মানুষ রাষ্ট্রের কাছে খুব বেশি কিছু চায় না। সে চায় তার প্রাপ্য অধিকারটুকু। চায় নিয়ম মেনে একটি সেবা, একটি সনদ, একটি অনুমোদন, একটি নথি, একটি ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত। একজন নাগরিক যখন রাষ্ট্রের কোনো দপ্তরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ান, তখন তিনি কারও দয়া চাইতে যান না; তিনি যান তার নিজের অধিকার বাস্তবায়ন করতে।
কিন্তু আমাদের বাস্তবতার কোথাও কোথাও সেই সহজ অধিকার অর্জনের পথটি অদৃশ্য কাঁটাতারে ঘেরা। নিয়ম আছে, বিধি আছে, নির্ধারিত ফি আছে, আবেদন করার পদ্ধতি আছে—তারপরও কোথাও যেন একটি অতিরিক্ত দরজা খুলে যায়। সেই দরজার নাম ‘উপরি’, ‘চা-পানি’, ‘খরচাপাতি’, ‘ম্যানেজ’, ‘বখশিশ’ কিংবা সরাসরি ঘুষ। নাম ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু চরিত্র একই—বৈধ কাজের বিনিময়ে অবৈধ দাবি। একজন সাধারণ মানুষ তখন দ্বিধায় পড়ে যান। তিনি কি প্রতিবাদ করবেন? নাকি নিজের প্রয়োজনের কথা ভেবে চুপচাপ টাকা দিয়ে কাজটি শেষ করবেন?
এই দ্বিধাটিই দুর্নীতির সবচেয়ে বড় শক্তি। কারণ দুর্নীতি সব সময় বন্দুক হাতে সামনে দাঁড়ায় না। অনেক সময় সে আসে হাসিমুখে। বলে, “আপনার কাজ হয়ে যাবে।” তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে যোগ করে, “তবে একটু খরচ আছে।”
এই ‘একটু খরচ’ কথাটিই কখনো কখনো একজন মানুষের আত্মসম্মানের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত হয়ে দাঁড়ায়।
অধিকার যখন অনুগ্রহে পরিণত হয়:~
রাষ্ট্রীয় সেবার সবচেয়ে মৌলিক নীতি হওয়া উচিত—নাগরিকের বৈধ কাজ নিয়ম অনুযায়ী সম্পন্ন হবে। কিন্তু যখন কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি নিজের দায়িত্বকে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের সুযোগ হিসেবে দেখেন, তখন সেবার সম্পর্কটি বদলে যায়। নাগরিক হয়ে যান অসহায় আবেদনকারী, আর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হয়ে ওঠেন ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক। তখন একটি সাধারণ প্রশ্ন—“আমার কাজটি কবে হবে?”—এর উত্তর নির্ভর করতে শুরু করে, “আপনি কতটা দিতে পারবেন?” তার ওপর। এটি শুধু আর্থিক দুর্নীতি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার অবক্ষয়।
একজন দরিদ্র মানুষ হয়তো কয়েকশ টাকা দিতে গিয়ে সংসারের বাজার কমিয়ে ফেলেন। একজন কৃষক হয়তো নিজের উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে কোনো সরকারি নথির কাজ শেষ করেন। একজন চাকরিপ্রার্থী হয়তো ধার করে টাকা জোগাড় করেন। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হয়তো দিনের উপার্জনের একটি বড় অংশ তুলে দেন শুধু একটি অনুমোদন দ্রুত পাওয়ার আশায়।
অথচ যে কাজটির জন্য তিনি টাকা দিলেন, সেটি করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আগে থেকেই ছিল। তাহলে প্রশ্ন জাগে—একজন নাগরিককে নিজের অধিকার পেতে কেন নিজের পকেট থেকে অন্যায় মূল্য দিতে হবে?
ঘুষের সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ:~
ঘুষের কথা উঠলে আমরা প্রায়ই ঘুষগ্রহীতার দিকে আঙুল তুলি। অবশ্যই ঘুষ গ্রহণ অন্যায় এবং আইন ও নৈতিকতার দৃষ্টিতে তা নিন্দনীয়। কিন্তু ঘুষের সামাজিক ক্ষতি বুঝতে হলে এর শিকার মানুষটির দিকেও তাকাতে হবে।
যার হাতে অর্থ আছে, সে হয়তো দ্রুত কাজ করিয়ে নিতে পারে। কিন্তু যার অর্থ নেই? সে কী করবে?
