বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা একদিনে শুরু হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ চার দশকের ইতিহাস, মতাদর্শের বিস্তার, সাংগঠনিক বিবর্তন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া। আধুনিক অর্থে জিহাদি জঙ্গিবাদের বিকাশ শুরু হয় ১৯৮০-এর দশকে আফগান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। সে সময় আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রায় ৩ হাজার, মতান্তরে প্রায় ১ হাজার বাংলাদেশি যুবক জিহাদে যোগ দিতে আফগানিস্তানে যায় বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। সেখানে আরব প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ এবং সালাফি-জিহাদি মতাদর্শে দীক্ষা নিয়ে তাদের একটি অংশ দেশে ফিরে আসে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতার সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে ওঠে।
জাতীয় প্রেসক্লাবে ঘোষণা দিয়ে আফগান যাত্রার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এভাবেই বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের প্রথম প্রজন্মের তৎপরতার সূচনা ঘটে।
প্রথম প্রজন্ম: আফগানফেরত মুজাহিদ ও হুজি-বি: এই সময়কালে দুটি প্রাথমিক সংগঠন গড়ে ওঠে—মুসলিম মিল্লাত বাহিনী এবং হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশ, সংক্ষেপে হুজি-বি। হুজি-বি আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৯২ সালের ৩০ এপ্রিল জাতীয় প্রেসক্লাবে আত্মপ্রকাশ করে। আফগানফেরত মুজাহিদদের একটি অংশ ছিল এর সঙ্গে যুক্ত।
সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ সরকার উৎখাত করে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা করা। এর প্রায় এক দশক পর বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের দ্বিতীয় প্রজন্মের সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়ংকর সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে জামা'আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ বা জেএমবি।
১৭ আগস্ট ২০০৫: জঙ্গিবাদের প্রকাশ্য বিস্ফোরণ: জেএমবির তৎপরতা সবচেয়ে বড় আকারে প্রকাশ্যে আসে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট। ওই দিন দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে সিরিজ বোমা হামলা চালানো হয়। এটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে জঙ্গিবাদের সবচেয়ে বড় সমন্বিত প্রদর্শনী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরপর জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), হিযবুত তাহরীরসহ বিভিন্ন নামে ও পরিচয়ে আরও কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনের তৎপরতা সামনে আসে।
পলমপুর: জেএমবির শুরুর পর্ব: জেএমবির সূচনাকে ঘিরে পলমপুরের নামও আলোচনায় আসে। এ বিষয়ে দুটি ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও উভয় তথ্যই একই স্থানের দিকে নির্দেশ করে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। উইকিপিডিয়াসহ কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ঢাকার অদূরে জামালপুরের পলমপুরের উল্লেখ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, ১৯৯৮ সালের দিকে সেখান থেকেই গোপনে জেএমবির সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু হয়েছিল। ২০০১ সালে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বোমা ও সাংগঠনিক নথি উদ্ধারের ঘটনায় সংগঠনটির তৎপরতা আরও প্রকাশ্যে আসে।
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিস্তার কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি প্রায় চার দশকের ধারাবাহিক বিবর্তনের ফল। এই বিবর্তনকে মোটামুটি তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়।
প্রথম পর্যায়: মতাদর্শের বিস্তার (১৯৮৬-১৯৯২): এই পর্যায়ের সূচনা আফগানিস্তানের জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশ থেকে কিছু যুবক আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে অংশ নেয়। এর আগে ঢাকায় বায়তুল মোকাররমের সামনে ব্যানার টাঙিয়ে প্রকাশ্যে মুজাহিদ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
আফগানফেরত এসব ব্যক্তির একটি অংশ দেশে ফিরে আসে এবং কওমি মাদ্রাসার কিছু শিক্ষার্থীর কাছে তারা ‘মুজাহিদ’ হিসেবে পরিচিতি পায়। পরবর্তী সময়ে ‘মজলুম রোহিঙ্গা মুসলমানদের’ পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে সদস্য সংগ্রহের কার্যক্রমও চালানো হয়। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নিয়ে গোপন প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।
