মানুষের ভিড়ে মানুষ খুঁজে পাওয়া আজ যেন এক কঠিন কাজ। চারদিকে মানুষের আনাগোনা, ব্যস্ততা, কোলাহল—সবই আছে; নেই শুধু মানুষের প্রতি মানুষের সেই আন্তরিকতা। আমরা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের সঙ্গে দেখা করি, কথা বলি, লেনদেন করি, সামাজিক যোগাযোগ রাখি; অথচ হৃদয়ের গভীরে কোথাও একটা শূন্যতা অনুভব করি। মনে হয়, মানুষ আছে—কিন্তু মানবিকতা কোথায়?
একসময় মানুষ মানেই ছিল আশ্রয়, বিশ্বাস, সহমর্মিতা ও ভালোবাসার একটি নিরাপদ নাম। কারও বিপদ মানে ছিল প্রতিবেশীরও দুশ্চিন্তা। কারও ঘরে শোক নেমে এলে পাশের বাড়ির মানুষও অশ্রুসিক্ত হতো। কারও অসুখ হলে খবর নেওয়া, বিপদে পাশে দাঁড়ানো কিংবা সামান্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়াকে আলাদা কোনো মহৎ কাজ মনে করা হতো না; বরং এগুলো ছিল স্বাভাবিক সামাজিক দায়িত্ব।
আজ সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।
আমরা উন্নত হয়েছি, শহর বড় হয়েছে, প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় এসেছে, যোগাযোগের গতি বেড়েছে। কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের দূরত্ব যেন আরও বেড়েছে। পাশাপাশি বসবাস করেও অনেক সময় আমরা একে অপরের খবর রাখি না। একই ভবনে বাস করা মানুষও পরস্পরের কাছে অপরিচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও বাস্তব জীবনে একজন বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো সময় কিংবা মানসিকতা অনেকের নেই।
এই পরিবর্তনের পেছনে স্বার্থপরতা একটি বড় কারণ। ব্যক্তিগত সাফল্য, অর্থ, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির প্রতিযোগিতায় আমরা অনেক সময় ভুলে যাই—জীবন শুধু নিজের জন্য নয়। মানুষ সামাজিক জীব। তার সুখ-দুঃখ, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অন্য মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
সমাজে যখন অন্যায় ঘটে, তখন আমরা প্রায়ই প্রশ্ন করি—“মানুষ কোথায়?” অথচ সেই মানুষগুলো হয়তো আমাদের আশপাশেই আছে। তারা দেখছে, বুঝছে, কষ্ট পাচ্ছে; কিন্তু কথা বলার সাহস করছে না। কারণ সত্য কথা বলার মূল্য অনেক সময় খুব বেশি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে শত্রু তৈরি হতে পারে, স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সামাজিক বা পেশাগত চাপ আসতে পারে। তাই অনেক ভালো মানুষ নীরবতাকেই নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নেন।
কিন্তু অন্যায়ের সামনে নীরবতা কি সত্যিই নিরপেক্ষতা?
অন্যায়কারী যেমন অপরাধের জন্য দায়ী, তেমনি অন্যায় দেখে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ উদাসীন থাকাও সমাজের জন্য বিপজ্জনক। কারণ অন্যায় তখনই শক্তিশালী হয়, যখন ভালো মানুষগুলো ভয় পায় কিংবা নীরব থাকে। একজন অন্যায়কারী যতটা ক্ষতি করতে পারে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করতে পারে একটি সমাজের নীরবতা।
তবে সব দোষ মানুষের নয়। অনেক সময় সমাজের পরিবেশই মানুষকে নীরব করে দেয়। যখন সত্যবাদী মানুষ বারবার অপমানিত হয়, সৎ মানুষ প্রতারিত হয় এবং নীতিবান মানুষকে দুর্বল বলে বিবেচনা করা হয়, তখন মানুষের মধ্যে হতাশা জন্ম নেয়। তারা ভাবতে শুরু করে—সৎ থেকে লাভ কী? প্রতিবাদ করে লাভ কী? নিজের মতো থাকাই তো ভালো!
