ধৃতি মুখস্থ করে, আর একটি ফেসবুক আইডি খুলেই নামের পাশে কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, দার্শনিক, সাংবাদিক ইত্যাদি লাগিয়ে নিজেকে জাহির করতে বসে। এদের অবস্থা অনেকটা বাংলা বাঁশের মতো। প্রথম সপ্তাহে দশ ফুট লম্বা, দ্বিতীয় সপ্তাহে ঝড়েই শেষ। শিকড়ের চেয়ে পরিচিতির ব্যানার বড়, চর্চার চেয়ে আত্মপ্রচারের পরিমাণ বেশি। এদের বুঝাবে কে, বড় বিল্ডিং তুলতে হলে নিজের ভিত্তি মজবুত করতে হয়।
তারা লেখক হওয়ার আগেই লেখক পরিচয়পত্র ছাপিয়ে ফেলে। কবিতা বোঝার আগেই কবি হয়ে যায়। সাহিত্য পড়ার আগেই সাহিত্যকে বাঁচানোর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। মেধা নিয়ে বড়াই করে চিল্লাপাল্লা করে। তাদের হওয়ার কথা ছিল গম্ভীর।
আমি বলছি না তারা লিখবে না। অবশ্যই লিখবে। কিন্তু বীজতলা থেকে উঠে এসেই যদি কেউ নিজেকে বটগাছ ঘোষণা করে, তাহলে অবশ্যই সমস্যা আছে। সমস্যাটা আমার না, আবার সমাজেরও না, তার নিজের।
বাঁশের গল্প এখানেই শেষ নয়।
আমি যদি বলি, ঠিক জায়গায় বাঁশ ব্যবহার করে পুরস্কারও পাওয়া যায়—বিশ্বাস করবেন?
বাংলা একাডেমির আয়োজিত অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এ মাত্রা প্রকাশন বাঁশ দিয়ে নান্দনিক স্টল নির্মাণ করে পেয়েছে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬। এতে বোঝা যায়, বাঁশ জায়গামতো কাজে লাগাতে পারলে মইয়ের কাজ করে, আর মানুষকে পৌঁছে দেয় সফলতার উচ্চ শিখরে।
বিখ্যাত লেখক জে. কে. রাউলিং-এর কথাই ধরুন। জীবনের ব্যর্থতা, প্রত্যাখ্যান আর সংগ্রামকে পুঁজি করেই তিনি সাফল্যের গল্প লিখেছেন। জীবনের দেওয়া বাঁশগুলোকে তিনি জ্বালানি বানিয়েছিলেন, আপনাদের-আমার মতো অজুহাত নয়। এতেই বোঝা যায়, বাঁশ আসলে খুব নিরপেক্ষ জিনিস। আপনি চাইলে তা দিয়ে বেড়া বানাতে পারেন, মই বানাতে পারেন, আবার নিজের মাথায় বাড়ি দিয়ে নিজেকে মারতেও পারেন।
তাই বাঁশকে ছোট করে দেখবেন না। বাঁশ নিন, বাঁশ দিন, বাঁশ খান। বাঁশ হোক জাতীয় খাবার। কারণ জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক যদি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না হয়, তাহলে তার নাম সম্ভবত—বাঁশ।
দ.ক/টিআই