দ্বিতীয় পর্যায়: শরিয়া প্রতিষ্ঠার রাজনীতি (১৯৯৮-২০০৫): দ্বিতীয় প্রজন্মের জঙ্গিদের লক্ষ্য শুধু বিদেশের কোনো যুদ্ধে অংশ নেওয়া ছিল না। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা। এ উদ্দেশ্যে তারা দ্রুত সাংগঠনিক ও সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি টার্গেট কিলিংসহ বিভিন্ন সহিংস কৌশল গ্রহণ করে। এই পর্যায়ের সবচেয়ে আলোচিত সংগঠন ছিল জেএমবি। ১৯৯৮ সালের দিকে সংগঠনটির কার্যক্রম শুরু হলেও ২০০১ সালের পর এর তৎপরতা ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসে। পরবর্তী সময়ে উত্তরাঞ্চলে বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে জেএমবির একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে।
তৃতীয় পর্যায়: আল-কায়েদা ও আইএস ঘরানা (২০১৩-বর্তমান): ২০১৩ সালের পর বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের চরিত্রে আরও একটি পরিবর্তন দেখা যায়। এ পর্যায়ে শুধু মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নয়, ইংরেজি মাধ্যম, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চবিত্ত ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত তরুণদেরও একটি অংশ উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়।
এই পর্যায়ে দুটি প্রধান ধারা লক্ষ করা যায়। একটি হলো আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, পরবর্তী সময়ে আনসার আল ইসলাম, যাদের সঙ্গে আল-কায়েদার মতাদর্শগত ও সাংগঠনিক যোগাযোগের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের হত্যার অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে নব্য জেএমবি নিজেদের ইসলামিক স্টেট বা আইএসের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেয়। ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান বেকারি হামলা এই ধারার সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণগুলোর একটি।
বিবর্তন ও আন্তর্জাতিক সংযোগ: বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের বিবর্তনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জিহাদি নেটওয়ার্কের যোগাযোগের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৮০-এর দশকে মুসলিম মিল্লাত বাহিনীর তৎপরতার মধ্য দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে সশস্ত্র জঙ্গিবাদের প্রাথমিক প্রকাশ ঘটে। চাকরিচ্যুত মেজর মতিউর রহমান কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় আস্তানা গড়ে তোলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। ১৯৮৯ সালে পুলিশের সঙ্গে দীর্ঘ বন্দুকযুদ্ধের পর সংগঠনটির তৎপরতা ভেঙে পড়ে।
১৯৮৯-১৯৯২ সময়কালে হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশের সঙ্গে আফগানিস্তানের খোস্ত রণাঙ্গনের যোগাযোগ তৈরি হয়। ১৯৯২ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে।
পরবর্তী সময়ে আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনের যুদ্ধ ঘোষণাসংক্রান্ত নথিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ফজলুর রহমান নামে একজন বাংলাদেশির নামও পাওয়া যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। হুজি-বির সঙ্গে পাকিস্তানের বিভিন্ন জিহাদি সংগঠন এবং আঞ্চলিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের যোগাযোগের অভিযোগও রয়েছে।
১৯৯৮ সালের দিকে জেএমবির সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে সংগঠনটির উত্তরাঞ্চলীয় তৎপরতায় বাংলা ভাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
২০১৩ সালের পর আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের তৎপরতা সামনে আসে। পরে সংগঠনটির নাম আনসার আল ইসলাম করা হয়। সংগঠনটির সঙ্গে আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট বা AQIS-এর যোগাযোগের কথা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
২০১৫-২০১৬ সালের দিকে জেএমবির একটি অংশ আইএসের আদর্শ ও কর্মকৌশলের সঙ্গে যুক্ত হয়। এই গোষ্ঠীকে নব্য জেএমবি নামে অভিহিত করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে বড় ধরনের হামলা পরিচালনা এবং বিদেশি জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ রয়েছে।
অর্থায়ন: জঙ্গি সংগঠনগুলোর অর্থায়নের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাংগঠনিক বিস্তার, সদস্য সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সংগ্রহ ও যোগাযোগের জন্য অর্থের প্রয়োজন হয়।
