আসাদ ঠাকুর: দুটি পা একদম অচল, চলাচলের একমাত্র সম্বল একখানা হুইলচেয়ার। সেই হুইলচেয়ারে ভর করেই বছরের পর বছর কোমলমতি শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছেন চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশী ইউনিয়নের বড়ব্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কল্যাণ কুমার দেব। কিন্তু বর্ষা মৌসুম এলেই এই মানুষটির শিক্ষকতার সংগ্রাম রূপ নেয় এক চরম মানবিক করুণ বাস্তবতায়। বৃষ্টির দিনে হাঁটু সমান কাদা, কাঁচা রাস্তার দুর্ভোগ আর ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ পার হয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছানো যেন প্রতিদিন জীবন বাজি রাখার নামান্তর।
অভিজ্ঞ ও দক্ষ এই প্রধান শিক্ষক ১৯৯৯ সালে আলো ছড়ানোর মিছিলে যোগ দেন। ২০১৩ সালে বড়ব্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজ মেধা ও গুণে হয়ে ওঠেন শিক্ষকদের ইংরেজি বিষয়ের দক্ষ 'মাস্টার ট্রেইনার'। উপজেলাজুড়ে প্রায় সাড়ে সাতশত শিক্ষকের মাঝে একজন বিনয়ী ও আদর্শ মানুষ হিসেবে রয়েছে তাঁর এক বিশেষ খ্যাতি। কিন্তু ২০১৮ সালে একটি দুর্ঘটনায় ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে হারিয়ে ফেলেন হেঁটে চলার শক্তি। সিআরপি-তে দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর জীবন বাঁচলেও, অচল হয়ে যায় দুটি পা-ই।
বর্তমানে তিনি চুনারুঘাট উপজেলার আহমেদাবাদ ইউনিয়নের রাজার বাজারে নিজ বাড়িতে থাকেন। সেখান থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। সাধারণ মানুষের জন্যই যে পথ পার হওয়া কঠিন, বর্ষায় কাঁচা রাস্তাঘাট যখন পিচ্ছিল ও কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যায়, তখন একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী শিক্ষকের জন্য সেই পথ পাড়ি দেওয়া কতটা নির্মম—তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। তার ওপর পথিমধ্যে থাকা ব্রিজ পার হওয়া মানেই প্রতিমুহূর্তে দুর্ঘটনার আতঙ্ক। প্রতিদিন ৬ হাজার টাকা বেতনে একজন সহকারী সঙ্গে নিয়ে এই মৃত্যুরূপ পথ পার হয়ে তাঁকে স্কুলে যেতে হয়।
শারীরিক এমন অক্ষমতা ও যাতায়াতের করুণ দশা সত্ত্বেও তিনি পাঠদান থেকে পিছপা হননি। কিন্তু টানা বৃষ্টি আর কাদা-জলের এই মৌসুমে প্রতিদিনের এই যাতায়াত তাঁর জন্য এখন এক মানসিক ও শারীরিক শারীরিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতাযুক্ত শিক্ষকদের জন্য সরকারি বিধিতে বিশেষ সুবিধা ও বাড়ির কাছের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পদায়নের মানবিক বিধান রয়েছে। চুনারুভাগের শিক্ষার এই বাতিঘরের কষ্ট লাঘবে এবং বর্ষার এই চরম দুর্যোগ থেকে তাঁকে বাঁচাতে, আহমেদাবাদ ইউনিয়নের রাজার বাজারের নিকটবর্তী কোনো বিদ্যালয়ে তাকে দ্রুত বদলি করার জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে আকুল দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষক সমাজ।
দ.ক.সিআর.২৬