পৃথিবীর জীবগুলোকে কোন অদৃশ্য আকর্ষণ বেঁধে রেখেছে? কোন অজানা টানে মানুষ শুধু নয়, জল, স্থল ও আকাশের অসংখ্য প্রাণী আপন আপন গন্তব্যের দিকে ছুটে চলছে? কেউ জানে না সেই গন্তব্য কোথায়, কোথায় তার শেষ। তবু থেমে নেই কারও পথচলা। জন্মের পর থেকেই যেন প্রত্যেক প্রাণী এক অদৃশ্য আহ্বানে সাড়া দিয়ে ছুটে চলে অজানা কোনো ঠিকানার দিকে।
এ কেমন আকর্ষণ? এ কি জীবনের নেশা? যদি নেশাই হয়, তবে পৃথিবীর সব মাদক, সব মোহ, সব পার্থিব আসক্তি এই নেশার কাছে তুচ্ছ। কারণ মানুষ জানে—তার পথের শেষ কোথায়, তা সে জানে না; তবু পথ চলা থামায় না। মৃত্যুর অনিবার্যতা জেনেও সে স্বপ্ন দেখে, ঘর বাঁধে, ভালোবাসে, সন্তান জন্ম দেয়, সম্পদ গড়ে, ইতিহাস রচনা করে। আগামীকাল কী আছে, তা অজানা—তবু আগামীকালের জন্য আজকের জীবনকে সাজিয়ে নেয়।
প্রকৃতির এই অদ্ভুত লীলাখেলা কোথা থেকে এলো? কে সৃষ্টি করল এই আকর্ষণ ও বিকর্ষণের নিয়ম? কে স্থির করে দিল জীবনের এই অন্তহীন গতি? কে এমন এক অদৃশ্য শক্তি মানুষের ভেতরে স্থাপন করল, যে শক্তি তাকে কখনো আনন্দের দিকে, কখনো দুঃখের দিকে, কখনো সাফল্যের দিকে, আবার কখনো পরাজয়ের দিকেও টেনে নিয়ে যায়!
আশ্চর্যের বিষয়—জয় যেমন আকর্ষণ, পরাজয়ও তেমনি আকর্ষণ। মানুষ বিজয় চায়, কিন্তু পরাজয় তাকে থামিয়ে দেয় না। বরং অনেক সময় পরাজয়ই তাকে নতুন করে জয়ের স্বপ্ন দেখায়। মানুষ হারতে হারতে জিততে শেখে, কাঁদতে কাঁদতে হাসতে শেখে, ভাঙতে ভাঙতে গড়তে শেখে। জীবনের প্রতিটি বিপরীত অবস্থার মধ্যেও যেন লুকিয়ে থাকে আরেকটি অদৃশ্য আকর্ষণ।
তাহলে কি সবকিছুই কোনো এক মহাজাগতিক নিয়মের অধীন?
আমরা তাকে কেউ বলি প্রকৃতি, কেউ বলি নিয়তি, কেউ বলি স্রষ্টার ইচ্ছা। আবার কেউ যুক্তি, বিজ্ঞান ও কারণ-পরম্পরার মধ্য দিয়ে তার ব্যাখ্যা খুঁজতে চেষ্টা করি। কিন্তু মানুষের জ্ঞান যতই বিস্তৃত হোক, রহস্যের শেষ প্রান্তে গিয়ে আজও তাকে দাঁড়াতে হয় বিস্ময়ের সামনে। কারণ জানা যত বাড়ে, অজানার বিস্তারও যেন তত বড় হয়ে ওঠে।
নিয়তির অমোঘ লিখন বলে কি সত্যিই কিছু আছে? যদি থাকে, তবে সেই লিখনের লেখক কে? যদি এই মহাবিশ্ব একটি বিশাল শিল্পকর্ম হয়, তবে সেই মহাশিল্পী কে? কোটি কোটি নক্ষত্র, গ্রহ, প্রাণ, জল, মাটি, বাতাস, আলো, অন্ধকার—এসবের অসীম সমন্বয়ের পেছনে কোন মহাকারিগরের স্পর্শ রয়েছে?