শুরুর দিকে সদস্য সংগ্রহ ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে ব্যক্তিগত অনুদান ও বিভিন্ন সহায়তার ওপর নির্ভরতা ছিল বলে ধারণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসে। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে অর্থ আসা এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তার নামে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে অর্থ প্রবাহের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে অবৈধ অর্থ সংগ্রহ, চাঁদাবাজি, ডাকাতি এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও কিছু জঙ্গি সংগঠনের সম্পৃক্ততার তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে উঠে এসেছে। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনাও জঙ্গি নেটওয়ার্কের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বিষয়টি সামনে এনেছে।
তৎকালীন সরকারগুলোর বক্তব্য ও ভূমিকা
আওয়ামী লীগ সরকার: ১৯৯৬-২০০১: এই সময়ে জঙ্গিবাদ নিয়ে সরকারের অবস্থান ও তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় ১০ জন নিহত হন। সে সময় বাংলাদেশে সংগঠিত জঙ্গিবাদ সম্পর্কে রাষ্ট্রীয় ধারণা এখনও স্পষ্ট ছিল না।
হামলার ঘটনায় তৎকালীন তদন্ত ও মামলার গতিপথ নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। বিএনপি নেতা তরিকুল ইসলামকে মামলায় আসামি করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার: ২০০১-২০০৬
বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের ইতিহাসে এই সময়টি সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত। এই সরকারের প্রথম পর্যায়ে জঙ্গি তৎপরতার বিষয়ে নির্লিপ্ততা, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে সহযোগিতার অভিযোগও উঠেছিল।
২০০৩ সালে জয়পুরহাটে বাংলা ভাই গ্রেপ্তার হলেও পরে তিনি মুক্তি পান বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ২০০৪ সালে রাজশাহীর তিনটি উপজেলায় বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে জেএমবির প্রকাশ্য তৎপরতা নিয়েও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পর তদন্তের গতিপথ নিয়েও গুরুতর বিতর্ক তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে ‘জজ মিয়া’ নামে পরিচিত একটি সাজানো তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা হয়েছিল বলে আদালতের নথি ও পরবর্তী তদন্তে উঠে আসে।
১৭ আগস্টের পর অবস্থানের পরিবর্তন
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলার পর পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকার জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে।
২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে হুজি-বি এবং অক্টোবরে জেএমজেবিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। একই বছরের ১ অক্টোবর র্যাব বাড্ডা এলাকা থেকে মুফতি হান্নানকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মামলায় জঙ্গি সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইসহ সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের গ্রেপ্তার এবং পরবর্তী সময়ে তাদের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ২০০৭ সালে শায়খ আবদুর রহমান, বাংলা ভাইসহ ছয় শীর্ষ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াত সরকারের ২০০১-২০০৬ মেয়াদকে দুটি পৃথক পর্যায়ে দেখা প্রয়োজন। প্রথম পর্যায়ে জঙ্গি তৎপরতার প্রতি সরকারের বিতর্কিত অবস্থানের অভিযোগ রয়েছে; অন্যদিকে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের পর সরকার কঠোর জঙ্গিবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার: ২০০৭-২০০৮
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় জঙ্গিবাদ এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার তদন্ত নতুন পর্যায়ে যায়। একই সময়ে হুজি-বিসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়েও নতুন করে তদন্ত ও আলোচনা শুরু হয়।
আওয়ামী লীগ সরকার: ২০০৯-২০২৪
২০০৯ সালের পর আওয়ামী লীগ সরকার জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে। র্যাব, পুলিশ ও পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট বা সিটিটিসির ধারাবাহিক অভিযানে বিভিন্ন জঙ্গি নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হয়।
২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলার পর জঙ্গিবিরোধী অভিযান আরও জোরদার হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে বিভিন্ন জঙ্গি আস্তানা শনাক্ত, সদস্য গ্রেপ্তার এবং সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল করা হয়। এই সময়ে একাধিক জঙ্গি সংগঠন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে হিযবুত তাহরীর, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, জামা'আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংগঠন রয়েছে। ২০২৩ সালে জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়াকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
