উন্নত জীবনের আশায় লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিস যাওয়ার স্বপ্ন ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে ৪২ অভিবাসনপ্রত্যাশীর। কোনো নেভিগেশন ব্যবস্থা ছাড়াই রাবারের নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে জ্বালানি ফুরিয়ে দিকভ্রষ্ট হয়ে প্রায় ১০ দিন সাগরে ভাসতে হয়েছে তাদের। তীব্র গরম, প্রচণ্ড রোদ, খাবার ও পানির সংকটে নৌকাটিতে থাকা ৯ বাংলাদেশি ও এক সুদানিসহ ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। দীর্ঘ সময় সাগরে পড়ে থাকায় মরদেহগুলো পচে গেলে জীবিতরা সেগুলো সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে বাধ্য হন।
অবশেষে গত ১৩ আগস্ট নৌকাটি মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছালে স্থানীয় পুলিশ ২৯ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে। তাদের মধ্যে ১৮ জন গুরুতর অসুস্থ ও অচেতন অবস্থায় ছিলেন। বর্তমানে তারা মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
শ্রম সচিব মো. জাকির হোসেন স্বাক্ষরিত এক বার্তায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। দূতাবাসের সঙ্গে স্থানীয় পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের যোগাযোগের ভিত্তিতে ঘটনাটির বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে।
দূতাবাসের তথ্য মতে, গত ৩ আগস্ট ৩৮ বাংলাদেশি ও চার সুদানিসহ মোট ৪২ জন লিবিয়ার তবরুক উপকূল থেকে একটি রাবারের নৌকায় গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেন। নৌকাটি স্পিডবোটের একটি ইঞ্জিন দিয়ে পরিচালিত হলেও এতে কোনো উপযুক্ত নেভিগেশন ব্যবস্থা ছিল না।
যাত্রার আগে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বলা হয়েছিল, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মতো। কিন্তু বাস্তবে সেই যাত্রাই তাদের নিয়ে যায় মৃত্যুর মুখোমুখি।
নেভিগেশন ব্যবস্থা না থাকায় নৌকাটি একপর্যায়ে দিক হারিয়ে ফেলে। পরে জ্বালানিও ফুরিয়ে যায়। ফলে সাগরের বিশাল জলরাশিতে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ভাসতে থাকে নৌকাটি। প্রায় ১০ দিন এভাবেই ভেসে থাকার পর স্রোতের টানে সেটি মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূলের কাছে পৌঁছায়।
ক্ষুধা-তৃষ্ণায় একে একে মৃত্যু
চিকিৎসাধীন বাংলাদেশি নাগরিক আব্দুল করিমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে ঘটনার ভয়াবহ বিবরণ জানতে পারেন শ্রম সচিব। আব্দুল করিম জানান, দীর্ঘ সময় সাগরে আটকে থাকার কারণে নৌকায় থাকা মানুষগুলো তীব্র গরম ও প্রচণ্ড রোদের মধ্যে পড়েন। এর সঙ্গে যোগ হয় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট।
একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন অনেকেই। পরে ৯ বাংলাদেশি ও এক সুদানিসহ ১০ জনের মৃত্যু হয়।
এ ঘটনা শুধু একটি নৌযাত্রার দুর্ঘটনা নয়; মানবপাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে অনিয়মিত অভিবাসনের জন্য ভয়ংকর সমুদ্রপথ বেছে নেওয়া মানুষের চরম ঝুঁকিরও নির্মম চিত্র।
বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, চিকিৎসাধীন ২৯ বাংলাদেশিরা সুস্থ হয়ে উঠলে মিসরের প্রচলিত আইন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাদের দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভূমধ্যসাগরের এই মর্মান্তিক ঘটনায় নিখোঁজ বা মৃতদের স্বজনদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যারা জীবিত উদ্ধার হয়েছেন, তাদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি নিহতদের পরিচয় ও মরদেহের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
দ.ক/সিলেট