এই মানসিকতাই ধীরে ধীরে সমাজকে দুর্বল করে।
আর সেই সুযোগে সক্রিয় হয়ে ওঠে স্বার্থান্বেষী মানুষ। ক্ষমতার ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে কেউ কেউ অন্যের অধিকার দখল করে, কেউ দুর্বল মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে, কেউ অর্থ ও প্রভাবের জোরে নিজের স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করে। সমাজের সম্পদ, পরিবেশ, জমি, জলাশয় কিংবা জনস্বার্থ—কিছুই তাদের লোভ থেকে নিরাপদ থাকে না। লোভের কোনো শেষ নেই; একবার সুযোগ পেলে তার পরিধি আরও বাড়তে থাকে।
অমানবিকতার আরেকটি ভয়ংকর রূপ হলো দলবদ্ধ উচ্ছৃঙ্খলতা। কোনো ব্যক্তিকে বা গোষ্ঠীকে ঘিরে আবেগ, গুজব কিংবা ক্ষোভ যখন বিচারবোধকে অতিক্রম করে, তখন জনসমষ্টিও কখনো কখনো নির্মম হয়ে উঠতে পারে। তখন ব্যক্তি-মানুষের বিবেক যেন ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যায়। কেউ আর প্রশ্ন করে না—যা করছি, তা ন্যায়সঙ্গত কি না। সবাই যখন করছে, তখন আমিও করছি—এই মানসিকতা মানুষকে নিজের বিবেকের কাছে অপরিচিত করে তোলে।
কিন্তু এই অন্ধকারের মধ্যেও আশার আলো আছে।
আজও এমন মানুষ আছেন, যারা অন্যের বিপদে ছুটে যান। নিজের সামর্থ্য সীমিত হলেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও মানুষের জন্য মানুষ হয়ে ওঠেন। তারা হয়তো সংখ্যায় কম, হয়তো প্রচারের আলোয় নেই; কিন্তু তাদের অস্তিত্বই প্রমাণ করে—মানুষ এখনো হারিয়ে যায়নি।
আমাদের সমস্যা হলো, আমরা ভালো মানুষকে খুঁজতে গিয়ে অনেক সময় শুধু উচ্চকণ্ঠ মানুষদের দেখি। অথচ প্রকৃত ভালো মানুষ প্রায়ই নীরব। তিনি প্রচার চান না, নিজের মানবিকতার বিজ্ঞাপন দেন না। কারও বিপদে পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা তার উদ্দেশ্য নয়। তিনি সাহায্য করেন, কারণ তার বিবেক তাকে তা করতে বলে।
মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার পোশাকে নয়, পদমর্যাদায় নয়, অর্থ-সম্পদে নয়। মানুষের পরিচয় তার আচরণে। সে দুর্বল মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করে, ভিন্নমতের মানুষের প্রতি কতটা সহনশীল, অন্যায় দেখলে কী করে, অসহায় মানুষের কান্না শুনে তার হৃদয় কতটা নড়ে ওঠে—এসবের মধ্যেই মানুষের প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে থাকে।
আমরা যদি সত্যিই সমাজ পরিবর্তন করতে চাই, তাহলে প্রথমে অন্যের ভেতর মানুষ খোঁজার আগে নিজের ভেতরের মানুষটিকে জাগাতে হবে। পরিবর্তনের শুরু রাষ্ট্র থেকে, প্রতিষ্ঠান থেকে কিংবা অন্য কারও কাছ থেকে হবে—এমন অপেক্ষা করলে হয়তো অনেক সময় চলে যাবে। পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হতে পারে আমার নিজের একটি ভালো কাজ, আপনার একটি মানবিক আচরণ, কারও বিপদে বাড়িয়ে দেওয়া একটি হাত।
একজন মানুষ যদি অন্যায়ের সামনে সাহস করে দাঁড়ায়, আরেকজন যদি তার পাশে দাঁড়ায়, তারপর তৃতীয়জন যোগ দেয়—তাহলেই তৈরি হতে পারে একটি মানবিক সমাজ। অন্ধকার কখনো এক মুহূর্তে দূর হয় না; একটি ছোট প্রদীপই ধীরে ধীরে আলো ছড়ায়।
তাই মানুষ হারিয়ে গেছে—এই অভিযোগে আমাদের হাল ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। বরং মানুষের সন্ধান করতে হবে মানুষের মধ্যেই। হয়তো সে আপনার পাশের বাড়িতে আছে, হয়তো কর্মস্থলে, হয়তো কোনো অখ্যাত গ্রামের নিরীহ মানুষটির মধ্যে। এমনকি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সে আপনার নিজের ভেতরেও আছে।
প্রয়োজন শুধু তাকে জাগিয়ে তোলা।
আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে অন্যের কান্না দেখে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেবে না; যেখানে দুর্বল হওয়া অপরাধ হবে না; যেখানে সত্য বলা বোকামি হিসেবে বিবেচিত হবে না; যেখানে ভালো মানুষকে সরিয়ে দেওয়া নয়, সম্মান করা হবে; যেখানে ক্ষমতার চেয়ে ন্যায়, স্বার্থের চেয়ে মানবতা এবং বিভেদের চেয়ে ভালোবাসা বড় হয়ে উঠবে।
মানুষ এখনো বেঁচে আছে। মানবতাও বেঁচে আছে। হয়তো তার কণ্ঠ আজ কিছুটা ক্ষীণ, হয়তো অমানবিকতার কোলাহলে তা চাপা পড়েছে। কিন্তু একটি সত্যিকারের মানবিক হৃদয় যখন জেগে ওঠে, তখন সেই ক্ষীণ আলোও অনেক অন্ধকারকে পরাজিত করতে পারে।
তাই আসুন, মানুষকে খুঁজে ফিরি। অন্যের মধ্যে মানুষ খুঁজি, নিজের মধ্যেও মানুষ খুঁজি। ঘৃণার বদলে ভালোবাসা, প্রতিহিংসার বদলে সহমর্মিতা, নীরবতার বদলে ন্যায়ের পক্ষে কথা বলি।
কারণ মানুষ হারিয়ে যায়নি—শুধু তাকে জাগিয়ে তুলতে হবে।
আর সেই জাগরণ যদি একজনের হৃদয় থেকে শুরু হয়, একদিন তা ছড়িয়ে পড়তে পারে অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে। তখন হয়তো আবার বলা যাবে—মানুষের ভিড়ে মানুষ হারিয়ে যায়নি; বরং মানবতার আলোয় মানুষ নতুন করে নিজেকে খুঁজে পেয়েছে।
লেখক ~কবি কলামিস্ট ও সাংবাদিক