তবে এই সময়েও সমালোচনা ছিল। সমালোচকদের একটি অংশের অভিযোগ ছিল, জঙ্গিবাদবিরোধী আইন ও অভিযান কখনো কখনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এর ফলে প্রকৃত উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক শনাক্ত ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও কেউ কেউ মত দিয়েছেন।
২০০১-২০০৬: একই সরকারের দুই ভিন্ন ফেজ
বিএনপি সরকারের সময়ের জঙ্গিবাদবিরোধী ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালকে একক সময়কাল হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি স্পষ্ট হয় না। বরং দুটি পৃথক পর্যায়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
ফেজ-১: ২০০১ থেকে ২০০৫ সালের মাঝামাঝি
এই পর্যায়ে সরকারের বিরুদ্ধে জঙ্গিদের বিষয়ে নির্লিপ্ত থাকা এবং ক্ষেত্রবিশেষে সহযোগিতার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি ওঠে। বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ২০০৪ সালে রাজশাহীর কয়েকটি উপজেলায় বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে জেএমবির প্রকাশ্য তৎপরতার সময় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ২০০৩ সালে জয়পুরহাটে বাংলা ভাই গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার মুক্তির ঘটনাও এ বিতর্ককে আরও জোরালো করে। অন্যদিকে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার তদন্তে ‘জজ মিয়া’ নাটক তৈরি করে তদন্তকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে পরবর্তী তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় উঠে আসে।
ফেজ-২: আগস্ট ২০০৫ থেকে অক্টোবর ২০০৬
১৭ আগস্ট ২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলার পর সরকারের অবস্থানে বড় পরিবর্তন আসে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সরকার জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযান জোরদার করে।
হুজি-বি, জেএমবি ও জেএমজেবির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হয়। মুফতি হান্নানসহ বিভিন্ন জঙ্গি নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। শায়খ আবদুর রহমান, বাংলা ভাইসহ জেএমবির শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তারও এই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
ফলে ২০০১-২০০৬ সময়কালকে শুধু ‘জঙ্গিবাদে নির্লিপ্ত সরকার’ অথবা শুধু ‘জঙ্গিবাদবিরোধী কঠোর সরকার’—এই দুইয়ের যেকোনো একটি পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করলে ইতিহাসের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। বরং প্রথম পর্যায়ের বিতর্কিত ভূমিকা এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের কঠোর অভিযানের দুটো দিকই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
২০২৪-এর পর নতুন উদ্বেগ:
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জঙ্গিবাদ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে আটক কয়েকজন ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। তাদের মধ্যে ইকরামুল হকের নামও আলোচনায় এসেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, জামিনে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন ব্যবস্থা কতটা কার্যকর রয়েছে।
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ইতিহাস দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট—জঙ্গিবাদ কখনো শূন্য থেকে জন্ম নেয় না। একটি নির্দিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, মতাদর্শিক বিস্তার, অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারির দুর্বলতা একসঙ্গে কাজ করলে উগ্রবাদী সংগঠনগুলো পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়।
তাই বর্তমান চ্যালেঞ্জ শুধু জঙ্গি ধরার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন উগ্রবাদী মতাদর্শের বিস্তার ঠেকানো, অনলাইন র্যাডিক্যালাইজেশন শনাক্ত করা, অর্থের উৎস বন্ধ করা, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নজরদারি বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জঙ্গিবাদকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে জাতীয় নিরাপত্তার একটি স্বতন্ত্র ও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা। কারণ ইতিহাস দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সরকার বদলায়, কিন্তু জঙ্গি নেটওয়ার্কের মতাদর্শ ও কাঠামো একদিনে বিলীন হয় না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন প্রজন্মের জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় কার্যকর গোয়েন্দা, আইনগত ও সামাজিক প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে?
নাকি ইতিহাসের পুরোনো চক্র আবারও নতুন নামে, নতুন কৌশলে ফিরে আসবে?
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট, বর্তমান বাংলা
দ.ক.২৬