সে হয়তো দিনের পর দিন অফিসে ঘুরবে। এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে যাবে। একজন বলবেন, “ওই কক্ষে যান।” আরেকজন বলবেন, “ফাইলটা এখনো আসেনি।” কেউ বলবেন, “স্যারের অনুমোদন লাগবে।” আবার কেউ হয়তো ফিসফিস করে বলবেন, “আপনি চাইলে একটু ব্যবস্থা করে দিতে পারি।”
এই ‘ব্যবস্থা’ শব্দটির আড়ালে কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে পুরো একটি অনৈতিক বাণিজ্য। ফলে টাকা দিতে না পারা মানুষটি শুধু দরিদ্রই থাকেন না; তিনি হয়ে পড়েন সময়, মর্যাদা ও সুযোগের দিক থেকেও বঞ্চিত।
দালালচক্রের অদৃশ্য সাম্রাজ্য:
দুর্নীতির আরেকটি শক্তিশালী সহযোগী হলো দালালচক্র। দালাল সাধারণত নিজেকে দালাল বলে পরিচয় দেন না। তিনি বলেন, “আমি আপনার কাজটা করে দিতে পারব।” তার কাছে নাকি সব পথ জানা। কোন টেবিলে ফাইল যাবে, কার কাছে গেলে কাজ দ্রুত হবে, কোথায় কী কাগজ লাগবে—সবই তার নখদর্পণে। এভাবে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়। নাগরিক নিজের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিজের কাজ করাতে গিয়ে একজন মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। আর যখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে—“দালাল ছাড়া কাজ হয় না”—তখন বুঝতে হবে সমস্যা শুধু একজন দালালের নয়; সমস্যা পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতায়।
একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত, যেখানে নাগরিককে তার অধিকার পেতে কোনো ব্যক্তিগত ‘যোগাযোগ’ বা ‘পরিচয়’ খুঁজতে হবে না।
সবাই অসৎ নয়: তবে এখানে একটি কথা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলা দরকার—সব কর্মকর্তা অসৎ নন, সব সরকারি কর্মচারী দুর্নীতিগ্রস্ত নন, সব প্রতিষ্ঠানও অনিয়মের আখড়া নয়। আজও অসংখ্য কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন, যারা সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। নিজেদের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নাগরিককে সহযোগিতা করেন। তাদের কারণেই অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো মানুষের আস্থা ধরে রেখেছে। তাই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা শ্রেণিকে সামগ্রিকভাবে অভিযুক্ত করা সমাধান নয়।
প্রয়োজন হলো—যেখানে অনিয়ম আছে, সেখানে অনিয়মকে চিহ্নিত করা; যেখানে সততা আছে, সেখানে সততাকে সম্মান করা।
কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে লড়াই নয়। এটি একটি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই।
ঘুষদাতা কি অপরাধী, নাকি পরিস্থিতির শিকার?
এ প্রশ্নের উত্তরও সরল নয়।
কেউ নিজের সুবিধার জন্য ঘুষ দেন। আবার কেউ এমন পরিস্থিতিতে পড়েন, যেখানে ঘুষ না দিলে বৈধ কাজটি অস্বাভাবিকভাবে বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই প্রতিটি ঘটনাকে একই চোখে দেখা ঠিক নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—ঘুষের সংস্কৃতি যতদিন সমাজে স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হবে, ততদিন এর বিস্তার থামানো কঠিন।
আজ কেউ বলবে, “কাজটা দ্রুত করার জন্য দিয়েছি।”
কাল আরেকজন বলবে, “সবাই দেয়।”
পরশু কেউ বলবে, “এটা না দিলে কাজ হয় না।”
এভাবেই অন্যায় ধীরে ধীরে নিয়মের পোশাক পরে নেয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত তখনই, যখন মানুষ অন্যায়কে অন্যায় মনে করা বন্ধ করে দেয়।
পরিবর্তন শুরু হোক তথ্য ও স্বচ্ছতা থেকে:~
দুর্নীতি কমাতে শুধু কঠোর আইন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সহজ, স্বচ্ছ ও নাগরিকবান্ধব ব্যবস্থা।
কোন সেবার জন্য কী কাগজ লাগবে, কত টাকা সরকারি ফি, কতদিনের মধ্যে কাজ হওয়ার কথা, কোথায় অভিযোগ করতে হবে—এসব তথ্য স্পষ্টভাবে নাগরিকের সামনে থাকতে হবে।
সেবার প্রক্রিয়া যত বেশি ডিজিটাল, নির্ধারিত ও অনুসরণযোগ্য হবে, তত বেশি কমবে ব্যক্তিনির্ভরতা। কারণ অস্বচ্ছতা দুর্নীতির উর্বর মাটি।
একই সঙ্গে অভিযোগ করার নিরাপদ ব্যবস্থা থাকতে হবে। একজন নাগরিক যেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আরও বড় হয়রানির শিকার না হন।
অভিযোগ করার পর যদি ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে মানুষের আস্থা বাড়বে। আর অভিযোগ করেও যদি কোনো ফল না হয়, তাহলে মানুষ ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যাবে।
নীরবতা কি সমাধান?
আমরা অনেকেই বলি, “আমি একা কী করতে পারি?”