মানুষ যুগে যুগে এই প্রশ্ন করেছে। কিন্তু সেই মহাকারিগরের পরিচয় যেন এক কালো ঘোমটার আড়ালে ঢাকা। মানুষ তার সৃষ্টি দেখে, তার নিয়ম অনুভব করে, তার শক্তির কাছে বিস্মিত হয়; কিন্তু স্রষ্টার সম্পূর্ণ পরিচয়কে নিজের সীমিত জ্ঞানের মধ্যে বন্দী করতে পারে না। তবু মানুষের জীবনের প্রতিটি গল্পে একটি শব্দ বারবার ফিরে আসে—‘আমি’।
আমি হাসি।
আমি কাঁদি।
আমি ভালোবাসি।
আমি ঘৃণা করি।
আমি জিতি।
আমি হারি।
আমি স্বপ্ন দেখি।
আমি স্মৃতি তৈরি করি।
এই ‘আমি’ কে? একটি শিশুর জন্মের সঙ্গে যেন ‘আমি’-এর যাত্রা শুরু হয়। সে ধীরে ধীরে নিজেকে চিনতে শেখে। তারপর পরিবার, সমাজ, দেশ, পৃথিবী—সবকিছুর সঙ্গে নিজের সম্পর্ক আবিষ্কার করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ‘আমি’ও বদলায়। কখনো সে নিজেকে শরীর বলে মনে করে, কখনো মন, কখনো পরিচয়, কখনো কর্ম, কখনো স্মৃতি। অথচ এই সব পরিচয়ের অন্তরালে একটি অদৃশ্য সত্তা নিরন্তর বলে যায়—আমি আছি।
হাজার বছর আগে যে মানুষটি এই পৃথিবীর মাটিতে হেঁটেছিল, সে আজ নেই। কিন্তু তার পদচিহ্ন আছে। তার কথা আছে, তার কাজ আছে, তার ভালোবাসা ও সংগ্রামের গল্প আছে। সেই অসংখ্য মানুষের ‘আমি’ মিলেই তৈরি হয়েছে মানবজাতির স্মৃতি। মানুষ যখন অতীতকে লিখে রাখতে শিখল, তখন ব্যক্তিগত ‘আমি’ ধীরে ধীরে হয়ে উঠল ইতিহাসের অংশ।
ইতিহাস আসলে অসংখ্য ‘আমি’-এর সম্মিলিত স্মৃতি। কোনো রাজা বলেছিলেন—আমি রাজা। কোনো যোদ্ধা বলেছিলেন—আমি লড়ব। কোনো মা বলেছিলেন—আমি সন্তানকে বাঁচাব। কোনো কবি বলেছিলেন—আমি অনুভব করি। কোনো বিজ্ঞানী বলেছিলেন—আমি জানতে চাই। কোনো সাধারণ মানুষ নীরবে বলেছিলেন—আমি বেঁচে থাকব। এই অসংখ্য ‘আমি’-এর মিলিত পদধ্বনিই মানবসভ্যতার দীর্ঘ পথচলা। কিন্তু আজকের ‘আমি’ও একদিন অতীত হয়ে যাবে। আজ যে মানুষ আয়নায় নিজের মুখ দেখে, একদিন তার সেই মুখও অন্যের স্মৃতিতে পরিণত হবে। আজকের হাসি একদিন পুরোনো ছবি হবে, আজকের কান্না একদিন গল্প হবে, আজকের স্বপ্ন একদিন ইতিহাসের একটি ক্ষুদ্র অধ্যায় হয়ে থাকবে।
তাহলে এই ছুটে চলা কেন?
সম্ভবত এটাই জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য। আমরা গন্তব্য জানি না, তবু চলি। শেষ জানি, তবু শুরু করি। হারানোর ভয় জানি, তবু ভালোবাসি। মৃত্যু নিশ্চিত জানি, তবু জীবনকে আঁকড়ে ধরি। হয়তো এই অদৃশ্য আকর্ষণের মধ্যেই জীবনের সৌন্দর্য। হয়তো মানুষের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ার মধ্যেই তার অনুসন্ধানের মহত্ত্ব। আর হয়তো সব আকর্ষণ, সব বিকর্ষণ, সব হাসি, সব কান্না, সব জয়, সব পরাজয়—শেষ পর্যন্ত একই মহাসত্যের দিকে ইঙ্গিত করে।
সেই মহাসত্যের নাম আমরা যেভাবেই উচ্চারণ করি না কেন, তার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের অহংকার ক্ষুদ্র হয়ে আসে।
অসংখ্য রূপ, অসংখ্য জীবন, অসংখ্য গল্প, অসংখ্য ‘আমি’—সবাই এক অদৃশ্য বৃত্তে ঘুরে চলেছে। কেউ কিছু সময়ের জন্য আলোয় আসে, আবার অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। কেউ স্মৃতি হয়ে থাকে, কেউ বিস্মৃত হয়। কিন্তু সেই মহাবৃত্তের গতি থামে না। আর সেই অনন্ত গতির মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানুষ আজও প্রশ্ন করে—
আমি কে?
কোথা থেকে এলাম?
কোথায় চলেছি?
আর যে অদৃশ্য শক্তি আমাকে চলতে বাধ্য করছে—তার পরিচয়ই বা কী?
হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই মানুষের জীবন। আর সেই উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই একদিন তার ‘আমি’ মিলিয়ে যাবে বৃহত্তর কোনো ‘আমি’-এর অসীম পরিচয়ের মধ্যে।
লেখক : কবি কলামিস্ট ও সাংবাদিক