এই প্রশ্নের মধ্যে যেমন বাস্তবতার ভয় আছে, তেমনি পরিবর্তনের সম্ভাবনাও আছে।
একজন মানুষ প্রতিবাদ করলে হয়তো খুব বেশি কিছু বদলাবে না। কিন্তু একশ মানুষ যদি একই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তখন পরিস্থিতি বদলাতে বাধ্য।
একজনের অভিজ্ঞতা আরেকজনের সতর্কতা হতে পারে। কেউ যদি প্রকাশ্যে বলেন—“আমার বৈধ কাজের জন্য আমার কাছে অবৈধ অর্থ দাবি করা হয়েছে”—তাহলে হয়তো আরেকজন নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া একই ঘটনার কথা বলতে সাহস পাবেন।
নীরবতা অন্যায়কে দীর্ঘায়িত করে। তবে প্রতিবাদ হতে হবে দায়িত্বশীল, তথ্যভিত্তিক এবং আইনসম্মত। কাউকে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া নয়। কাউকে হেয় করা নয়। ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা নয়। প্রয়োজন সত্যকে সত্য হিসেবে তুলে ধরা।
রাষ্ট্রের কাছে নাগরিক ভিখারি নয়:~
সবশেষে আমাদের একটি মৌলিক সত্য মনে রাখতে হবে—রাষ্ট্রের কাছে নাগরিক কোনো ভিখারি নন। নাগরিক কর দেন। রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। আইন মেনে চলেন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ব্যয় বহন করেন। বিনিময়ে তিনি চান নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, সেবা ও অধিকার। তাই একজন নাগরিক যখন একটি বৈধ কাজের জন্য কোনো সরকারি বা দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের দরজায় যান, তখন তার হাতে ঘুষের টাকা থাকার কথা নয়; থাকার কথা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র।
তার পরিচয় কোনো বড় ব্যক্তির সুপারিশ নয়; তার পরিচয় একজন নাগরিক।
তার শক্তি কোনো দালালের সঙ্গে সম্পর্ক নয়; তার শক্তি আইন।
তার কাজের গতি কোনো ‘উপরি’র ওপর নির্ভর করবে না; নির্ভর করবে নিয়ম ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার ওপর।
আসুন, সংস্কৃতিটাই বদলাই:~
ঘুষের বিরুদ্ধে কথা বলা সহজ। কিন্তু ঘুষের সংস্কৃতি বদলানো কঠিন। কারণ এটি শুধু অফিসের চার দেয়ালের মধ্যে নেই; এটি সমাজের নানা স্তরে ছড়িয়ে থাকা একটি মানসিকতা। তাই পরিবর্তনও হতে হবে বহুমাত্রিক।
দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বলতে হবে—“আমার দায়িত্ব আমি বিক্রি করব না।”
নাগরিককে বলতে হবে—“আমার অধিকার কিনতে হবে না।”
দালালকে বলতে হবে—“মানুষের অসহায়ত্বকে ব্যবসা বানানো যাবে না।” প্রতিষ্ঠানকে বলতে হবে—“অনিয়ম করলে জবাবদিহি করতেই হবে।”
আর সমাজকে বলতে হবে—“সততা দুর্বলতা নয়।”
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন বৃদ্ধ তার জমির কাগজের জন্য কারও পেছনে ঘুরবেন না; একজন কৃষক নিজের ন্যায্য সেবা পেতে ঘুষের টাকা জোগাড় করবেন না; একজন তরুণ চাকরি বা শিক্ষার কোনো প্রয়োজনীয় নথির জন্য দালালের কাছে মাথা নত করবেন না; একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বৈধ অনুমোদনের জন্য ‘উপরি’ দেওয়াকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেবেন না।
আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে অফিসের দরজা দিয়ে প্রবেশ করার সময় নাগরিকের মনে এই ভয় থাকবে না—“কাজটা করাতে কত টাকা লাগবে?”
বরং তার বিশ্বাস থাকবে—
“আমি নিয়ম মেনে এসেছি। আমার কাজ নিয়ম মেনেই হবে।”
এই বিশ্বাসটুকুই একটি সুস্থ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
তাই আসুন, আমরা ঘুষকে ভাগ্য বলে মেনে না নিই। দালালকে অপরিহার্য করে না তুলি। অন্যায়কে ‘এটাই নিয়ম’ বলে স্বাভাবিক না করি। আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে কাউকে অযথা অভিযুক্তও না করি।
সত্যকে বলি, প্রমাণকে সামনে রাখি, আইনের পথে চলি এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হই।
কারণ পরিবর্তন কোনো একদিন হঠাৎ করে আসে না। পরিবর্তন শুরু হয় তখনই, যখন একজন মানুষ অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে খুব শান্তভাবে বলে—
“না, আমার বৈধ কাজের জন্য আমি অবৈধ মূল্য দেব না।”
সেই একটি ‘না’ হয়তো ছোট।
কিন্তু হাজার মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হলে সেই ‘না’ই একদিন দুর্নীতির দেয়ালে প্রথম ফাটল ধরাতে পারে।
ঘুষ নয়—অধিকার চাই।
দালালি নয়—স্বচ্ছতা চাই।
হয়রানি নয়—সেবা চাই।
ভয় নয়—সত্যের কথা বলি।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
বৈধ কাজ যেন কখনো অবৈধ দাবির কাছে জিম্মি না হয়।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্টর